বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আশঙ্কা

0
250

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশে গত বছর সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই এসেছে তার আগের বছরের অর্ধেকের কম। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগের এই চিত্র মহামারী পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য অশনি সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংস্থা আঙ্কটাড মঙ্গলবার বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন-২০২০ প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে ১৫৯ কোটি ৭০ লাখ (১.৫৯ বিলিয়ন) ডলার। এই অঙ্ক গত ৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। আগের বছর ২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ৩৬১ কোটি ৩০ লাখ (৩.৬১ বিলিয়ন) ডলার।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে একক বছরে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আসে। এর মধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে জাপানের কোম্পানি জাপান টোব্যাকো। আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কেনা বাবদ প্রায় ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ডলার বিনিয়োগ করেছিল তারা।

বিদেশি বিনিয়োগের এই করুণ চিত্রের এই হিসাব যখন কষা হয়েছে, তখনও করোনাভাইরাস মহামারী বিশ্বে দেখা দেয়নি।

এখন কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে তছনছ হয়ে পড়া বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০২০ সালে এফডিআই আরও কমবে এবং তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে বলে আভাস দিয়েছে আঙ্কটাড।

২০১৯ সালে বিদেশি বিনিয়োগের নাজুক অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের চেম্বার অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বুধবার বলেন, বাংলাদেশে এফডিআইয়ের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ব্র্যান্ডিং। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে আমরা এখনও আমাদের ব্র্যান্ডিং যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি। এছাড়া আমাদের বন্দরের সমস্যা আছে। এতদিনেও আমরা আমাদের বন্দরের অটোমেশন করতে পারিনি। এটা খুবই দুখঃজনক।

মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চল; বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে এমন ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ‍তুলছে সরকার।

মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চল; বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশে এমন ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ‍তুলছে সরকার।

“এছাড়া গত বছরের প্রায় পুরোটা সময়জুড়ে গ্রামীণ ফোনের (জিপি) নিরীক্ষা আপত্তির ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নিয়ে বিটিআরসির সঙ্গে সমস্যা বাংলাদেশে এফডিআই আসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে বলে আমি মনে করি।”

এরশাদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এর অর্থনীতির আকারের বিবেচনায় অনেক কম। এর মূল কারণ অবকাঠামোর ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির অভাব।

“বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো সরকার বাস্তবায়ন করছে বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে। এসব প্রকল্প পিপিপির আওতায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমেও হতে পারত। সেক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ত।”

এ বিষয়ে অর্থনীতির গবেষক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশি বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে না। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের বিনিয়োগ একই জায়গায় আটকে আছে; জিডিপির ৩১ থেকে ৩৩ শতাংশের মধ্যে। এই কয়েক বছরে সরকারি বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়েনি।

তুলনামূলক চিত্র : ২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় এফডিআই এসেছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর ভারতে বিদেশি বিনিয়োগ বেশ বেড়েছে। প্রতিবেশী আরেক দেশ মিয়ানমারেও বিনিয়োগ গেছে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ কম্বোডিয়ায় এফডিআইও বেড়েছে এবং দেশটি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পেরেছে।

ভারতে এফডিআই পেয়েছে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে ২০ শতাংশ। এফডিআই পেয়েছে কম্বোডিয়া ৩৭০ কোটি ডলার। মিয়ানমারে গেছে ২৮০ কোটি ডলার।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে এফডিআই কমে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, আগের বছরের বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটেছে।

বাংলাদেশে গত বছর তৈরি পোশাক খাতে কোরিয়া, চীন ও হংকং থেকে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ এসেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া গত বছর নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে ১৫০ কোটি ডলারের মতো, যা পরবর্তীতে বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সামনে অনিশ্চয়তা : ২০১৯ সালে সারা বিশ্বের বিদেশি বিনিয়োগের অন্তঃপ্রবাহের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৫৪ ট্রিলিয়ন ডলার।মহামারীর মধ্যে এ বছর তা এক ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নামবে বলে আঙ্কটাডের আভাস।

সংস্থাটি বলেছে, মহামারীর কারণে এ বছর বিশ্বে বিনিয়োগ কমবে ৪০ শতাংশ। আগামী বছর কমতে পারে ৫ থেকে ২০ শতাংশ। ২০২২ সালে গিয়ে পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার হতে পারে।

আহসান মনসুর বলেন, এবার কোভিড-১৯ এর কারণে সবকিছুই ওলটপালট। এফডিআইও কমবে, এটাই স্বাভাবিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here