স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি : ড. আতিউর রহমান

0
588

ড. আতিউর রহমান

২০১৯ সালে ছিল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য খুবই হতাশার বছর। আইএমএফের ধারণা গেল বছর সারা বিশ্বের প্রবৃদ্ধির হার তিন শতাংশের মতো হতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির গতিও ছিল খুবই মন্থর। বিশেষ করে চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই হতাশাজনক। চীনের প্রবৃদ্ধি ১৪% থেকে কমে গেল বছর ৭%-এ নেমে এসেছে। ভারতের প্রবৃদ্ধিও ছিল মাত্র ৪%। সেই তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ছিল সত্যি অবাক করার মতো।

গেল অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা ৮.২৫ শতাংশ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তার মানে পুরো ২০১৯ সাল ধরেই আমাদের প্রবৃদ্ধির হার আট শতাংশের বেশি ছিল। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচেয়ে গতিশীল ছিল আমাদের প্রবৃদ্ধির ধারা।

আমরা আশা করছি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই আমাদের প্রবৃদ্ধির হার দুই ডিজিটে পৌঁছে যাবে। প্রবৃদ্ধির এই স্থিতিশীলতা ও বাড়ন্ত ভাবের পেছনে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির নজরকাড়া অগ্রগতির কথাটি ভুললে চলবে না। আমাদের গ্রামের মানুষের আয় রোজগার বেড়েই চলেছে। আর তাই বাড়ছে ভোগের পরিমাণ। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও চাহিদা দুই-ই বাড়ছে।

কৃষির আধুনিকায়ন এবং পাশাপাশি অকৃষি খাতের প্রসারের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ছে। গ্রামগুলোও ধীরে ধীরে নগরের সুবিধাসমূহ পৌঁছে যাচ্ছে। মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে। গ্রামে রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়ছে। এর প্রভাবেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ছে। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি আরো গতিময় হচ্ছে। আর এ কারণেই গেল বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি আশপাশের দেশগুলোর অর্থনীতির চেয়ে অধিকতর গতিময় থেকেছে।

তা সত্বেও, এ কথা বলা ভুল হবে না যে গেল বছরের ম্যাক্রো অর্থনীতির সূচকগুলোর গতি-প্রকৃতি ছিল মিশ্র। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। মোট অঙ্ক ছিল ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে তা ৭.৫৯% কম। এ বছরের এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল তারচেয়ে ১২% কম তা সত্বেও এই অবস্থা। অথচ এই সময়টায় চীনের রপ্তানি কমে গেছে। এর বিপরীতে ভিয়েতনামের রপ্তানি কিন্তু বেড়েছে দ্রুত লয়ে।

গত বছরের প্রথম ১০ মাসে ভিয়েতনামের গার্মেন্টস রপ্তানি হয়েছে ২৭.৪ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে তা ৮.৭% বেশি। অথচ আমরা পোশাক শিল্পের উন্নয়নে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্সের উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছি। তাই আমাদের পক্ষে ভিয়েতনামের মতোই চীন থেকে চলে আসা বাজার ধরা সহজ ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা এই সুযোগের সদ্ব্যবহার ঠিক তেমনটি করে উঠতে পারিনি।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেশি। ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও কম। পণ্য ও বাজার কেন্দ্রীভ‚ত। রাজস্ব নীতিমালায় স্থিতিশীলতার অভাব। এমন নানা বহু কারণেই আমরা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে পেরে উঠছি না। আরো সবুজ বিনিয়োগ বাড়িয়ে, উপযুক্ত প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং ‘ভেলু-চেইনে’র উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রতিযোগীদের চেয়ে নিজেদের অবস্থান আরো বেশি শক্তিশালী করার সুযোগ কিন্তু আমাদের রয়েছে। এই নয়া সুযোগ ধরে ফেলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বাড়তি নীতি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডসমূহের সঙ্গে বেশি বেশি সহযোগিতা প্রসারের কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি-আমদানি করা উকরণের ওপর এখনো বিপুলভাবে নির্ভরশীল। তাই রপ্তানির গতি কমে গেলে আমদানির গতিও কমতে বাধ্য। পরিসংখ্যানও তাই বলছে। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ মোট আমদানি কমেছে ২.৫%। মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তির হার কমেছে ১২%। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির হার কমেছে ৬%। রপ্তানি ও আমদানির এ শ্লথগতির প্রভাব রাজস্ব আদায়ের ওপরও পড়েছে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর সংগ্রহের মন্থর গতি যোগ করে বলতে পারি যে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে আমরা গেল বছর লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ পেছনেই ছিলাম।

