সিনিয়র রিপোর্টার : অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দুই সপ্তাহ আগে ৯ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংককে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাংকগুলো হচ্ছে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল)।

প্রস্তুতি নিতে তাদের ছয় মাস সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা (এমডি) একযোগে বলেছেন, শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে তাঁদের কোনো প্রস্তুতি নেই। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতি কিছুটা আছে শুধু অগ্রণী ব্যাংকের।

এরপর থেকেই কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আর্থিক খতে। এগুলো হচ্ছে আসলেই কি ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে আসবে?

বৈঠকটির কার্যবিবরণী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), অর্থ বিভাগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং পাঁচ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে ১৬ ফেব্রুয়ারি।

কার্যবিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশের শেয়ারবাজার অর্থ বাজারকে অনুসরণ করছে না। এ ছাড়া দেশের বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেশি। এ কারণে বাজারের যথাযথ উন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। বাজারকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে হলে এর ভিত্তি মজবুতের ওপর জোর দিতে হবে।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদারও বলেছেন, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে শিল্পায়নের অগ্রগতির সঙ্গে শেয়ারবাজারের অগ্রগতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিল্পায়নের পুঁজির বড় অংশ আসছে বরং ব্যাংক খাত থেকে। অথচ এই পুঁজি আসার কথা ছিল শেয়ারবাজার থেকে। ফলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে গরমিল হচ্ছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়।

অর্থসচিব বলেন, শিল্পায়নের পুঁজির জন্য তাই শক্তিশালী শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে হবে। আর এ কারণেই বাজারে দরকার ভালো শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি। আপাতত অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও বিডিবিএলের ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রস্তুতি নিতে সময় দেওয়া হয়েছে ছয় মাস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও সিরডাপের পরিচালক হেলাল উদ্দিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শেয়ার ছাড়ার পরিকল্পনাকে সরকারের ‘ভুল পদক্ষেপ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বাজার ভুগছে এখন চাহিদার অভাবে, সরবরাহের অভাবে নয়। আর ভালো সরবরাহ অবশ্যই বাজারের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু আমার প্রশ্ন, তালিকাভুক্তির জন্য যে ব্যাংকগুলোর নাম শোনা যাচ্ছে, এগুলো কি ভালো শেয়ার হবে?’

আস্থার জন্য সরকারি কোম্পানি : ওই বৈঠকে বিএসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি কোম্পানির শেয়ার এলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। এতে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে শিল্পায়নের পুঁজি জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।’ আর ব্যাংকগুলোকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে আনা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

অর্থসচিব জানান, ২ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের রাষ্ট্রমালিকানাধীন সাতটি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে ২০০৫ সালেই এমন সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এরপর বিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর ১০ বছরের দায়িত্ব পালনকালে বহুবার সিদ্ধান্ত নিলেও কার্যকর করতে পারেননি।

অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালকে ওই দিন তাই সরকারি কোম্পানি নিয়ে বেশি কিছু বলতে দেখা যায়নি। বলেছেন শুধু ব্যাংক নিয়ে। তিনি বলেন, রূপালী ব্যাংক যেহেতু ১৯৮৬ সাল থেকেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আছে, তাই এর শেয়ার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাজারে আসতে পারে।

রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদুল্লাহ আল মাসুদ জানান, তাঁর ব্যাংকের ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ ইতিমধ্যেই শেয়ারবাজারে আছে। এর মধ্যে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার বর্তমানে ৩০ টাকার মতো দরে বেচাকেনা হচ্ছে। এখন দরকার হচ্ছে রূপালী ব্যাংকের নিট সম্পদ মূল্য পুনর্মূল্যায়ন করা এবং এরপর আরও শেয়ার ছাড়া।

সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, বাজারের পরিস্থিতি ও শেয়ারের মূল্য বিবেচনায় প্রয়োজনে দুটি ধাপে রূপালী ব্যাংকের আরও শেয়ার ছাড়া যেতে পারে।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের সাবেক শিক্ষক বাকী খলীলী এ নিয়ে বলেন, যেহেতু বলা হয় যে সরকারি কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, এদিক থেকে রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকের শেয়ার ছাড়ার উদ্যোগটি ইতিবাচক। কিন্তু সুশাসনের প্রশ্নটিও কম বড় নয়। আবার বাজারে আসার পর পরিচালনা পর্ষদে শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব রাখার চিন্তা সরকারের থাকবে কি না, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। নইলে আপাতত ভালো মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই তালিকাভুক্তি ক্ষতিও বয়ে আনতে পারে।

গভর্নরের পরামর্শ ‘পর্যায়ক্রমে’ : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির সবার আগে রূপালী ব্যাংকের শেয়ার এবং তার পরেই আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় বিডিবিএলের শেয়ার ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গভর্নর বলেছেন, এই দুটির পরে অগ্রণী ব্যাংক এবং সবার শেষে জনতা ব্যাংকের শেয়ার ছাড়া সংগত হবে।

গভর্নর সোনালী ব্যাংকের নাম উচ্চারণ করেননি। তবে বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত হয়, সোনালী ব্যাংক যেহেতু রাষ্ট্রীয় কোষাগারের (ট্রেজারি) কাজ করে, তাই এই ব্যাংকের শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলো ২০০৭ সালে কোম্পানি হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে। এরপর ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার বাজারে এই ব্যাংকগুলোর সরকারি শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান তিনি।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, প্রতিটি ব্যাংকেরই পরিশোধিত মূলধন অনেক বেশি। এগুলো বাজারে এলে তো সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমেই আসবে। প্রশ্ন হচ্ছে, খেলাপি ঋণের যে বোঝা ব্যাংকগুলোর ওপর আছে, তারা কি ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে পারবে? তা যদি না পারে, আমি বলব, বাজারে তাদের আসা উচিত হবে না।

ব্যাংকগুলোকে বাজারে আনা হলে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে আগে নিবিড় সমীক্ষা করা উচিত বলে মনে করেন ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী।

বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্রতিটি সরকারি ব্যাংক স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তাদের পরিচালনা পর্ষদের সভায় শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা করবে। শেয়ার ছাড়া কার্যক্রমে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। কার্যক্রম সঠিকভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে পরিপালনের জন্য আইসিবির সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর সহযোগী মার্চেন্ট ব্যাংক যৌথভাবে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

এ ছাড়া সরকারি ব্যাংকের শেয়ার ছাড়ার কার্যক্রম তদারক করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদ্য গঠন করা পুঁজিবাজার উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here