ভারতের চতুর্থ শীর্ষ বেসরকারি ইয়েস ব্যাংকের পতন

0
552

ডেস্ক রিপোর্ট : আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ভারতের চতুর্থ শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক ইয়েস ব্যাংকের পতন অবশ্যম্ভাবী। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ এবং অর্থ উত্তোলনে সীমা আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ। এ অবস্থায় ব্যাংকটির শেয়ার ধরে রাখতে চাইছেন না তারা। ফলে পুঁজিবাজারে ব্যাংকটির শেয়ারদর কমেছে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত। খবর এএফপি, এফটি, বিজনেস টুডে ও আনন্দবাজার।

পতন ঠেকাতে ইয়েস ব্যাংকের ত্রাতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভারতের স্টেট ব্যাংক (এসবিআই)। ভারতের চতুর্থ শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংকটির ৪৯ শতাংশ মালিকানা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্টেট ব্যাংকের চেয়ারম্যান রজনীশ কুমার।

আজ শনিবার এ ঘোষণা দিয়ে রজনীশ কুমার গণমাধ্যমে বলেছেন, তাদের মূল লক্ষ্যই হবে ইয়েস ব্যাংকের আমানতকারীদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখা।

দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হিসাবে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে উল্লেখ করে স্টেট ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘সেই দায়িত্ব আমাদেরই পালন করতে হবে। কোনও এক জনের ভুলের খেসারত কেন একটা প্রতিষ্ঠান দেবে? ব্যাংক লাটে উঠলে তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। কিন্তু এসবিআই পাশে দাঁড়ালে পরিস্থিতিটা ঘুরে যাবে। তা সে বেসরকারি বা সরকারি মালিকানাধীন, যা-ই হোক না কেন, দেশের যে কোনও প্রতিষ্ঠানই জাতীয় সম্পদ।’

ইয়েস ব্যাংকের পতনের আশঙ্কা এরই মধ্যে দেশটির ব্যাংকিং খাত নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে এর মারাত্মক প্রভাব। গতকাল দিনের শুরুতেই দেশটির শেয়ারবাজারের সেনসেক্স সূচকের পতন ঘটে ১ হাজার ৪৫৯ দশমিক ৫২ পয়েন্ট। অন্যদিকে নিফটি সূচকের পতন ঘটে ৪৪১ দশমিক ৬০ পয়েন্ট। তথৈবচ দশা মুদ্রাবাজারেও। ভারতীয় রুপির বিনিময় হার গতকাল নেমে এসেছে ২০১৮ সালের পর সর্বনিম্নে।

স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, এর আগে বৃহস্পতিবার সারা দিনেও ইয়েস ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা শঙ্কায় ছিলেন না বিনিয়োগকারীরা। ওইদিন সকাল থেকেই গুঞ্জন ছিল, স্টেট ব্যাংকের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাতে ইয়েস ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে কেন্দ্র সরকার, যার ঘোষণা হতে পারে শিগগিরই। এর পর পরই শেয়ারবাজারে ইয়েস ব্যাংকের শেয়ারদর বাড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ। ইয়েস ব্যাংকে বিনিয়োগের জন্য পরে স্টেট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকেও সম্মতি জানানো হয়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে দিনের শেষভাগে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণভার হাতে নেয়ার ঘোষণা দেয় আরবিআই। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়, পরবর্তী ৩০ দিন অর্থাৎ ৩ এপ্রিল পর্যন্ত অসুস্থতা, পড়াশোনা বা বিয়ের মতো বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ব্যাংকটির গ্রাহকরা ৫০ হাজার রুপির বেশি উত্তোলন করতে পারবেন না। তবে ড্রাফট বা পে-অর্ডারের ক্ষেত্রে এ ঊর্ধ্বসীমা কার্যকর হবে না। এছাড়া ব্যাংকের ২০ হাজার কর্মীর বেতন-ভাতা পরিশোধেও এ ঘোষণা কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে কোনো ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংকটি। এছাড়া ইয়েস ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দিয়েছে আরবিআই। প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয় স্টেট ব্যাংকের সাবেক সিইও প্রশান্ত কুমারকে।

এ বিষয়ে আরবিআইয়ের ভাষ্য হলো, সম্পদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর লক্ষ্যেই কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে আমানতকারীদের আস্থার বদলে আশঙ্কাই বাড়িয়ে দিয়েছে আরবিআইয়ের ঘোষণা। ভারতজুড়ে ইয়েস ব্যাংকের শাখাগুলোর সামনে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ই ভিড় জমান আমানতকারীরা। অন্যদিকে শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধসের মুখে পড়ে ব্যাংকটির শেয়ারমূল্য। এর আগে বৃহস্পতিবার দিন শেষেও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে ইয়েস ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৩৬ রুপি ৮০ পয়সা। গতকাল দিনের শুরুতেই তা নেমে দাঁড়ায় ৫ টাকা ৬৫ পয়সায়।

