রবি ও গ্রামীণফোনের নির্বাহী পদে অস্থিরতা

0
948

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ২০০৯ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় গ্রামীণফোন লিমিটেড। কোম্পানিটির আইপিও প্রক্রিয়া চলাকালে এর তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এন্ডারস ইয়েনসেন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এর এক বছরের মধ্যেই কোম্পানিটির আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী পদত্যাগ করেন।

একইভাবে গত বছর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ কোম্পানি রবি আজিয়াটার সিইও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ তার চুক্তি শেষ হওয়ার দুই মাস আগে সম্প্রতি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। আইপিওতে আসার পরেই টেলকো কোম্পানির সিইওদের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।

বর্তমানে ছুটিতে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত মাহতাব উদ্দিন আহমেদ ৫ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রবি আজিয়াটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এ বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ রয়েছে। এ সময় দায়িত্ব পালনকালে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

তার এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে রবির পক্ষ থেকেও বিষয়টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়। এতে বলা হয়, রবির সিইও ও এমডি হিসেবে সফলতার সঙ্গে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন শেষে মাহতাব উদ্দিন আহমেদ তার চুক্তি আর নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ৩১ অক্টোবর রবির সিইও হিসেবে তার মেয়াদ শেষ হবে।

এ সময় পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটিতে থাকবেন। মাহতাব উদ্দিন আহমেদের অনুপস্থিতিতে রবির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) এম রিয়াজ রাশিদ নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত সিইওর দায়িত্বও পালন করবেন।

মাহতাব উদ্দিন আহমেদ প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে ২০১০ সালে রবি আজিয়াটায় যোগ দেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। সে বছরের এপ্রিলে তিনি কোম্পানিটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি সিওও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একই বছরের ১ নভেম্বর মাহতাব উদ্দিন আহমেদ রবি আজিয়াটার ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পান। এর পাশাপাশি তিনি নেপালের শীর্ষ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি এনসেল প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। রবিতে যোগ দেয়ার আগে মাহতাব উদ্দিন আহমেদ ইউনিলিভারে ১৭ বছর কাজ করেছেন। তিনি ইউনিলিভার পাকিস্তান, ইউনিলিভার আরব ও ইউনিলিভার বাংলাদেশের বিভিন্ন পদে ছিলেন।

রবির সিইও পদত্যাগের ঘোষণা আসার পর বিষয়টি নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিভিন্ন গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন রবির পর্ষদ তার চুক্তির মেয়াদ নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে তিনি এর আগেই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে নিজের মান রক্ষা করেছেন। সিইওর পদ ছাড়ার পর নিজেই ব্যবসা শুরু করবেন বলেও বাজারে গুঞ্জন রয়েছে।

এক্ষেত্রে মাহতাব উদ্দিন আহমেদ তার বন্ধু শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খানের সঙ্গে মিলে ব্যবসা করতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকেই। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলেও মাহতাব উদ্দিন আহমেদ সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান বলেন, মাহতাবের পদত্যাগের বিষয়টি অন্য সবার মতো আমিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছি। তার সঙ্গে এ বিষয়ে এখনো আমার কোনো কথা হয়নি। তবে আমার সঙ্গে ব্যবসা করার যে গুঞ্জন রয়েছে সেটির কোনো ভিত্তি নেই।

এছাড়া আমাদের দেশের করপোরেট জগতে একটা সময় পর্যন্ত সিইওদের মধ্যে শুধু চাকরি করেই অবসরে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। অথচ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিইওদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চাকরি করার পর নিজস্ব ব্যবসা কিংবা উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে দেখা যায় হরহামেশাই। আমাদের দেশেও এ প্রবণতা শুরু হয়েছে। মাহতাব উদ্দিন আহমেদের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করছি তিনি ভালো ও সম্মানজনক কোনো উদ্যোগের সঙ্গেই থাকবেন।

মাহতাব উদ্দিন আহমেদ তার পারিবারিক ব্যবসা ব্রোকারেজ হাউজ ডিএসএফএম সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবসায় মনোনিবেশ করবেন বলেও মনে করছেন বাজারের একটি পক্ষ। ব্রোকারেজ হাউজটির প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন মাহতাব উদ্দিন আহমেদের পিতা সালাহউদ্দিন আহমেদ। বর্তমানে ব্রোকারেজটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন মাহতাব উদ্দিন আহমেদের ভাই সাদ আহমেদ। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রবি থেকে পদত্যাগ করার সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

দেশের পুঁজিবাজারে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রবি আজিয়াটার শেয়ার লেনদেন শুরু হয়। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ৭৪১তম কমিশন সভায় রবিকে ১০ টাকা ইস্যু মূল্যে ৫২ কোটি ৩৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৪টি সাধারণ শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেয়া হয়।

