সেকেন্ডারি মার্কেটে বন্ড লেনদেনে কমছে চার্জ, বাড়ছে ব্যক্তি বিনিয়োগ

0
290

সিনিয়র রিপোর্টার : সরকারের ইস্যু করা বন্ড বা ঋণপত্রে ব্যক্তি বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। অথচ বন্ডে বিনিয়োগ হতে পারে ব্যাংক আমানত এবং শেয়ার কেনার ভালো বিকল্প। এ বাস্তবতায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তি বিনিয়োগে নতুন করে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

বন্ডের সেকেন্ডারি বাজারে লেনদেনে ব্রোকারেজ চার্জ কমানো হচ্ছে। প্রত্যেক ব্যাংকে বন্ডে বিনিয়োগের জন্য উইন্ডো স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দৈনিক লেনদেনের দর ঘোষণা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচারসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, জমা রাখা টাকা তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগের ফলে সুদ কম থাকলেও মানুষের সঞ্চয়ের বড় অংশই থাকে ব্যাংকে। তুলনামূলক বেশি সুদের কারণে একটি অংশ ঝোঁকেন সঞ্চয়পত্রের দিকে। অবশ্য সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার বিনিয়োগসীমা নির্ধারণ, টিআইএন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক থাকাসহ নানা কারণে অনেকেই আগের মতো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারছেন না।

অন্যদিকে ব্যাংকে আমানতের সুদহার অনেক কমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিকল্প বিনিয়োগের উৎস হতে পারে। এর একটি অন্যতম সুবিধা হলো, শেয়ারে বিনিয়োগের তুলনায় ঝুঁকি কম। মেয়াদ শেষে নির্দষ্ট মুনাফা পাওয়া যায়। সুদ আয়ের ওপর কোনো উৎসে কর কাটা হয় না।

ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা বন্ডে বিনিয়োগে কর রেয়াতও পান। বর্তমানে তিন মেয়াদের ট্রেজারি বিল ও পাঁচ মেয়াদের ট্রেজারি বন্ড প্রচলিত আছে। ট্রেজারি বিলের মেয়াদ ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিন। ট্রেজারি বন্ড ২, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সরকারি বিল ও বন্ডে ব্যক্তি বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৫৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে ছিল ৪০৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বেড়েছে ৩৫২ টাকা বা ৮৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর পাঁচ বছর আগের তুলনায় ২০৫ শতাংশ।

জানা গেছে, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমার মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মী বা তাদের আত্মীয়-স্বজন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বেশিরভাগই বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে জানেন না।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, মানুষের হাতে টাকা থাকলে তাকে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ট্রেজারি বিল ও বন্ড একটি ভালো উপায়। ব্যাংকগুলো এখানে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন এবং তারল্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাধ্যবাধকতার কারণে। তবে ব্যক্তি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ভালো মুনাফার পাশাপাশি যে কোনো সময় ভাঙানোর সুযোগ রাখতে হবে। শেয়ারের মতো সেকেন্ডারি বাজারে বন্ডের লেনদেনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারের ইস্যু করা বিল এবং বন্ডকে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড বলা হয়। কোনো বিনিয়োগকারী যে কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে ‘সিকিউরিটিজ অ্যাকাউন্ট’ খুলে এক লাখ টাকা বা তার গুণিতক যে কোনো অঙ্ক বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং সেকেন্ডারি লেনদেন করতে পারেন। নির্দষ্ট সময় অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংকে নিলাম হয়। এটি প্রাথমিক বাজার।

ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রাথমিক বা সেকেন্ডারি বাজার থেকে বিল বা বন্ড কিনতে পারেন। তবে এই সেকেন্ডারি বাজার ঠিক মতো কার্যকর হয়নি। বেশ আগে থেকে পুঁজিবাজারে ৫, ১০, ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি ২২১টি বন্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এসব বন্ডের এরই মধ্যে ১১৭টির মেয়াদ শেষ হয়েছে।

জানা গেছে, ব্রোকারেজ চার্জ কমিয়ে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই পুঁজিবাজারে বন্ডের সেকেন্ডারি বাজার কার্যকরের জোর চেষ্টা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এখন সফটওয়্যার ও কারিগরি উন্নয়ন এবং চার্জ নির্ধারণের কাজ চলছে।

বর্তমানে শেয়ারবাজারে প্রতি লেনদেনে ১০০ টাকায় ৫০ পয়সা পর্যন্ত ব্রোকারেজ চার্জ দিতে হয়। এর মানে এক লাখ টাকার বন্ড বেচাকেনায় ৫০ টাকা পর্যন্ত চার্জ লাগে। তবে বন্ডের মুনাফা থাকে খুব সামান্য। যে কারণে এই চার্জকে শেয়ারবাজারে সেকেন্ডারি লেনদেনে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

শুধু বন্ড কেনা-বেচায় নামমাত্র ব্রোকারেজ চার্জ বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রস্তাবে এক লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত বন্ডের লেনদেনে ১০ টাকা, এক কোটি থেকে পাঁচ কোটি টাকার লেনদেনে ৫০ টাকা এবং ৫০ কোটি থেকে যে কোনো অঙ্কের লেনদেনে ১০০ টাকা চার্জের কথা বলা হয়েছে।

ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার আর্থিক বাজারের সুদহারের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল। বাজারে সুদহার কমে আসায় বন্ডের সুদহারও কমেছে। গত সেপ্টেম্বরে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ছিল গড়ে ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

গত অর্থবছরে বিভিন্ন মেয়াদের বন্ডের সুদহার ৭ থেকে ১০ শতাংশ ছিল। বাজারে সুদহার কমলে সেকেন্ডারি বাজারে পুরোনো বন্ডের চাহিদা বাড়ে। অন্যদিকে বাজারে সুদহার কমলে নতুন বন্ডের চাহিদা কমে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here