ভারতীয় ব্যাংকিং খাতে তারল্যের সংকট নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে আরবিআইয়ের ঘোষণা। বছরখানেক আগেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান আইএলঅ্যান্ডএফএস প্রায় ধসে যেতে বসেছিল। প্রসঙ্গত, দেশটির ভোক্তা খাতে সরবরাহকৃত ঋণের বড় অংশেরই উত্স ভারতের ‘ছায়া ব্যাংক’হিসেবে পরিচিত এসব প্রতিষ্ঠান।

পরবর্তী সময়ে তারল্য সংকটের কারণে দেশটির ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণ বিতরণে এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়। ফলে এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে দেখা দেয় মারাত্মক শ্লথতা। টানা সাত প্রান্তিক শ্লথতার মধ্যে পার করার পর গত বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় দেশটির অর্থনীতি। যদিও এ সময় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, দুই বছর ধরে পরিচালনগত সমস্যা এবং মূলধন সংকটে ভুগছে ইয়েস ব্যাংক। আরবিআইয়ের নির্দেশে গত বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির সিইও রানা কাপুর ব্যাংকটির দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। পরবর্তী সিইও রবনিত গিলের সময়ে ব্যাংকটির বড় অংকের অনাদায়ী ঋণের বোঝার বিষয়টি সামনে আসে। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) লোকসানে পড়ে ব্যাংকটি। শেষ প্রান্তিকেও আর্থিক ফলাফল প্রকাশে দেরি করছিল ব্যাংকটি। একই সঙ্গে আমানত সংগ্রহ প্রক্রিয়াতেও বিপত্তির ধারা বজায় থাকে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের ছায়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে এতদিন যেসব ব্যাংক সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থানে ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ইয়েস ব্যাংক। এছাড়া কুঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বড় ধরনের আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল ব্যাংকটি। ফলে বাজার থেকে নতুন মূলধন সংগ্রহেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল ব্যাংকটিকে।

সার্বিকভাবে ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে আর্থিক অবস্থার ক্রমাবনতি, সুশাসনের সংকট বা পরিচালনগত দুর্বলতা, বিনিয়োগকারীদের নিয়ে ভ্রান্ত আশ্বাসের প্রবণতা, বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ ও তারল্য সংকটকে।

বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইয়েস ব্যাংক নয়, ভারতের গোটা ব্যাংকিং খাতের জন্যই অশনিসংকেত বয়ে এনেছে। এ বিষয়ে দেশটির আইআইএফএল সিকিউরিটিজের হেড অব রিসার্চ অভিমন্যু সোফাতের মন্তব্য হলো, বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক এবং এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় ছোট ছোট ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাচ্ছে। আরবিআই এখানে কত দ্রুত উদ্ধার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে পারবে, সেটি এখানে অত্যন্ত জরুরি। কারণ পরিচালনগত প্রতিবন্ধকতার কারণে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ইয়েস ব্যাংকের মারাত্মক পরিচালনগত সমস্যা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর কার্যক্রমকে দায়ী করে আরবিআই বলছে, আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আরবিআইয়ের এ আশ্বাসে চিড়ে ভেজেনি। ইয়েস ব্যাংকের শাখাগুলোর সামনে ভিড় করছেন গ্রাহকরা। এটিএম এবং অনলাইন ব্যাংকিং পরিষেবাও এখন বেহাল।

নয়াদিল্লিতে ইয়েস ব্যাংকের এক শাখার সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন দেবিকা নামের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেমন, তা আসলে স্পষ্ট নয়। এ কারণে সবার মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক রয়েছে। এমনকি আমি নিজেও এখন বেশ আতঙ্কিত।

অন্যদিকে ইয়েস ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারী মুম্বাইভিত্তিক আইনজীবী বর্ষা গান্ধী বলেন, আমি প্রতিটি ১৫০ রুপি দরে ১৫টি শেয়ার কিনেছিলাম। এখন এগুলোর দাম ১৫ রুপি করে। এটি আমার বিনিয়োগের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। এমনকি আমার আমানতও এখন আটকে পড়েছে। এখন অপেক্ষা আরবিআইয়ের পদক্ষেপের কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়ার। কিন্তু তার পরও এটা বড় ধরনের ক্ষতি। শেয়ারগুলোও হাতে আটকা পড়েছে।

বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনায় সরব হয়েছেন রাহুল গান্ধী। গতকাল তিনি এক টুইট বার্তায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার চিন্তাভাবনাগুলোই ভারতের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমও। বিষয়টি নিয়ে তার অভিমত, ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সার্বিক ব্যর্থতাই এর জন্য দায়ী। ছয় বছর ক্ষমতাসীন বিজেপির ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এটাই শেষ নাকি এমন ঘটনা আরো ঘটতে চলেছে? যদিও সরকার মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে। আমানতকারীরা কী করেন, জানার অপেক্ষায় থাকলাম। তারা নিশ্চয়ই পিএমসি ব্যাংকের আমানতকারীদের মতোই গভীর উদ্বেগে রয়েছেন।

অন্যদিকে আরবিআইয়ের গভর্নর শক্তিকান্ত দাস বলছেন, লক্ষ্য হলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইয়েস ব্যাংকের পুনরুজ্জীবন ঘটানো। প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ইয়েস ব্যাংককে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here