ব্যালান্সশিটে মিথ্যা তথ্য দেয়ায় জার্মান কোম্পানির সিইও গ্রেপ্তার

0
324

বিজনেস ইনসাইডার, ফোর্বস : ঋণ পেতে ব্যালান্সশিটে ১৯০ কোটি ইউরো (২০০ কোটি ডলারের বেশি) মিথ্যা হিসাব দেখিয়ে নিজেদের প্রোফাইল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করা। তবে জোচ্চুরি তো আর বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। যেমনটি রাখতে পারেনি জার্মান পেমেন্ট প্রসেসিং কোম্পানি ওয়্যারকার্ড।

ব্যাপারটি প্রথম ধরা পড়ে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়াংয়ের নিরীক্ষায়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ওয়্যারকার্ডের ব্যালান্সশিটে দেখানো ১৯০ কোটি ইউরোর কোনো হদিস পাচ্ছে না তারা, যা কোম্পানিটির প্রদর্শিত মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

জোচ্চুরি যে করেছে তা ওয়্যারকার্ড স্বীকারও করে নিয়েছে। সোমবার কোম্পানিটি জানায়, যে অর্থের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, আসলে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। আর জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে এর সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) মার্কাস ব্রাউনকে।

কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন, ৫০ লাখ ইউরো (৫৬ লাখ ডলার) জামানত দিয়ে জামিন পেতে পারেন ব্রাউন। তবে তাকে প্রতি সপ্তাহে একবার পুলিশ স্টেশনে রিপোর্ট হাজিরা দিতে হবে। এদিকে ওয়্যারকার্ডের অন্য তিন ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধেও জালিয়াতিতে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

কিন্তু কেন এই জালিয়াতি? কারণ একটাই। বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজেদের ফিন্যান্সিয়াল প্রোফাইলটা একটু হূষ্টপুষ্ট করে উপস্থাপন করা। ওয়্যারকার্ড বিষয়টি স্বীকারও করেছে। গত সপ্তাহে কোম্পানিটি জানায়, ১৯ জুনের মধ্যে ২০১৯ সালের পুরো বছরের এবং চলতি বছরের প্রথমার্ধের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করলে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণ হারাতে হতো তাদের।

সেন্টার ফর ফিন্যান্সিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের (সিএফআরএ) ফিন্যান্সিয়াল ফরেনসিক টিমের প্রধান রিচার্ড সাচনিগ বলছেন, এত কিছু করেও খুব একটা লাভ হলো না ওয়্যারকার্ডের। বরং আমও গেল, আবার ছালাও গেল। কারণ নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধের কারণে তারা এ ঋণের অর্থ সাধারণ করপোরেট কাজে খরচ করতে পারবে না। উপরন্তু জালিয়াতির ঘটনায় যে ভাবমূর্তি তৈরি হলো, তাতে এই ২০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধের জন্য তহবিল সংগ্রহে তাদের বেশ বেগ পেতে হবে।

জালিয়াতির খবর প্রকাশের পর শুক্রবার ওয়্যারকার্ডের শেয়ারদর ৫০ শতাংশের বেশি কমে যায়। আর চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস সোমবারও ৪৫ শতাংশ দর হারায় কেম্পানিটি। জালিয়াতির ঘটনায় ওয়্যারকার্ডের বাজার মূলধনেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। দুই বছর আগে যেখানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি, সেখানে গত সপ্তাহে তা নেমে আসে মাত্র ৩০০ কোটি ডলারের সামান্য বেশিতে।

ওয়্যারকার্ডের জালিয়াতির ঘটনাটি যেন একটি কোম্পানির উত্থান-পতনের এক আদর্শ বয়ান। ১৯৯৯ সালে মার্কাস ব্রাউনের হাত ধরেই যাত্রা হয় কোম্পানিটির। একসময় জার্মানির গর্ব ছিল এটি। স্টার্টআপটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ৬ হাজার কর্মীর আয়ের সংস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছিল কোম্পানিটি। এতটাই আশ্চর্য উত্থান দেখিয়েছে ওয়্যারকার্ড যে ২০১৮ সালে শীর্ষ ৩০ জার্মান কোম্পানিকে নিয়ে গঠিত ব্লু-চিপ সূচক ডিএএক্সে জায়গা করে নেয় কোম্পানিটি।

গত সপ্তাহে ওয়্যারকার্ডের ব্যালান্সশিটে বড় ধরনের ঘাপলা খুঁজে পায় আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং। এ কারণে তারা কোম্পানিটির ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষক হিসেবে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ জালিয়াতির গোমর ফাঁস হয়ে যায়। ফিলিপাইনের যে দুটি ব্যাংকে নিজেদের অ্যাকাউন্টে ২০০ কোটি ডলার রয়েছে বলে দাবি করছিল ওয়্যারকার্ড, সেই দুটি ব্যাংক জানায় যে ওয়্যারকার্ড আসলে তাদের গ্রাহকই নয়। শুধু তাই নয়, ফিলিপাইনের ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেমে উল্লিখিত ২০০ কোটি ডলার কখনই প্রবেশ করেনি। নিজেদের গোমর ঢাকতে ব্যাংক দুটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করায় ওয়্যারকার্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগও এনেছে তারা।

গত শুক্রবার ওয়্যারকার্ডের সিইও ও সিটিও পদ থেকে পদত্যাগ করেন ব্রাউন। তিনি দাবি করেন, কোম্পানিটি বড় একটি জালিয়াতির ঘটনার শিকার হয়েছে। এদিকে গ্রেফতারের পর গতকালই মার্কাস ব্রাউনকে শুনানির জন্য আদালতে হাজির করার কথা ছিল। অন্যদিকে জার্মান কৌঁসুলিরা ওয়্যারকার্ডের সাবেক পর্ষদ সদস্য ইয়ান মার্সালেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। তিনি ওয়্যারকার্ডের সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) ছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কোম্পানির কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব ছিল তার ওপর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here