বহুজাতিক ও দেশীয় ১১টি করপোরেট কোম্পানির সাফল্য

0
3287

ডেস্ক রিপোর্ট : নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে গোটা বিশ্ব পর্যুদস্ত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। সংক্রমণ রুখতে লকডাউন কিংবা চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধের দিকে ঝুঁকেছে অনেক দেশ। বাংলাদেশেও গত বছরের পর এবারো দ্বিতীয় দফায় আরোপ হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ।

স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলছে করোনা। তবে দেশে এর মধ্যেও বেশকিছু কোম্পানি ব্যবসায় আত্মবিশ্বাস হারায়নি। করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই ব্যবসায় ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে কোম্পানিগুলো।

দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন খাতের অনেকগুলো কোম্পানি এরই মধ্যে চলতি ২০২০-২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের (জুলাই-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবার তালিকাভুক্ত কিছু বহুজাতিক কোম্পানি চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

এসব প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রকাশিত হিসাবকালে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ১১টি স্থানীয় বড় করপোরেট ও ছয়টি বহুজাতিক। কোনো কোনোটি আগের প্রান্তিকগুলোয় ব্যবসায় পিছিয়ে পড়লেও তৃতীয় প্রান্তিকে এসে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ভালো ব্যবসা করেছে সিমেন্ট খাতের তালিকাভুক্ত দুই বহুজাতিক হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড ও লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড। এর মধ্যে হাইডেলবার্গের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি ৫৯ লাখ টাকায়।

এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। অন্যদিকে লাফার্জহোলসিমের আয় বছরের প্রথম প্রান্তিকে বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ শতাংশ। ২০২১ সালের জানুয়ারি-মার্চে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৬৩১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। নিট মুনাফা বেড়েছে ৯৮ শতাংশ।

মেঘনা সিমেন্ট সিমেন্ট খাতেরই স্থানীয় কোম্পানিটির আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ। এ নয় মাসে কোম্পানিটি আয় করেছে ৭৩৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। নিট মুনাফা বেড়েছে ২৫ শতাংশ।

রানার অটোমোবাইলসের আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কমে ৮০২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ৫২ শতাংশ।

সিঙ্গার বাংলাদেশের গত জানুয়ারি-মার্চে বহুজাতিক ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠানের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৫ কোটি টাকায়। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ৫১ শতাংশ।

অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিক শেষে ১ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির আয় ছিল ১ হাজার ১৯৬ কোটি টাকায়। সে হিসাবে এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ। আর এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ।

গত বছরের মার্চে যুক্তরাজ্যের সেটফার্স্ট লিমিটেডের মালিকানাধীন গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) বাংলাদেশের সব শেয়ার কিনে নেয় ইউনিলিভারের সাবসিডিয়ারি ইউনিলিভার ওভারসিজ হোল্ডিংস বিভি। কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেড। জিএসকে বাংলাদেশের কনজিউমার হেলথ ড্রিংকসের ব্যবসাও চলে যায় ইউনিলিভারের কাছে।

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এ সময় কোম্পানিটির আয় হয়েছে ১১৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। যদিও এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

আয় বাড়লেও মুনাফা কমার কারণ জানতে চাইলে ইউনিলিভার বাংলাদেশের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশন শামীমা আক্তার বলেন, ড্রাই মিক্স ইনগ্রেডিয়েন্টস (ডিএমআই), স্কিমড মিল্ক পাউডার ও ডেক্সট্রোজের মতো প্রধান কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে ডিএমআইয়ের ওপর আরোপিত শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। অবশ্য বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে বাড়তি ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে।

করোনাকালে ভালো ব্যবসা করেছে বেক্সিমকো গ্রুপের তিন কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড। এর মধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেডের আয় হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির মোট আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৩৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এ নয় মাসে কোম্পানির নিট মুনাফা বেড়েছে ছয় গুণেরও বেশি।

তিন প্রান্তিকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের আয় হয়েছে ২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানির আয় বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে করা সরকারের চুক্তি অনুযায়ী, দেশে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আমদানি, মজুদ ও বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এজন্য কমিশন ফিও পাচ্ছে কোম্পানিটি। হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৫০ লাখ ভ্যাকসিন থেকে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৩৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

