সিনিয়র রিপোর্টার : নভেল করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশ লকডাউনে থাকায় বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ রেখেছে পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো। এ পরিস্থিতিতে ভোক্তা চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নতুন ক্রয়াদেশ দিচ্ছে না ক্রেতারা। উল্টো চলমান ক্রয়াদেশগুলো স্থগিত ও বাতিল করেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য মতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০৫৯ কারখানায় প্রায় ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি খাতে সরকারের প্রণোদনার টাকা সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যাবে। পোশাক খাতের মালিকরা এই টাকা থেকে সরাসরি কোনো সুবিধা পাবেন না।

জানা গেছে, করোনার প্রভাবে প্রথমে কাঁচামাল সরবরাহ সংকটে পড়তে হয়েছিল পোশাক খাতকে। চীননির্ভর কাঁচামালগুলো আসতে পারছিল না। কারণ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

ধীরগতিতে হলেও কাঁচামাল সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও এখন চাহিদা সংকটে পড়েছে পোশাক খাত। পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতারা একের পর এক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ভোক্তা চাহিদা কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশ দিচ্ছে ক্রেতারা।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, বিজিএমইএর সদস্য ১০৫৯ কারখানার ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এসব ক্রয়াদেশের আওতায় ছিল ৯২০ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন পিস পোশাক। এসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় আছে ২ দশমিক ১০ মিলিয়ন শ্রমিক। ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিত করা ক্রেতাদের মধ্যে প্রাইমার্কের মতো বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও আছে। আয়ারল্যান্ডভিত্তিক প্রাইমার্কের পাশাপাশি ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিত করেছে ইউরোপের ছোট-মাঝারি-বড় সব ধরনের ক্রেতাই।

এদিকে পোশাক খাতকে বাঁচাতে শ্রমিকদের বেতনের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এ তহবিল পরিচালনা করবে দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এই তহবিলের কোনো টাকা পাবেন না পোশাকশিল্প মালিকরা। এই টাকা বেতন হিসেবে সরাসরি চলে যাবে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

এছাড়া নির্ধারিত গ্রেস পিরিয়ডসহ লম্বা সময় ২ শতাংশ সুদে শিল্প মালিকরা ওই অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এর আগে গত ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী মহামারি আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংকটের মুহূর্তে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা দেন। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ওই তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে পোশাক কারখানা রয়েছে ৪ হাজার ৬২১টি। বর্তমানে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে ৪১ লাখের মতো শ্রমিক কাজ করেন, যার অধিকাংশই নারী। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এর আগেই জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বায়াররা অর্ডার বাতিল করছেন। তারপরও কারখানা চালু রাখা হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় কমেছে। অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি শেষে পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ কম। একই সময়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও কমেছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। দেশগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া অন্য সব দোকান ও প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। গ্যাপ, নাইকি, ইন্ডিটেক্সের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন দেশে তাদের বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।

সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলেছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার বা ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শূন্য দশমিক ১ শতাংশের সমান।

বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে আসায় বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা, ভ্রমণ, পর্যটন, শিল্প উৎপাদনে বাধা তৈরির প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য ক্ষতির ধারণাগত এই হিসাব দিয়েছে এডিবি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here