২৩টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে অসঙ্গতি

0
517

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড (সিজিসি) পরিপালনের মূল্যায়ন স্বরূপ ‘কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট’ দিয়ে থাকেন ‘কমপ্লায়েন্স অডিটর’। তবে বেশ কিছু কমপ্লায়েন্স অডিটর সঠিকভাবে কোম্পানিগুলোকে কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট দিচ্ছেন না।

২৩টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে কিছু অসঙ্গতি এবং ভুল রয়েছে। ফলে কমপ্লায়েন্স অডিটররা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সেচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) জারি করা সিজিসি যথাযথভাবে পরিপালন করছেন না, যা কর্পোরেট গভর্নেন্স কোডের পুরোপুরি লঙ্ঘন।

পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ডিবেঞ্চার, কর্পোরেট ও ট্রেজারি বন্ড বাদে মোট ৩২০টি কোম্পানির (পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস বাদে) বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান করে সিজিসি পরিপালনগত এসব অসঙ্গতির তথ্য মিলেছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি বিএসইসি’র কমিশনার হেলাল উদ্দিন নিজামী বলেন, এ মুহূর্তে আমরা কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট পাচ্ছি। কমপ্লায়েন্স অডিটর প্যানেল যদি বাধ্যতামূলক করতে চাই তাহলে স্বতন্ত্র কাউকে দিয়ে করাতে হবে। যারা স্ট্যাটুটরি অডিট করেন তাদের দিয়ে এটা করানো হবে না। এখন আমাদের চাটার্ড সেক্রেটারিসহ অন্যান্য প্রফেশনালসরা একটি কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট দিচ্ছে।

তিনি বলেন, কমপ্লায়েন্স অডিট পরিপালনের ক্ষেত্রে যদি কোনো ধরণের সন্দেহ থাকে অথবা আমাদের পর্যবেক্ষণে কোনো সার্টিফিকেশন যথার্থ নয় বলে মনে হয়, সেক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স অডিটের জন্য পৃথক প্যানেল গঠনের বিষয়টি কমিশনে আলোচনা করব।

এদিকে বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৮টি খাতের ৩২০টি কোম্পানির মধ্যে ১০টি খাতের ২০টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটগত অসঙ্গতি ও ৩টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে সিজিসি পরিপালনগত ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। এসব অসঙ্গতিপূর্ণ ও ব্যত্যয় থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাটা সু, বার্জার পেইন্টস ও হাইডেলবার্গ সিমেন্টের মতো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আছে।

এছাড়া আইসিবি, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্কয়ার টেক্সটাইলসের মতো দেশীয় শীর্ষ স্থানীয় কোম্পানিও রয়েছে। আর ২৩টি কোম্পানিকে অসঙ্গতিপূর্ণ সার্টিফিকেট দেয়া কমপ্লায়েন্স অডিটররা সংখ্যা ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস ও ৫ জন কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস রয়েছেন।

অসঙ্গতিপূর্ণ সার্টিফিকেট দেয়া কমপ্লায়েন্স অডিটররা হলেন- হাইডেলবার্গ সিমেন্টের কমপ্লায়েন্স অডিটর হক ভট্টাচার্য দাস এন্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়ামের কমপ্লায়েন্স অডিটর বাটলেরো অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টসের প্রিন্সিপাল জনস এ বাটলেরো, দেশবন্ধু পলিমারের কমপ্লায়েন্স অডিটর এস.আর. ইসলাম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার সাইফুল আলম, নাহি অ্যালুমিনিয়াম ও স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর টি. হোসেন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার মোহাম্মদ আবু কাওসার।

তালিকায় রয়েছে- আইসিবি ও সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর শফিক বসাক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার মো. এনায়েত উল্লাহ, ফাইন ফুডস ও লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের কমপ্লায়েন্স অডিটর রহমান মুস্তাফিজ হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস, রংপুর ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের কমপ্লায়েন্স অডিটর এন.এম তারেক অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস, অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স ও প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর আতিক খালেদ চৌধুরী চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের ম্যানেজিং পার্টনার মো. আতিকুর রহমান, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর কাজী জহির খান অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার নুরুল হোসেন খান।

