ব্যাংক ঋণে সরকারের রেকর্ড

0
362

সিনিয়র রিপোর্টার : রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি সরকার। নানা শর্তে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমেছে। এতে গত অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের বেশি বেশি ঋণ নেয়ার প্রবণতা ছিল। অর্থবছরের শেষ দিকে এসে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ঋণনির্ভরতা আরো বাড়ে।

করোনা মোকাবিলায় বিদেশ থেকে প্রচুর ঋণ ও অনুদান পাওয়ার পরও ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার, যা এখন পর্যন্ত সর্বাধিক। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১০৯ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছর সরকার ব্যাংক থেকে নিয়েছিল ৩৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঋণের অঙ্ক ছিল ১১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতির কারণে রাজস্ব আয়ে খুব খারাপ অবস্থা ছিল। করোনার কারণে অধিকাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায় ব্যাপক হারে কমেছে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। আদায় খারাপ থাকায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। অথচ গত অর্থবছরে আয় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মানে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৮৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদায়ী অর্থবছরের সরকার ব্যাংকঋণের মধ্যে প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা নেয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। বাকি ৬ হাজার কোটি টাকা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ ১০ বছর, ১৫ বছর ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেয়া হয়েছে বেশি পরিমাণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো ফল বয়ে আনছে না।

কারণ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করলে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন হয়। সৃষ্টি হয় নতুন কর্মসংস্থান। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। বাড়ে অর্থনৈতিক লেনদেনও। আর অর্থনৈতিক লেনদেনের বেশির ভাগই হয় ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে। এতে ব্যাংকেরও ব্যবসা বাড়ে, বাড়ে শাখা-প্রশাখা। সামগ্রিকভাবেই অর্থনীতির চাকা সচল হয়। কিন্তু যেভাবে ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নেয়া হচ্ছে তাতে বেসরকারি খাতের ঋণ দেয়ার মতো অর্থ ব্যাংকের কাছে থাকবে না।

অন্যদিকে চলমান পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ব্যাংকই বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এর অন্যতম কারণ, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার অলিখিত সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। রাঘববোয়ালরা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দিচ্ছেন না। তাদের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো অবস্থান না নিয়ে বরং বিভিন্ন নীতি-সহায়তা দিয়ে ছাড় দেয়া হচ্ছে। এতে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেয়া হয়েছে। এই ৯ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ দিয়ে ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দিলে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর যে কোনো সংকট মেটাতে সরকারি বিল ও বন্ড বন্ধক রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ধার নেয়া যাবে। এ কারণে এখন বেশির ভাগ ব্যাংক বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি উৎসাহী।

ব্যাংকারদের মতে, এভাবে সরকারকে ঋণ দিয়ে ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ালে অর্থনৈতিক কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়বে। বছর শেষে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, রাজস্ব আয় কম থাকায় সরকারকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেসরকারি খাতে ঋণের যে চাহিদা তাতে করে সরকারের ঋণ দেয়ায় কোনো সমস্যা হবে না। এতে বরং সরকার এবং ব্যাংক উভয়ে উপকৃত হচ্ছে। কেননা, সরকার সঞ্চয়পত্রের তুলনায় কম সুদে ব্যাংক ঋণ পাচ্ছে। আবার ব্যাংকগুলো টাকা অলস ফেলে না রেখে ঝুঁকিমুক্ত বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে দেখা যায়, ২০১৯-২৯ অর্থবছরে আয় হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৮৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কম। এপ্রিল থেকে জুন- এই ৩ মাসে বিশ্বব্যাংক ১৬০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশকে। এডিবি দিয়েছে ৬০ কোটি ২৮ লাখ ডলার। সেই আইএমএফের কাছ থেকেও ৭৩ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা মিলেছে। চীনের নেতৃত্বে গঠিত এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) গত এপ্রিলে ১৭ কোটি ডলার দিয়েছে।

গত কয়েক বছরে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রচুর ঋণ পাওয়ায় সরকার ব্যাংক থেকে তেমন ঋণ নেয়নি। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ৬-৮ শতাংশ সুদে ঋণ পায়। অথচ সঞ্চয়পত্রে গুনতে হয় ১১ দশমিক শূন্য ৪ থেকে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তবে গত কয়েক বছরে প্রচুর সঞ্চয়পত্র বিক্রির ফলে সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে গেছে।

বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণস্থিতি রয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। সুদ কমাতে সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা কমিয়ে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও টিআইএন বাধ্যতামূলক করাসহ নানা উপায়ে বিক্রি নিরুৎসাহিত করছে সরকার।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা গত অর্থবছর ছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা। তবে বিক্রি পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা করা হয়। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ১০ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here