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমাদের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল ২০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই সময়টায় প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৪%। অথচ চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৫% বেশি ধরা হয়েছে। ভ্যাট আদায় কমার বড় কারণ মাঠ পর্যায়ের অদক্ষতা। অর্থবছরের ছয় মাস চলে গেলেও ভ্যাট প্রদানকারী বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ‘ফিসকাল সার্ভিস ডিভাইস’ (এফএসডি) এখনো পৌঁছেনি। জানুয়ারি থেকে এগুলো স্থাপনের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। বাস্তবায়নের এই ধীর গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট আদায়ের যে উচ্চাশা বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছিল তার ওপর পানি ঢেলে দিয়েছে।

অন্যদিকে ভ্যাটের নানা স্তরে পুরনো দিনের প্যাকেজ ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়াও থমকে দাঁড়িয়ে আছে। এই দ্বিধা ভ্যাট আদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজস্ব আদায়ের এই শ্লথগতির প্রভাব কি পড়েছে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ নেয়ার আগ্রহের ওপর? এ প্রশ্ন পর্যবেক্ষকদের মনে উঠতেই পারে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার হার বেড়েছে ৪৫%। মনে হয় পুরো অর্থবছর জুড়েই এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এর নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি খাতে দেয়া ব্যাংক ঋণের হারের ওপর নিশ্চয় পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতির টার্গেট থেকে ব্যক্তি খাতে ঋণ দেয়ার হার উল্লেখযোগ্য হারে পিছিয়ে আছে। ছয় মাসের টার্গেট ছিল ১৬.৫% প্রবৃদ্ধির। এর বিপরীতে অক্টোবর শেষে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের হার নেমে এসেছে ১০%।

নভেম্বরের হিসাব পেলে এই হার ‘সিঙ্গেল’ ডিজিটে নেমে এলে অবাক হব না। গেল বছর ১ জুলাই থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৪৭ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। সরকার এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯ হাজার ৮৭৭ কোটি এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ থেকে ঋণ নিয়েছে ৩৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। ৯ ডিসেম্বর ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। ১০টি মেগা প্রকল্প অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এগুলোর বাস্তবায়নের গতি থামানো যাবে না।

তাই এনবিআর আরো সক্রিয় না হলে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার আগ্রহ কমবে বলে মনে হয় না। তবে বেশি সুদে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সংগ্রহের চেয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার ফলে সরকারের খরচ খানিকটা কমেছে। তা সত্তে¡ও এ কথাটি বোধ হয় বলা উচিত যে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা দুই বাড়ানোর আরো সুযোগ রয়েছে। একে তো প্রকল্প সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না। তার ওপর যদি ব্যয় ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ও অপচয় বিরাজ করে তাহলে সরকারের পক্ষে সার্বিক বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ মুশকিল হবে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়বে ব্যক্তি খাতের ঋণের সরবরাহের ওপর।

মূল্যস্ফীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেক কষ্টে আমরা মূল্যস্ফীতির ‘জিনটি’ বোতলে ভরেছিলাম। আমাদের রাজস্ব নীতি বিভ্রাটের কারণে যেন এই অর্জন বিফলে না যায়। তবে এখনো পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। সর্বশেষ যে তথ্য মিলছে তাতে মনে হচ্ছে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫.৪২%। নভেম্বরে এসে তা ৬.০৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অক্টোবরেও তা ছিল ৫.৪৭%। ২০১৮ সালে প্রতি মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৫৫ শতাংশ। নভেম্বর পর্যন্ত ২০১৯ সালের মাসিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৫৭%।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার সঙ্গে অন্যান্য খাদ্যমূল্যও খানিকটা বেড়ে যায়। এসবের প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতির ওপর। তা সত্তে¡ও গেল বছর মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীলই ছিল বলা চলে। আতংকিত হওয়ার কিছু নেই এই পরিস্থিতি নিয়ে। বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করেছে গেল বছরের পুরোটা জুড়েই। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এক ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৩.৯০ টাকা। ২০১৯-এর নভেম্বরে তা এক টাকা বেড়ে ৮৪.৯০ টাকা হয়েছে। খোলা বাজারে এই হার আড়াই টাকা বেশি। এতটা ফারাক মোটেও কাক্সিক্ষত নয়।

