৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস

0
76

সিনিয়র রিপোর্টার : আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। মঙ্গলবার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়।

অধিবেশনের শুরুতে ২০২০-২১ সালের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের উপর আনীত ছাটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর একে একে অন্য মন্ত্রীরা তাদের স্ব-স্ব মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কণ্ঠভোটে সে সকল প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সর্বশেষ নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মধ্য দিয়ে বাজেট পাস হবে।

বুধবার ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে এ বাজেট কার্যকর হবে।

এর আগে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে সাংবিধানিক বাধ্য-বাধকতার কারণে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত ১০ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। গত ১১ জুন কভিড-১৯ মহামারীতে অর্থনীতির অচলাবস্থার মধ্যে টিকে থাকা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা সামনে রেখে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দ্বিতীয় বাজেট এটি। ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’ শিরোনামে এবারের বাজেট বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালেরও দ্বিতীয় বাজেট।

সচরাচর বাজেট অধিবেশন দীর্ঘ হয়। অধিবেশনে সম্পূরক বাজেটের উপর দুই থেকে চার দিন এবং সাধারণ বাজেট এবং উপর ১২ থেকে ১৫ দিন আলোচনা হয়। বাজেট নিয়ে ৫০ থেকে শুরু করে ৬৫ ঘন্টার মত আলোচনা রেকর্ড রয়েছে। এর আগে ১৯৯৮ সালের বাজেট অধিবেশন ২০ কার্যদিবস চলেছিল।

এবার সম্পূরক ও মূল বাজেটের ওপর সব মিলিয়ে পাঁচ ঘণ্টার মত আলোচনা হয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে বসা অধিবেশনে সংক্রমণ এড়াতে প্রতিদিন ৮০-৯০ জন আইনপ্রণেতাকে নিয়ে কার্যক্রম চলে। মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট সাত কার্যদিবস চলে সংসদের অধিবেশন।

সোমবার অর্থ বিল পাস করার পর মঙ্গলবার মহামারীকালের বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হল।

এক নজরে নতুন বাজেট

করোনাভাইরাস সঙ্কটে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবারের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় খুব বেশি না বাড়িয়ে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৬.২৭ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, যা নিয়ম অনুযায়ী আগেই অনুমোদন করা হয়েছে।

এবার পরিচালন ব্যয় (ঋণ, অগ্রিম ও দেনা পরিশোধ, খাদ্য হিসাব ও কাঠামোগত সমন্বয় বাদে) ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই যাবে, যা মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী কামাল আশা করছেন, নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়ের ৬৬ শতাংশ তিনি রাজস্ব খাত থেকে পাবেন। তার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের ৮.৫ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন কামাল। ফলে এনবিআরের কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে ৯.৮১ শতাংশ। টাকার ওই অংক মোট বাজেটের ৫৮ শতাংশের বেশি।

এবারও সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ১ লাখ ২৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এই অংক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩.৯৪ শতাংশের মত।

বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা ১ লাখ ৯ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

আয়কর ও মুনাফার উপর কর থেকে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এছাড়া নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ৩৭ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৫৭ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৫৫ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৩ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বৈদেশিক অনুদান থেকে ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা পাওয়া যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

এই বাজেটে আয় ও ব্যয়ের হিসাবে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৬ শতাংশের মত। সাধারণত ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা হলেও এবার তা সম্ভব হয়নি।

এই ঘাটতি পূরণে অর্থমন্ত্রীর সহায় অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণ। তিনি আশা করছেন, বিদেশ থেকে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা ঋণ করে ওই ঘাটতি মেটানো যাবে।

অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।

বিদায়ী অর্থবছরের ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও কোভিড-১৯ দুর্যোগের মধ্যে তা সংশোধন করে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

সামনে গভীর অনিশ্চয়তা রেখেই অর্থমন্ত্রী আশা করছেন, তার নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশের মধ্যে আটকে রেখেই ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব হবে।

মঙ্গলবার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনের শুরুতেই মঞ্জুরি দাবিতে আলোচনা করার কথা জানান। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এসব দাবিতে আলোচনা করেন।

নির্দিষ্টকরণ বিল পাস

আগামী অর্থবছরের বাজেট ব্যয়ের বাইরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সংযুক্ত দায় মিলিয়ে মোট সাত লাখ ৫৯ হাজার ৬৪২ কোটি ৪৪ লাখ ২১ হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে।

এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে গৃহীত অর্থের পরিমাণ পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ২৪ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৮ কোটি ২০ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

সংযুক্ত তহবিলের দায়ের মধ্যে ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ, হাই কোর্টের বিচারপতি ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বেতনও অন্তর্ভুক্ত।

মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব

আগামী অর্থবছরের বাজেটের ওপর সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খাতের ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপির সংসদ সদস্যরা ৪২২টি বিভিন্ন ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন।

এর মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী দলের আলোচনার পর সবগুলো প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, মুজিবল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, লিয়াকত হোসেন খোকা, রওশন আরা মান্নান, বিএনপি হারুনুর রশীদ এবং রুমিন ফারহানা ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো এনেছিলেন।

দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত মঞ্জুরি দাবি সংসদে তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here