ঢাকায় ৮৫ হাজার একর জমির ৯৯% বেহাত

0
599

হাছান আদনান : বেঙ্গল রেলওয়ে বোর্ডের পরিচালক প্রিন্স আগা মোহাম্মদ ইকবাল ও শাহজাদী বেগম দম্পতি বসবাস করতেন ঢাকার মাহুতটুলী এলাকায়। নিঃসন্তান এ দম্পতি ১৮৮৫ সালে বসতভিটাসহ সব সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে যান ‘ধর্মীয় কাজে’ ব্যবহারের জন্য। এ দম্পতির ওয়াক্ফ করে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণ ৭২ হাজার একর।

১৮৬৪ সালে সাড়ে ১২ হাজার একর সম্পত্তি ওয়াক্ফ করে যান খান সাহেব মুন্সী আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেছা বিবি দম্পতি। শাহজাদী বেগম এবং আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেছা ওয়াক্ফ এস্টেটের জমির পরিমাণ সাড়ে ৮৪ হাজার একর। এর বাইরে আরো কিছু ওয়াক্ফ এস্টেটসহ ঢাকা বিভাগে এ ধরনের জমির পরিমাণ ৮৫ হাজার ১০৯ একর। এর মধ্যে ৮৪ হাজার ৬৬৩ একর বা ৯৯ দশমিক ৪৭ শতাংশই ওয়াক্ফ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

জানতে চাইলে ওয়াক্ফ প্রশাসক ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের ৭২ হাজার একর এবং আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেছা ওয়াক্ফ এস্টেটের সাড়ে ১২ হাজার একর জমির তথ্য আমাদের কাছে আছে। কিন্তু দুটি এস্টেটের সমুদয় সম্পত্তিই ওয়াক্ফ প্রশাসনের বেহাত রয়েছে।

১৯১৩ সালে ভারতের মুসলমান ওয়াক্ফ বৈধকরণ আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘ওয়াক্ফ হলো কোনো মুসলমান কর্তৃক তার সম্পত্তির কোনো অংশ এমন কাজের জন্য স্থায়ীভাবে দান করা, যা ধর্মীয় বা পবিত্র কিংবা সেবামূলক হিসেবে স্বীকৃত। ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য ১৯৩৪ সালের বেঙ্গল ওয়াক্ফ অ্যাক্টের আওতায় গঠন করা হয়েছে ওয়াক্ফ প্রশাসন। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রশাসন ওয়াক্ফ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান।

ওয়াক্ফ প্রশাসনের তথ্য বলছে, ঢাকা বিভাগে ওয়াক্ফ সম্পত্তির প্রায় পুরোটাই বেহাত অবস্থায় রয়েছে। শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তি রয়েছে ঢাকার ২১৫৮ নং দাগের অন্তর্ভুক্ত ২৫৩ নং তৌজির সীমানা পশু হাসপাতালের উত্তর, সিদ্দিকবাজারের উত্তর, স্টেশন রোডের উত্তর, কাপ্তানবাজারের উত্তর, টয়েনবি সার্কুলার রোডের দক্ষিণ, সচিবালয় রোডের দক্ষিণ, জয়কালী মন্দিরসহ আনন্দবাজার ও বঙ্গবাজার এলাকায়। এছাড়া ঢাকার কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ মোট আটটি এলাকায় শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের জমি রয়েছে।

আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেছা ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তি রয়েছে বাড্ডার ভাটারা, সেনপাড়া, দুয়ারীপাড়া, বাউনিয়া, জহুরাবাদ ও দিঘুন এলাকায়। রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোর মধ্যে ছিল রূপগঞ্জ, সাভার, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, কালিয়াকৈর, কেরানীগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ এলাকার পাঁচ শতাধিক মৌজায়।