পোশাক রপ্তানি শিল্পের মালিকরা চাইছেন তাদের জন্য আলাদা করে টাকার অবমূল্যায়ন। বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য তারা এই দাবি করছেন। ইতোমধ্যে প্রবাসী আয় প্রবাহে ২% প্রণোদনা দেয়ার ফলে ভালো ফল পেয়েছে সরকার। অনুমান করা হচ্ছে ২০১৯ বছর শেষে রেমিট্যান্স ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৮ সালে তা ছিল ১৫.৫৫ বিলিয়ন ডলার। তার মানে এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে প্রায় ২৯%। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলে থাকেন যে পর্যাপ্ত হারে টাকার অবমূল্যায়ন করা গেলে এই প্রণোদনার হয়তো প্রয়োজন হতো না।

সরকারের বাজেট থেকে অর্থ বের করতে হতো না। একইসঙ্গে পোশাক শিল্পসহ রপ্তানি খাতের লাভ হতো। কিন্তু মূল্যস্ফীতির ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তো সে কথাটাও মনে রাখা চাই। সাময়িক অবমূল্যায়ন প্রয়োজনে হতেই পারে বিশেষ বিশেষ পণ্য বা সার্ভিসের ক্ষেত্রে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অবমূল্যায়নের চ্যালেঞ্জের কথাও মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে আমদানি করা কাঁচামাল, খাদ্য ও যন্ত্রপাতির মূল্যমানের ওপর এর যে কু-প্রভাব পড়তে পারে সে দিকটাও নীতিনির্ধারকদের খেয়াল রাখতে হবে।
গেল বছর এফডিআই ইতিবাচক ধারাতেই ছিল।

২০১৮ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর নাগাদ এফডিআই এসেছিল ১৫৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০১৯ সালে ওই সময়ে এফডিআই এসেছে ১৬৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধির হার ৫.৩৬। পরিমাণের দিক থেকে অঙ্কটি ভিয়েতনামের তুলনায় সামান্য হলেও বছরে বছরে তা বাড়ছে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে আমাদের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি করতে হবে। সরকারের নেয়া মেগা প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো, তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা গেলে এফডিআই প্রবাহ আরো দ্রুত গতিতে বাড়বে।

তবে যেসব বিনিয়োগকারী আগ্রহ ভরে বাংলাদেশে এসেছেন তাদের স্বার্থ ও নীতি পরম্পরা দেখার দায়িত্ব আমাদের। তারা যেসব প্রণোদনা দেখে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এসে যদি দেখেন হঠাৎ হঠাৎ রাজস্ব নীতি বদলে যাচ্ছে তাহলে তারা নিরাশ হবেন। সেজন্য সম্প্রতি বাংলাদেশে জাপানি রাষ্ট্রদূত যে কথাটি বলেছেন তা প্রণিধানযোগ্য।

তিনি বলেছেন, যারা বাংলাদেশে এসে বিনিয়োগ করেছেন তাদের দেখভাল করার প্রয়োজন রয়েছে। তারা যদি বাংলাদেশকে বিনিয়োগ সহায়ক বলে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেন তাহলে এফডিআই প্রবাহ নিশ্চয় বাড়বে। সেজন্য আমাদের সহজে ব্যবসা করার সূচকে বড় ধরনের উন্নতি করতে হবে। এ নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে আরো ভালো উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রদূত বলেছেন যে, গত দশ বছরে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী জাপানি উদ্যোক্তাদের সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে তিন শতে উন্নীত হয়েছে। জাপানি সহায়তাভিত্তিক মেগা প্রকল্পসহ মাতারবাড়ি প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এক আদর্শ দেশ হিসেবে গণ্য হবে বলে মান্যবর রাষ্ট্রদূতের বিশ্বাস। আমিও মনে করি দ্রুত এসব অবকাঠামো উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ এক আকর্ষণীয় বিনিয়োগ অভিমুখী হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারবে।

রেমিট্যান্স ও এফডিআই প্রবাহের ধারা ইতিবাচক থাকলেও মূলত আমদানি ও রপ্তানি আয়ের মধ্যে পার্থক্য বিরাট হওয়ার কারণে চলতি মূলধনে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালে এই ঘাটতি খানিকটা কমেছে। তা সত্তে¡ও তা ঋণাত্মক। তাই আমাদের টাকার বিনিময় হারের ওপর চাপ রয়েই যাচ্ছে। এসবের সার্বিক প্রভাব আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর পড়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আমাদের রিজার্ভ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ বছরের নভেম্বরে তা দাঁড়িয়েছিল ৩১.৭ শতাংশ। তার মানে রিজার্ভ সেভাবে আর বাড়ছে না।

