ব্যাংকগুলোর চাহিদা মেটাতে প্রচুর ডলার বিক্রি, দর বাড়ছে

0
284

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর চাহিদা মেটাতে প্রচুর ডলার বিক্রি করছে। এরপরও দর বাড়ছে। ব্যাংকগুলো এখন একে অন্যের কাছ থেকে ডলার কিনছে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা দরে। চলতি মাসের শুরুতে যা ছিল ৮৫ টাকা ৭০ পয়সা।

গত আগস্টে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে দর ৮৫ টাকার নিচে ছিল। এদিকে, আমদানিকারকদের ডলার কিনতে হচ্ছে ৮৬ টাকায়। আর কার্ব মাকেটে বা খোলাবাজারে প্রতি ডলার কিনতে ৯০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, গত আগস্ট থেকে মুদ্রাবাজারে ডলারের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। আমদানিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স কমায় নিজেদের কাছে থাকা ডলার দিয়ে চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে অনেক ব্যাংক। গত অর্থবছর রেমিট্যান্স ৩৬ শতাংশ বেড়েছিল।

তবে চলতি অর্থবছরে গত অক্টোবর পর্যন্ত ২০ শতাংশের মতো কমেছে। সরবরাহ কম থাকায় আমদানি দায় পরিশোধের জন্য এক ব্যাংক আরেক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে না পেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে।

গত ১৯ আগস্ট প্রথম ৫০ লাখ ডলার বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১৮২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে। এর বিপরীতে বাজার থেকে ১৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়েছে। যা বর্তমানে দেশের মুদ্রাবাজারে টাকার টান তৈরির অন্যতম কারণ।

জানা গেছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি বাড়িয়েছে। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহে বাজারে বিক্রি করা হয়েছে ১৩ কোটি ডলার। গত ১৬ নভেম্বর এক দিনে বিক্রি করা হয় সাত কোটি ডলার।

এরপরও চলতি মাসের শুরুর তুলনায় আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারে আরও ১০ পয়সা বেড়ে ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা হয়েছে। এর আগে গত ৩ আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে ডলারের দর ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় অপরিবর্তিত ছিল।

আন্তঃব্যাংকের পাশাপাশি নগদ ডলারের দরও বেড়েছে। খোলাবাজারে এখন নগদ ডলার ৯০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। মূলত করোনার কারণে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি খুলে দেওয়ায় এখানেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকগুলো এখন নগদ ডলার বিক্রি করছে ৮৮ থেকে ৮৯ টাকায়। অবশ্য ব্যাংক থেকে ডলার কেনায় বাড়তি ঝামেলা, সার্ভিস চার্জ এবং নির্ধারিত সীমার বেশি কেনার সুযোগ না থাকায় অনেকে ব্যাংকে না গিয়ে খোলাবাজার থেকে কিনে থাকেন।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এমপি বলেন, ডলারের দর বাজারভিত্তিক বলা হলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। মূলত রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় এ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তবে অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রিত কোনো কিছুই ভালো না। অবশ্য সম্প্রতি সহনীয়ভাবে একটু করে দর বাড়ানো হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে জিনিসের দাম বাড়ছে, তাতে আগামীতে ডলারের দর আরও না বাড়িয়ে উপায় থাকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অর্থনীতির চাহিদা বিবেচনায় ডলারের দর ওঠানামায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ না করে উপায় থাকে না। কেননা গত অর্থবছর ডলারের চাহিদা কমে যাওয়ার সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক না কিনলে হয়তো ৭০ টাকার ঘরে নেমে যেত।

তখন রপ্তানিকারক ও রেমিট্যান্স গ্রহীতারা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। একইভাবে এখন বিক্রি করে বাজারে সহায়তা না দিলে হয়তো সেদিন ৯০ টাকা ছুঁয়ে যেত। এতে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হতো। যে কারণে ভারসাম্যপূর্ণভাবে দর ওঠানামাকে উৎসাহিত করা হয়।

তিনি বলেন, করোনার কারণে দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ সময়ে রপ্তানি বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ডলারের দর কিছুটা বৃদ্ধি স্বস্তির। তবে বাংলাদেশে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হয়। যে কারণে ডলারের দর বৃদ্ধি যেন অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমদানি বাড়ছে অনেক বেশি হারে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স কমছে। আবার করোনার কারণে এক বছরের ডেফার্ড সুবিধা পাওয়া অনেক আমদানি দায়ও এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। যে কারণে ডলারের দর বাড়ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি করে ব্যাংকগুলোকে সহায়তা না দিলে দর আরও বাড়ত। পাশাপাশি এ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিও অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ মাসে আমদানিতে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৮৭২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে যা ৪৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। আমদানি এভাবে বাড়লেও গত অক্টোবর পর্যন্ত রপ্তানি ২২ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৫৭৫ কোটি ডলার হয়েছে।

অথচ অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসীরা ৭০৬ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ কম। এতে করে চাপের মুখে পড়েছে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি তিন গুণের বেশি বেড়ে ৬৫০ কোটি ডলারে ঠেকেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here