মুমূর্ষু বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপ কিভাবে চলছে !

0
910

ডেস্ক রিপোর্ট : মো. মোজাম্মেল হকের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি এজেন্ট হিসেবে। যদিও কঠোর পরিশ্রমী মোজাম্মেল হক স্বপ্ন দেখতেন উদ্যোক্তা হওয়ার। ১৯৭৯ সালে আঞ্চলিক উদ্যোক্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় বঙ্গজ বিস্কুটের কারখানা গড়ে তোলেন তিনি।

এরপর ব্যবসা সম্প্রসারিত হতে হতে এক সময় বঙ্গজ হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় পোশাক ও বস্ত্র এমনকি গণমাধ্যম শিল্পেও। বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপ হয়ে ওঠে দেশের সম্ভাবনাময় এক শিল্প গ্রুপ।

২০১৭ সালে মারা যান মো. মোজাম্মেল হক। এরপর ব্যবসার হাল ধরেন তার উত্তরসূরিরা। প্রথম প্রজন্মের দেখানো পথে ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দূরের কথা, গোটা ব্যবসাই এখন খোয়াতে বসেছেন তারা। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বন্ধ হয়েছে। যেগুলো টিকে রয়েছে সেগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

পুঁজিবাজারে বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান তিনটি। এর মধ্যে ১৯৮৪ সালে বঙ্গজ লিমিটেড, ১৯৯০ সালে তাল্লু স্পিনিং মিলস লিমিটেড ও ১৯৯৪ সালে মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এর মধ্যে তাল্লু স্পিনিং ও মিথুন নিটিং এখন বন্ধ।

করোনার কারণ দেখিয়ে গত বছরের ৭ এপ্রিল থেকে তাল্লু স্পিনিং মিলস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং লিমিটেডের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে।

১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠা পেলেও বঙ্গজ বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে ১৯৮১ সালে। দেশের বিস্কুটের বাজারে এক সময় বেশ নামডাক ছিল বঙ্গজের। বর্তমানে কোম্পানিটির উৎপাদন চালু থাকলেও ব্যবসায় আগের সেই জৌলুশ আর নেই। ক্রমেই প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বঙ্গজ।

২০১৯-২০ হিসাব বছরে ২৫ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে কোম্পানিটির। যেখানে একই সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আরেক বিস্কুট কোম্পানি অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের বিক্রি ছিল ১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অথচ ভোক্তাদের কাছে বঙ্গজের বেশ কয়েক ধরনের বিস্কুট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যনতুন পণ্য আনার মাধ্যমে ব্যবসায়িক পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনতে পারেনি বঙ্গজ। এটি কোম্পানিটির ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ার বড় একটি কারণ। যদিও মোজাম্মেল হকের জীবদ্দশায়ই বঙ্গজের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২০১১ সালে গাজীপুর জেলার শ্রীপুরের মাওনায় তিন গুণ সক্ষমতার নতুন প্রকল্প চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও বিস্কুট রফতানি করার কথা ছিল।

পুঁজিবাজার থেকে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনাও ছিল। ২০১৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিস্কুট রফতানির উদ্দেশ্যে এক্সিমপো ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা জানানো হয়।

এছাড়া ২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে বিস্কুট রফতানির জন্য ২০১৯ সালে রয়্যাল গ্রিন ভেজিটেবলস অ্যান্ড ফ্রুটস ট্রেডিং এলএলসির সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা আসে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে। যদিও এসব সম্প্রসারণ প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা কিংবা এর অগ্রগতি কতটুকু সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

বঙ্গজের ব্যবস্থাপক ফজলুল হক জানান, এ অঞ্চলের একটি অন্যতম পুরনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোম্পানিটি এখনো সুনামের সঙ্গে টিকে রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে দেশের বিস্কুটের মূল বাজার ঢাকায়। বিস্কুট উৎপাদনের সব কাঁচামালও রাজধানীতেই। সেখান থেকে কাঁচামাল নিয়ে এসে বিস্কুট উৎপাদন করে মুনাফা করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বিস্কুটের বাজার তুলনামূলক ছোট। করোনার কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণের বিষয়টি থমকে রয়েছে।

চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (সিইপিজেড) ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং উৎপাদনে আসে ১৯৯৩ সালে। বেশ কয়েক বছর ধরেই কোম্পানিটির ব্যবসা নিম্নমুখী। সিইপিজেডের একটি সূত্র জানিয়েছে, অনেক আগে থেকেই মিথুন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং উৎপাদনে নেই। বছর খানেকেরও বেশি সময় আগে ইউনিটটি বন্ধ হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিলামের জন্যও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

কারখানা কর্তৃপক্ষ মাঝে রিটও করেছিল। এখন কারখানাটি নিলাম প্রক্রিয়ায় আছে। ধারণা করছি প্রকল্পটির মূল উদ্যোক্তার মৃত্যুর পর সন্তানদের মালিকানা নিয়ে হয়তো জটিলতা ছিল। কারখানাটি চালানোর বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। মালিকপক্ষ ইপিজেডের কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে পারছিল না।

ভাইদের মধ্যে যিনি দেশের বাইরে থাকেন তিনি বেশ কয়েকবার পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কারখানা চালু করার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম ইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পর্যায় থেকেও সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আর চালু করতে পারেননি। এতে বোঝা যায় যে এ ব্যবসায় তাদের মনোনিবেশ কম।