গেল বছরের অর্থনীতির এসব সূচকের গতি-প্রকৃতি অনেকটাই ছিল মিশ্র। তবুও সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপার্শি বাংলাদেশের অর্জন দেখলে খুশিই হতে হয়। বিশেষ করে, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশের অর্থনীতির মন্থর গতির আলোকে দেখলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারাটা বেশ উজ্জ্বলই মনে হয়।

তা সত্বেও আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে, গেল বছর ধরেই আর্থিক খাত নিয়ে এমন সব নেতিবাচক আলাপ-আলোচনা গণমাধ্যমে এসেছে সেসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের আরো সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নিয়ে যেসব আলাপ-আলোচনা হয়েছে তার মূলে ছিল খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি। সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণের ১২% খেলাপি হয়ে গেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে। এই পরিমাণ খেলাপি ঋণের সমান অঙ্ক প্রভিশনিং করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে।

সিআরআর, এসএলআর এবং প্রভিশনিং যোগ করলে প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থই বিনিয়োগ যোগ্য নয়। বাদবাকি অর্থ বিনিয়োগ করে ডেপোজিটের বিপরীতে খরচ, প্র্রশাসনিক খরচ ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচসহ মোট খরচ মিটিয়ে লাভ করাই মুশকিল। আর ঋণ আদায়ের হারও গত বছর টার্গেটের চেয়ে ৪৫% কমে গেছে। ঋণখেলাপিদের আরো ছাড় দেয়া হবে সেই প্রত্যাশায় অনেক ভালো উদ্যোক্তাও সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করছেন না। ফলে ঋণ ফেরতের গতি কমে গেছে। তাই ব্যাংকিং খাত গেল বছর চ্যালেঞ্জের মধ্যেই পাড়ি দিয়েছে।

আর পুঁজি বাজারের কথা নাইবা বললাম। আশপাশের দেশের প্রবৃদ্ধির হার আমাদের চেয়ে অনেকটাই কম থাকা সত্তে¡ও তাদের পুঁজিবাজারের সূচনাগুলো আমাদের মতো এতটা বিবর্ণ নয়। এর পেছনে মূল কারণ নিশ্চয় আমাদের পুঁজি বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব। বাজারটিকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু জবাবদিহিতার আওতায় এনে এর সুশাসন নিশ্চিত না করা গেলে সহজেই এই আস্থার সংকট কাটবে বলে মনে হয় না।

সার্বিকভাবে অর্থনীতির চাঙ্গাভাব বজায় থাকা সত্তে¡ও কেন পুঁজি বাজারের এই দুরবস্থা সে প্রশ্নের মুখোমুখি সংশ্লিষ্ট রেগুলেটর ও সরকারকে অবশ্য হতে হবে। শুধু অর্থ ঢেলে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে মনে হয় না। তবে তারল্যহীনতার প্রভাবকেও একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মাঝে সমন্বয় বাড়লে এবং শক্ত হাতে বাজারটি পরিচালনা করা গেলে নিশ্চয় বর্তমানের হতাশাজনক পরিস্থিতি থেকে উতরে যেতে পারব।

সবশেষে, নানা চ্যালেঞ্জ সত্তে¡ও গেল বছরের অর্থনীতি অন্যান্য অনেক সমমানের দেশের অর্থনীতির চেয়ে যে ভালো ‘পারফর্ম’ করেছে সে কথাটি জোর দিয়েই বলা যায়। এই অর্জনের জন্য আমাদের কৃষক, ক্ষুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তা, প্রবাসকর্মী, রপ্তানি খাতে নিয়োজিত পরিশ্রমী কর্মীর কৃতিত্বের কথা স্বীকার করতেই হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের যে ধারা বর্তমান সরকার চালু করেছে এবং ডিজিটালি প্রযুক্তির সংযোজন ঘটিয়ে তাকে আরো বেগবান করার চেষ্টা করছে সেই কৌশলটিই আসলে আমাদের অর্থনীতির এভাবে এগিয়ে চলার বড় শক্তির উৎস। এই ধারা নতুন বছরে আরো জোরদার হোক সেই প্রত্যাশাই করছি।

  • লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here