ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর মোট কর্মীর ৬৫ শতাংশই সেলস ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর) পদে নিয়োজিত। সারা দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ওষুধ বিপণনের কাজে যুক্ত কর্মীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ, যারা কভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও ঝুঁকি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ এসব মাঠকর্মীর বেতন-বোনাস ও টিএ-ডিএ পরিশোধ করেনি শতাধিক প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বোনাস দিলেও পুরোটা দেয়নি। শীর্ষস্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান বোনাস ও টিএ-ডিএ দিলেও বেতন দেয়নি।

ওষুধ খাতে দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রতিষ্ঠানটিতে মাঠপর্যায়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় দুই হাজারের বেশি কর্মী। সাধারণত মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতন ও ঈদের আগেই বোনাস পরিশোধ করে গ্লোব। তবে এবার ঈদ সামনে রেখে মাঠকর্মীদের কোনো বোনাস দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। দেয়া হয়নি চলতি মাসের বেতনও।

ওষুধ খাতের আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ফার্মা। ওরিয়ন গ্রুপের এ কোম্পানিটি স্বাভাবিক সময়ে বছরে চারটি বোনাস কিংবা বিশেষ ভাতা দেয়। কিন্তু করোনার এ সময়ে মাঠকর্মীদের চলতি মাসের বেতন কিংবা বোনাস কিছুই দেয়নি ওরিয়ন ফার্মা। ফলে মাস শেষে বেতন দিতে পারে এমন নিশ্চয়তা থাকলেও বোনাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মাঠপর্যায়ের কর্মীদের।

শুধু ওরিয়ন কিংবা গ্লোব নয়, দেশের শীর্ষস্থানীয় যে ১৫টি কোম্পানি রয়েছে তাদের অনেকে মাঠকর্মীদের চলতি মাসের বেতন পরিশোধ করেনি, তবে বোনাস ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করেছে। সেই সঙ্গে কর্মীদের আশ্বস্ত করেছে যে মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতন পরিশোধ করবে। তবে বেক্সিমকো ফার্মা প্রফিট শেয়ারের পাশাপাশি বেতন-বোনাস দিয়েছে।

ওষুধ বিক্রয় ও বিপণনকাজে কর্মরত মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের সংগঠন বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভস অ্যাসোসিয়েশন (ফারিয়া) সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষস্থানে না থাকলেও বেতন ছাড়া সব পরিশোধ করেছে এমন তালিকায় রয়েছে পপুলার ফার্মা ও নিপ্রো জেএমআই ফার্মা। এছাড়া অ্যারিস্টো ফার্মা, এসিআই লিমিটেড, রেডিয়েন্ট, জেনারেল ফার্মা ও রেনাটা কর্মীদের সব পাওনা পরিশোধ করেছে। মাঝারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিমেড ইউনিহেলথ তাদের কর্মীদের সব পরিশোধ করেছে।

ফার্মাশিয়া যা বোনাস দেয়ার কথা তার ৭৫ শতাংশ দিয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ ঈদের পরে যেকোনো সময় দেবে। তবে এপ্রিলের টিএ-ডিএ এবং মে মাসের বেতন দেয়নি। অন্যদিকে জিসকা ফার্মা বেতন দেয়নি, বোনাস কেটে নিয়ে আংশিক পরিশোধ করেছে। নাফকো ইউনিওয়ার্ল্ড ফার্মা কিছুই দেয়নি। যাদের সেলস ভালো শুধু তাদের চলিত মাসের বেতন ২৫ শতাংশ হারে সেলসের টিএ পরিশোধ করেছে।

এ বিষয়ে ফারিয়ার সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান বলেন, ওষুধ শিল্পের মাঠকর্মীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য করোনা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন, অনেকে আক্রান্তও হয়েছেন। তাদের প্রতিদিন কমপক্ষে দুবার জরুরি বিভাগ ছাড়াও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গে মিশতে হয়। রোগীদের প্রেসক্রিপশন চেক করা ছাড়াও থাকতে হয় হাসপাতালে।

ওষুধের দোকানগুলোও নিয়মিত ভিজিট করতে হয়। অধিকাংশ কর্মী এসব কাজ করছেন নিরাপদ ও সুরক্ষা পোশাক ছাড়াই। এ অবস্থার মধ্যেও যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো তার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বেতন-বোনাস কিংবা টিএ-ডিএ পরিশোধ করেনি তারা অমানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা কোম্পানিগুলোর একটি তালিকা তৈরি করছি।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই চলতি মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে দিতে পারে। তাহলে মাঠকর্মীরা ঈদটা চিন্তামুক্তভাবে পরিবারের সঙ্গে পালন করতে পারবে। আমরা এখনো কোম্পানির ওপর আস্থা রাখতে চাই। যেসব কোম্পানি এখন পর্যন্ত বোনাস ও বেতন-ভাতা দেয়নি, তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করা হচ্ছে। অনুরোধ করা হয়েছে দ্রুত পরিশোধ করার জন্য। তা না হলে পরবর্তী সময়ে আমরা সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেব।

দেশে তালিকাভুক্ত ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা ৭৩টি। এর মধ্যে বর্তমানে কার্যক্রমে আছে ২১৭টি কোম্পানি। কোম্পানিগুলো দেশে ও বিদেশে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ ওষুধ বিপণন করে। এর বাইরে হোমিওপ্যাথিক, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল কোম্পানি রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশের ওষুধের বাজারের বার্ষিক প্রবৃৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ওষুধের বাজার ছাড়িয়েছে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশের মানুষের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। পাশাপাশি বিশ্বের ১০০টি দেশে ওষুধ রফতানি করে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো।

রফতানির বাজার ছাড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। ওষুধ কোম্পানিগুলোর মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ জুড়ে আছে সেলস ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। মোট কর্মীর ৬৫ শতাংশই এ দুটি পদে নিয়োজিত। এর মধ্যে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ রয়েছে ১৯ এবং মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে উৎপাদন ও বিপণনসংক্রান্ত নন-টেকনিক্যাল কর্মী ১৭ শতাংশ, ড্রাইভার ও অন্যান্য কর্মী ১ শতাংশ।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে গেলেও জরুরি সেবার আওতায় চালু ছিল ওষুধ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম। দোকানপাট খোলা রাখার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকলেও সবসময় খোলা ছিল ওষুধের দোকান। ফলে কাজ থেমে ছিল না ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিপণনকর্মীদের।

মাঠকর্মীদের বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিব সফিউজ্জামান বলেন, আমরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে কর্মীদের পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছি। এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। যতদূর জানি মাস শেষ না হওয়ার কারণে অনেকে বেতন দেয়নি।

তিনি আরো বলেন, তবে তারা মাস শেষের আগেই তা পরিশোধ করবে। আর বোনাস ও ভাতা পরিশোধ হয়েছে বলে জেনেছি। তবে কেউ অভিযোগ করলে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে। সূত্র : বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here