ইমরান রহমান : করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় আঘাত লেগেছে। যার ছোঁয়া লেগেছে বাংলাদেশেও। প্রায় দুই মাসের বেশি সময় অঘোষিত লকডাউনে তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রতিটি খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় একের পর এক বাড়ছে কর্মী ছাঁটাই ও বেকারত্বের সংখ্যা।

এতে মধ্যবিত্ত ও ‘দিন আনি-দিন খাই’ শ্রেণির মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সপরিবারে আদি ঠিকানা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ঢল নেমেছে রাজধানীতে। অনেকে আবার স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামে পাঠিয়ে নিজে সংগ্রাম করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ঢাকা ত্যাগ করাই একমাত্র সমাধান নয়। উল্টো বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এতে বাড়বে পারিবারিক কলহ, সামাজিক অস্থিরতা ও আত্মহত্যার মতো ঘটনা। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রণোদনাসহ সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যানুযায়ী, করোনা ভাইরাসের কারণে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিশ্বে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছেন। যার মধ্যে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ বসবাস করেন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে করোনার কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর তালিকায় যুক্ত হতে পারেন অন্তত দেড় কোটি মানুষ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিপি) প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে অনলাইন পোর্টালে আগের বছরের এপ্রিলের তুলনায় ৮৭ শতাংশ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি কমেছে। আর মার্চ মাসে তা ছিল ৩৫ শতাংশ।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৬ কোটি ৪০ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন কৃষি খাতে। বাকি প্রায় ৪ কোটি শ্রমিক কাজ করছেন শিল্প ও সেবা খাতে। এর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক খাতেই অধিকাংশ শ্রমিক কাজ করে।

সূত্র জানায়, করোনাকালে প্রায় ১০ হাজারের বেশি পোশাক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন। শুধু গার্মেন্টস নয়, প্রায় সব খাতেই শ্রমিকরা ছাঁটাই বা কর্মচ্যুতির শিকার হচ্ছেন।

গত ১ সপ্তাহে সরজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মিনি ট্রাক ও পিকআপ ভাড়া করে সমস্ত মালামাল নিয়ে গ্রামে ছুটছে মানুষ। ফলে বেশিরভাগ বাড়ি ও মহল্লায় প্রবেশ গেটের সামনে ঝুলছে টু- লেটের নোটিস। ফাঁকা হচ্ছে মেস বাসাও। বিভিন্ন দোকানের সামনেও ঝুলছে ভাড়া দেয়ার সাইনবোর্ড। সবমিলিয়ে রাজধানীতে নেই সেই চিরচেনা রূপ। কমে গেছে, বাসস্ট্যান্ড, রাস্তা, অলিগলির ভিড়।

রাজধানীর পল্লবী এলাকার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী শহিদুর রহমান বলেন, এক বছর আগে শুরু করা গার্মেন্টস ব্যবসায় ভালোই উন্নতি করছিলাম। কিন্তু করোনার থাবায় আর পেরে উঠতে পারিনি। কারখানা ছাড়ার পাশাপাশি বাসাটিও ছেড়ে দিয়ে গ্রামে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে ঢাকা থাকার মতো উপায় ছিল না তার। গ্রামে পাড়ি জমালেও সামনের দিনগুলোতে কীভাবে চলবেন সেটাই তার মূল চিন্তা।

বাড্ডা আদর্শ নগর এলাকায় ইটালিয়ান হাউজের ৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মেস বানিয়েছিলেন সামচি তাবরীজ নয়ন নামে এক যুবক। তার মেসে বিভিন্ন পেশার ৩০ জন সদস্য থাকলেও করোনার শুরু হওয়ার পরে চাকরি হারিয়ে ১৪ জন মালপত্র রেখে পালিয়ে গেছেন। বাকিদের মধ্যে মাত্র ৬ জন ভাড়া দিলেও বাকি ২৪ জনের ৩ মাসের ভাড়া বকেয়া থাকায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।

রামপুরার পশ্চিম হাজীপাড়া এলাকার ৬/২ নম্বর বাসার মালিক মো. শামীম হোসেন জানান, তার বাড়িতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেশি থাকতেন। করোনা পরিস্থিতে বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন নতুন ভাড়াটিয়াও পাচ্ছেন না তিনি।

সমাজ ও অপরাধ গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, যে কোনো সংকট ৬ মাসের বেশি স্থায়ী হলে মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। করোনার কারণে ঢাকা ত্যাগকারী পরিবারগুলোতে লেখাপড়া, চিকিৎসা, খাবার ও বিনোদনসহ সব বিষয়ে আমূল পরিবর্তন আসবে। অর্থের অভাবে আগের মতো কোনোটাই পূরণ হবে না।

পারিবারিক কলহ, সামাজিক অপরাধ ও অস্থিরতা এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা বাড়বে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে গত শতাব্দীর স্প্যানিশ ফ্লুর পরে রাষ্ট্রগুলো যেভাবে তার নাগরিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল ঠিক একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে। সবার চাকরি বহাল রাখার বিষয়ে সরকারকে কঠোর হতে হবে বলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, পাশাপাশি প্রণোদনাসহ অন্যান্য যে সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলো যথার্থভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কারণ প্রণোদনার টাকা ব্যবসায়ী আর সহায়তার টাকা জনপ্রতিনিধিদের পকেটে ঢুকে গেছে। সেই সঙ্গে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের ত্রাণ সহায়তা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, গার্মেন্টস সেক্টর বাদ দিয়ে অন্তত দেড় কোটি মানুষ কর্মচ্যুত হতে যাচ্ছে। এ সেক্টর ধরলে সংখ্যা অনেক বেশি।

তিনি আরো জানান, গার্মেন্টস, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স ও সরকার এই চারটি খাত ছাড়া বাকি সবই ইনফরমাল (অনানুষ্ঠানিক)। করোনায় ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) কর্মজীবী ছাড়া আর সবাই এখন বেকার। বেকারের এই সংখ্যা দেড় থেকে দুই কোটি। তিনি মনে করেন, ফরমাল কর্মজীবীদের মধ্যে গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকরাও চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here