আগের প্রান্তিকগুলোয় আয় পড়তির দিকে থাকলেও গত প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে শাইনপুকুর সিরামিকস। এ সময় কোম্পানির আয় বেড়েছে আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আসাদ উল্লাহ বলেন, করোনার চিকিৎসায় ব্যবহূত বেশ কয়েকটি ওষুধ আমরা উৎপাদন করছি। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এসব ওষুধের ভালো চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার ভ্যাকসিন থেকেও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের কমিশন বাবদ কিছু আয় হয়েছে। আর বিশ্বব্যাপী পিপিই ও গার্মেন্টস পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে বেক্সিমকো লিমিটেডের আয়ও বেড়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাণ গ্রুপের দুই কোম্পানি রংপুর ফাউন্ড্রি ও এগ্রিকালচার মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেডেরও (এএমসিএল) আয় করোনাকালে বেড়েছে। এর মধ্যে চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে রংপুর ফাউন্ড্রির আয় এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়ে ১০৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়সীমায় এএমসিএল-প্রাণের আয় ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে ২২০ কোটি টাকা হয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।

জানতে চাইলে এএমসিএল-প্রাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইলিয়াস মৃধা বলেন, কভিডের মধ্যে ব্যবসায় সফলতার পেছনে একাধিক বিষয় কাজ করেছে, একক কোনো কারণ নেই। প্রথমত গত বছর কভিডের কারণে কয়েক মাস ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় অনেক ছোট ছোট ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে ছিল, তারা মনোযোগ দিয়েছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে। এতে সার্বিকভাবে দক্ষতা অনেক বেড়েছে। রফতানিমুখী অনেক উৎপাদনকারী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় রফতানি প্রবৃদ্ধিতেও আমাদের কিছুটা সুবিধা হয়েছে।

আবার যাদের স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন সুবিধা আছে, তারাই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের দাম ঠিক রাখতে পেরেছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে কভিড পরিস্থিতি ভালো ছিল। এ সময়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকা ছাড়া অন্যান্য সব কার্যক্রম প্রায় স্বাভাবিক ছিল। এ প্রেক্ষাপটে পেশাদার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রয় প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যবসার ক্ষেত্রেও। সব মিলিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বেশি; বিশেষ করে বড় কোম্পানি, তাদের পক্ষে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাটা সহজ হয়েছে।

আগের প্রান্তিকগুলোয় কমলেও চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে বসুন্ধরা পেপার মিলসের আয় বেড়েছে ৭ শতাংশ। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে তিন গুণের বেশি।

ওষুধ খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি একমি ল্যাবরেটরিজের আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।

বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশের আয় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে ১২৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ২২ শতাংশ। করোনাকালে জীবাণুনাশক পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে কোম্পানিটির ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিটির উৎপাদিত ডেটল ও লাইজলের বেশ চাহিদা রয়েছে।

ওষুধ খাতের কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে ১৯ শতাংশ। সম্প্রতি দেশে মডার্না ও জনসন অ্যান্ড জনসনের কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আমদানির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করে রেনাটা। মডার্নার ৫ লাখ টিকা আমদানির জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে কোম্পানিটি। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিটি টিকা আনতে পারলে তা ভবিষ্যতে কোম্পানিটির আয়ে প্রভাব ফেলবে।

আরএকে সিরামিকসের আয় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় কোম্পানিটির আয় হয়েছে ১৭৩ কোটি টাকা। নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।

করোনাকালেও বড় করপোরেটদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধির ধারা প্রসঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, কভিডকালে আমরা নিজেদের সহনশীলতার বিষয়টি আবারে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি।

সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও বাস্তবতা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সেটি সবার জন্যই সহায়ক হয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর ব্যবসার প্রবণতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামনে আমরা আরো ভালো করতে পারতাম। যদিও কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আমাদের কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। তবে আমরা যদি দ্রুতই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে শেষ প্রান্তিকেও ব্যবসা খারাপ হবে না বলে আমি মনে করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here