এসব জমি প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের নামে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় সরকারি সম্পত্তি দখলের চেষ্টা হয়। রেলওয়ের জমি শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের লোকজন নিজেদের দাবি করেন। অথচ তারা কোনো দলিল দেখাতে পারেননি। এ ওয়াক্ফ এস্টেটের দলিল কোনো জায়গায় দাখিল করতে আমি দেখিনি। রাষ্ট্র চাইলে ওয়াক্ফ জমি ক্ষতিপূরণ প্রদান করে অধিগ্রহণ করতে পারে। ওয়াক্ফ প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে ওয়াক্ফ সম্পত্তি বিক্রি করা যায়। তবে এ বিক্রি অবশ্যই ওয়াকেফর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। ওয়াকিফ (দানকারী) যেসব কথা বলে যান, তা বাস্তবায়ন করা মোতোয়ালির দায়িত্ব।

শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের সম্পত্তি বেহাতের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৭২ সালে। এর পর ১৯৯৬ সালে এ এস্টেটের সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের নামে ৯৯ বছর মেয়াদি ইজারা দেয়া শুরু হয়। তদারকির অভাবে এ সম্পত্তি পরে প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। অন্যদিকে কাগজপত্র সংরক্ষণের অভাবে তৌজিভুক্ত ও খতিয়ানের জমি সিএস রেকর্ডের সময় বেহাত হয়ে যায়।

যদিও ২০১৩ সালে প্রণীত ওয়াক্ফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান আইনের ৫ (১) ধারায় বলা আছে, ‘ওয়াক্ফ সম্পত্তি কেবল সংশ্লিষ্ট ওয়াক্ফ কিংবা উক্ত ওয়াকেফর স্বত্বভোগীদের প্রয়োজনে, কল্যাণে ও স্বার্থে হস্তান্তর করা যাইবে; এবং অনুরূপ হস্তান্তর ওয়াকেফর উদ্দেশ্যের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ হইতে হইবে।’

এ আইনের ৫ (৩) ধারায় বলা আছে, ‘ওয়াক্ফ কিংবা উহার স্বত্বভোগীদের প্রয়োজন, কল্যাণ ও স্বার্থে অনিবার্যভাবে আবশ্যক বিবেচিত না হইলে কোনো ওয়াক্ফ সম্পত্তি বিক্রয় বা চিরস্থায়ী ইজারামূলে হস্তান্তর করা যাইবে না।’ যদিও বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের নামে ওয়াক্ফ থেকে ইজারা নেয়া অনেক সম্পত্তিই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবু বকর মোহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, ওয়াকিফ যে উদ্দেশ্যে সম্পদ ওয়াক্ফ করেছেন, সে উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা যাবে না। ওয়াক্ফ দলিলে যদি উত্তরাধিকারীদের ভোগের বিষয়টি উল্লেখ থাকে, তাহলে তারা এর অংশীদার হতে পারবে।

ওয়াক্ফ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পল্লবী থানাধীন সেনপাড়া পর্বতায় আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়েজুন্নেছা এস্টেটের ২৭ একর জমি একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ইজারা দেয়া হয়েছে। মিরপুর দুয়ারীপাড়ায় ওয়াক্ফ এস্টেট কল্যাণ সমিতির অনুকূলে ইজারা দেয়া হয়েছে ২৩ একর জমি। একইভাবে ভাটারা মৌজায় ১৭ একর ও জহুরাবাদ মৌজায় ২৩ একর জমি ইজারা দেয়া হয়েছে।

ওয়াক্ফকৃত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের উত্তরাধিকার বা নির্ভরযোগ্য কাউকে নিয়োগ দেয় ওয়াক্ফ প্রশাসন, যিনি মোতোয়ালি নামে পরিচিত। আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেছা ওয়াক্ফ এস্টেটের মোতোয়ালির দায়িত্বে রয়েছেন আবুল কালাম আনসারী। নিজেকে আইনউদ্দিন হায়দারের মেয়ের পক্ষের বংশধর দাবি করে তিনি বলেন, দলিল অনুযায়ী আইনউদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেছা ওয়াক্ফ এস্টেটের জমির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার একর। বেহাত হওয়া এসব জমির মধ্যে যেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব, সেগুলো উদ্ধারের জন্য আমরা একাধিক মামলা করেছি। বছরের পর বছর ধরে এসব মামলা চলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here