এর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৫২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪০ টাকা সংগ্রহ করেছে রবি। আইপিওর মাধ্যমে উত্তোলিত তহবিল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৫১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও বাকি ৮ কোটি ২ লাখ টাকা আইপিওর ব্যয় নির্বাহ খাতে খরচ করবে।

৫ হাজার ২৩৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি রবির মোট শেয়ার সংখ্যা ৫২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৫। এর মধ্যে ৯০ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে। এছাড়া ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বাকি ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।

তালিকাভুক্তির পর এক মাসের মধ্যেই রবির ১০ টাকার শেয়ারের দর ৭৭ টাকা ১০ পয়সা পর্যন্ত উঠে যায়। এছাড়া ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২০ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা না করার সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনার মুখে পড়ে রবি। বিএসইসির পক্ষ থেকেও কোম্পানিটির কাছে এ ধরনের ঘোষণার কারণ জানতে চাওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সমালোচনা এড়াতে চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের ভিত্তিতে ৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে রবি।

আইপিওর আগে ও পরে পুঁজিবাজারে সাড়া ফেলেছিল গ্রামীণফোন। একশ্রেণীর প্রতারক চক্র কোম্পানিটির প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। আইপিওতে আসার আগে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ৪৮৬ কোটি টাকা উত্তোলন করে গ্রামীণফোন। আর আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করে ৪৮৬ কোটি টাকা। গ্রামীণফোনের শেয়ার কেনার জন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব খোলার ধুম পড়ে যায়। পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরুর দিন সূচকে ৭০০ পয়েন্ট যোগ করে গ্রামীণফোনের শেয়ার।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতিকালে অবৈধ ভিওআইপি সংশ্লিষ্টতার কারণে গ্রামীণফোন ও এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আইনগত পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানাও গুনতে হয়েছে গ্রামীণফোনকে। ২০০৭ সালের শেষ দিকে অবৈধ ভিওআইপির সঙ্গে জড়িত থাকায় গ্রামীণফোনকে প্রথম দফায় ১৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আর ২০০৮ সালের শুরুর দিকে গ্রামীণফোনে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভিওআইপির যন্ত্রপাতি উদ্ধারের পর আবার ২৫০ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

অবৈধ ভিওআইপির অভিযোগে একটি মামলাও দায়ের করা হয় সে সময়। মামলায় গ্রামীণফোন ছাড়াও এর সাবেক প্রধান নির্বাহী এরিক অস ও ওলা রি, সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর থর রান্ডহগ, সাবেক চিফ টেকনিক্যাল অফিসার যোগেশ সঞ্জিব মালিক, সাবেক সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিরেক্টর মেহবুব চৌধুরী, রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর খালিদ হাসান, চিফ টেকনিক্যাল অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিরেক্টর কাফিল এইচ এস মুঈদ, চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মো. আরিফ আল ইসলাম ও হেড অব রেভিনিউ অ্যাসুরেন্স এসপেন উইগ ওয়ারেনডরফকে আসামি করা হয়েছিল।

আইপিও প্রক্রিয়া চলাকালে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে কোম্পানি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন গ্রামীণফোন লিমিটেডের তত্কালীন সিইও এন্ডারস ইয়েনসেন। যদিও ২০০৭ সালের অক্টোবরে নিয়োগ পাওয়া ইয়েনসেনের মেয়াদ ছিল ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। পারিবারিক কারণ ছাড়াও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতি, শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ভিওআইপি কেলেঙ্কারির কারণে সিইও হিসেবে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন ইয়েনসেন। তার পদত্যাগের এক বছরের মধ্যেই ২০০৯ সালের আগস্টে গ্রামীণফোনের সিএফও মো. আরিফ আল ইসলাম ও সেপ্টেম্বরে প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা রুবাবা দৌলা পদত্যাগ করেছিলেন।

আইপিওর সঙ্গে বহুজাতিক টেলিযোগাযোগ কোম্পানির সিইওদের পদত্যাগের রহস্যজনক সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে বলে মনে করছেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকাররাও। এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারের সঙ্গে কথা হয়। তাদের অভিমত হচ্ছে আইপিওর আগে থেকেই রবির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তালিকাভুক্তির পর পরই বিনিয়োগকারীদের জন্য নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয়ার সক্ষমতা না থাকলেও সেই শেয়ারের দর ৭৭ টাকায় উঠে যাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। বহুজাতিক হিসেবে রবির মতো এমন দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানি দেশের পুঁজিবাজারে এর আগে কখনই আসেনি। এসব কারণে কোম্পানিটির ব্র্যান্ড ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রেও আইপিওর আগে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আইপিওকালীন এসব বিতর্ক পরবর্তী সময়ে কোম্পানিগুলোর সিইওদের চুক্তি নবায়ন করা না করার সিদ্ধান্তে প্রভাব রেখেছে বলে মনে করছেন তারা।

সূত্র : বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here