এছাড়া ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতি ছিল।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত তাল্লু স্পিনিং মিলস বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে ১৯৮৯ সালে। বেশ কয়েক বছর ধরেই কোম্পানিটির আর্থিক ও ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সের গ্রাফ নিম্নমুখী। ২০১৫ সালের পর থেকে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিচ্ছে না। তাছাড়া ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের পর থেকে কোম্পানিটি নিরীক্ষিত ও অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করছে না। এতে কোম্পানিটির হালনাগাদ তথ্য পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা।

সর্বশেষ ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে ১০ কোটি টাকা লোকসানে ছিল কোম্পানিটি। সেই হিসাব বছরে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে ১১৭ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ ছিল কোম্পানিটির। গত বছরের এপ্রিলে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করার পর এখন পর্যন্ত কারখানা চালুর বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি কোম্পানিটি।

এছাড়া বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান টয়ো কম্পোজিট নিট গার্মেন্টস লিমিটেড ও রেডিও টুডের ব্যবসায়িক অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। এর মধ্যে টয়ো কম্পোজিট নিট গার্মেন্টসের প্রতিষ্ঠা ১৯৯৫ সালে। বিজিএমইএর কাছ থেকে সর্বশেষ ২০১৭ সালে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এর পর থেকে আর প্রত্যক্ষ রফতানির কার্যক্রম নেই কোম্পানিটির। আর দেশের প্রথম বেসরকারি রেডিও হিসেবে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি রেডিও টুডে। আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানও।

বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোজাম্মেল হকের কাছ থেকে তার ছেলেরা ব্যবসার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আসলে কোম্পানিগুলোর অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। পিতার গড়ে তোলা ব্যবসা ধরে রাখার পাশাপাশি আরো বড় করার তাগাদা ছিল না তাদের মধ্যে।

তাছাড়া মোজাম্মেল হকের বড় ছেলে মো. রফিকুল হক মুন্নু অনেক বছর ধরেই সিঙ্গাপুরে বসবাস করছেন। তার সেখানকার নাগরিকত্বও রয়েছে। মেজো ছেলে মো. মাহবুব-উল হক তাল্লু কানাডায় স্থায়ী হয়েছেন। দেশে ব্যবসা দেখাশোনা করছেন ছোট ছেলে মো. আতিকুল হক মিথুন। যোগ্য নেতৃত্ব ও যথাযথ পরিচর্যার অভাবে প্রথম প্রজন্মের গড়া ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যরা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপের পরিচালক আতিকুল হক মিথুন বলেন, আমাদের উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো আমরা সুনামের সঙ্গে চালানোর চেষ্টা করছি। চুয়াডাঙ্গার দৌলতদিয়াড়ে অবস্থিত আমাদের বঙ্গজ বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে বিস্কুট ও পাউরুটি উৎপাদন হয়। বিস্কুটের বেশ ভালো বাজার রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আমরা বিস্কুটের দাম বাড়াতে পারিনি।

সে কারণে উৎপাদনের পরিমাণ আমরা অন্যান্য বিস্কুট কোম্পানির মতো বাড়াতে পারিনি। সেজন্য বাজারে এগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে না। বাজারে অনেক কোম্পানি অনেক মানের বিস্কুট উৎপাদন করছে। কিন্তু আমরা গুণগত মান ঠিক রাখতে অনেক প্রকারের বিস্কুট উৎপাদনে যাইনি। আমাদের উৎপাদিত বিস্কুট কাতার, দুবাই, জ্যামাইকা, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় রফতানি হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা মানসম্মত পাউরুটিও উৎপাদন করছি। যেটা শুধু চুয়াডাঙ্গা জেলা ও তার আশপাশে বাজারজাত করা হচ্ছে। ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেলের দাম বাড়লেও আমরা পাউরুটির দাম বাড়াতে পারছি না। কারণ এ উৎপাদিত পাউরুটি বেশির ভাগ শ্রমজীবী মানুষ নাশতার সময় খান। সেটা আমরা বিবেচনায় রাখার কারণে পাউরুটি আমরা লাভজনক করতে পারছি না।

তাল্লু স্পিনিংয়ের বিষয়ে আতিকুল হক বলেন, চুয়াডাঙ্গার উজিরপুরে তাল্লু স্পিনিং মিলসের ব্যবসায় আমরা সুবিধা করতে পারছিলাম না। ওই সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকত। আমরা ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়েও উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় ডিজেল পাচার রোধে সরকারিভাবে ডিজেল ব্যবহারের একটি কোটা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। তখন দেখা গেছে, জেনারেটর চালাতে গিয়ে ওই নির্ধারিত কোটার চেয়ে বেশি ডিজেলের প্রয়োজন হচ্ছিল। এসব কারণেই গোটা স্পিনিং মিলটি ময়মনসিংহ জেলায় সরিয়ে নিতে হয়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের ব্যবসা ভাগ হয়নি। আগে যেভাবে চলছিল সেভাবেই ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে পোশাক তৈরির কারখানাগুলো চললেও বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সেগুলো লাভজনক হচ্ছে না। আমরা এতে দাম পাচ্ছি না। অর্ডার অনুযায়ী কাজ করে দিচ্ছি। আমরা এ ব্যবসা রেখেই যাচাই করে টেকসই ব্যবসার দিকে এগিয়ে যাব।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গজ-তাল্লু গ্রুপে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন সাবেক নির্বাহী বলেন, নিজেদের ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণে কোম্পানির অর্থের যথেচ্ছ অপব্যবহারের কারণেই আজকে প্রতিষ্ঠানগুলোর এ হাল হয়েছে। এ অবস্থা একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানির অর্থ তছরুপ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগকারীদেরও ঠকানো হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here