তালিকায় রয়েছে- প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও বার্জার পেইন্টসের কমপ্লায়েন্স অডিটর ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের সিনিয়র পার্টনার নাসির উদ্দিন আহমেদ, সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর কেএপিএস অ্যান্ড অ্যাসোসিসয়েটস কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার পুলক কুমার দাস, আমরা নেটওয়ার্কের কমপ্লায়েন্স অডিটর মসিহ মুহিত হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্কয়ার টেক্সটাইলসের কমপ্লায়েন্স অডিটর চৌধুরী ভট্টাচার্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার বি.কে ভট্টাচার্য।

আরো রয়েছে- বাটা সু’র কমপ্লায়েন্স অডিটর অরুন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের ম্যানেজেং পার্টনার অরুন কুমার কুন্ডু, দেশ গার্মেন্টসের কমপ্লায়েন্স অডিটর এলটিআর অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টসের সদস্য দেবব্রত দের রায়, ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের কমপ্লায়েন্স অডিটর রহমান মোস্তফা আলম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস এবং শাশা ডেনিমসের কমপ্লায়েন্স অডিটর মজুমদার সিকদার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টস।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২৩টি কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যত্যয় পাওয়া গেছে ৬টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে। কোম্পানিগুলো হলো- অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, বার্জার পেইন্টস, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, বাংলাদেশ থাই অ্যালুমিনিয়াম, ফাইন ফুডস ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এ ৬টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে সিজিসি’র পরিবর্তে ভুলবশত সিজিজি অনুসারে সার্টিফিকেট দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স অডিটর, যা সিজিসি পুরোপুরি লঙ্ঘন।

একইভাবে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স, বার্জার পেইন্টস ও লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের কমপ্লায়েন্স অডিটরদের মতোই কোম্পানি ৩টি সমানভাবে সিজিসি লঙ্ঘন করেছে। কারণ কোম্পানিগুলো সিজিসি’র পরিবর্তে ভুলবশত সিজিজি অনুসারে কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট তৈরি করেছে।

তবে বাংলাদেশ থাই অ্যালুমিনিয়াম, ফাইন ফুডস ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স সিজিসি অনুসরণ করে কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট তৈরি করেছে।

এছাড়া বাকি ১৭টি কোম্পানির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে সমগোত্রীয় ভুল করেছেন সংশ্লিষ্ট কমপ্লায়েন্স অডিটররা।

এ বিষয়ে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও বার্জার পেইন্টসের কমপ্লায়েন্স অডিটর ম্যাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের সিনিয়র পার্টনার নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট দেয়ার সময় হয়তো ভুল হয়েছে। আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরো সতর্ক থাকব।

একই বিষয়ে নাহি অ্যালুমিনিয়াম ও স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর টি. হোসেন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার মোহাম্মদ আবু কাওসার বলেন, কোম্পানি দু’টির কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে ভুলবশত হাইলি সেটিসফ্যাক্টরি অথবা সেটিসফ্যাক্টরি দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সার্টিফিকেটে সেটিসফ্যাক্টরি দেয়ার কথা ছিল।

আইসিবি ও সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স অডিটর শফিক বসাক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে যে অসঙ্গতি হয়েছে, তা ইচ্ছাকৃত নয়, ভুলবশত হয়েছে।

তবে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে যে অসঙ্গতি রয়েছে তা মানতে নারাজ কমপ্লায়েন্স অডিটর কেএপিএস অ্যান্ড অ্যাসোসিসয়েটস কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্টসের পার্টনার পুলক কুমার দাস। তিনি বলেন, আমার মতে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেটে কোনো অসঙ্গতি নেই। আমি যেভাবে সার্টিফিকেট দিয়েছি তা ঠিক আছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুন-উর-রশিদ বলেন, প্রত্যেক কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট অডিটরদের অবশ্যই কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড পরিপালন করতে হবে। এটা পরিপালন করা বাধ্যতামূলক। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সিজিসি পরিপালন অতি জরুরি। এটা পরিপালনে কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকলে, আইনে যা বলা আছে সেটাই করতে হবে। আর যে প্রতিষ্ঠানে কমপ্লায়েন্স যত দুর্বল, সেই প্রতিষ্ঠান তত বেশি নাজুক।

এ বিষয়ে বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সকল কোম্পানির জন্য সিজিসি পরিপালন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যেসব কমপ্লায়েন্স অডিটর সার্টিফিকেট দিচ্ছেন তাদেরকেও সিজিসি’র শর্ত পরিপালন করতে হবে। কোনো কোম্পানি বা কমপ্লায়েন্স অডিটর যদি সিজিসি পরিপালন না করে, তাহলে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here