পুত্রদের ঐক্য ধরে রাখতে মোনেম গ্রুপের দায়িত্ব নিলেন মা

0
767

বিশেষ প্রতিনিধি : ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপের কর্ণধার ধীরু ভাই আম্বানি মারা গেলে ব্যবসার হিস্যা নিয়ে সম্পর্কের তিক্ততা তৈরি হয় তার দুই ছেলে মুকেশ ও অনিল আম্বানির মধ্যে। এ পরিস্থিতিতে বিরোধ নিরসনে এগিয়ে আসেন তাদের মা। তার নির্দেশনা অনুযায়ী দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায় রিলায়েন্স গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানে অনেকটা একই ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গ্রুপ আবদুল মোনেম লিমিটেড।

তবে ধীরু আম্বানির স্ত্রী দুই সন্তানের মধ্যে ব্যবসা ভাগ করে দিলেও তা করেননি আবদুল মোনেমের স্ত্রী মেহেরুন্নেসা। স্বামীর প্রয়াণের পর পুত্রদের ঐক্য ধরে রাখতে অন্দরমহল থেকে এসে নিজেই হাল ধরেছেন ব্যবসার, দায়িত্ব নিয়েছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের।

১৯৫৬ সালে মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে নির্মাণ খাতে ব্যবসা শুরু করেন আবদুল মোনেম। গড়ে তোলেন এএমএল কন্সট্রাকশন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা করা আবদুল মোনেম লিমিটেড এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গ্রুপ। দেশের সরকারি খাতের অনেক বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে এ প্রতিষ্ঠানের হাতে। নির্মাণ খাত দিয়ে শুরু করলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা প্রসারিত হয়েছে নানা খাতে।

করোনা মহামারীর মধ্যে গত ৩১ মে প্রয়াত হয়েছেন আবদুল মোনেম। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত গ্রুপের সব ব্যবসা একক কর্তৃত্বে পরিচালনা করেছেন তিনি। ঠিক করে যাননি প্রতিষ্ঠানের নতুন নেতৃত্বও। এ অবস্থায় আবদুল মোনেমের মৃত্যুর পর ব্যবসা ঠিক রাখতে গ্রুপের হাল ধরেছেন তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা। যদিও স্বামী জীবিত থাকাকালে কখনই সম্মুখভাগে এসে ব্যবসার নেতৃত্ব নিতে দেখা যায়নি তাকে।

আবদুল মোনেম গ্রুপের চেয়ারম্যানের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় ছেলে মাঈনুদ্দিন মোনেম ও ছোট ছেলে মহিউদ্দিন মোনেম আগে থেকেই পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত। তাদের তিন বোনের মধ্যে একজন ব্যবসা পরিচালনায় যুক্ত থাকলেও বাকি দুজন দেশের বাইরে থাকেন।

আবদুল মোনেম জীবিত থাকাকালেই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাগাভাগি করে দেখাশোনা করে আসছিলেন তার দুই ছেলে মাঈনুদ্দিন মোনেম ও মহিউদ্দিন মোনেম। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর এখন ব্যবসা পরিচালনা ও হিস্যা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে ওই পরিবারে। তবে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আগেই সমস্যা সমাধানে ব্যবসার হাল ধরেছেন সারা জীবন অন্দরমহলে থাকা তাদের মা মেহেরুন্নেসা।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আবদুল মোনেমের প্রয়াণের পর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রূপান্তরের ধারাবাহিকতায় ব্যবসা পরিচালনাও ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি একটি ব্যাংকে আবদুল মোনেম গ্রুপের লেনদেন ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ব্যবসা পরিচালনা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা।

তারা জানান, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মোনেমের প্রয়াণের পর চেয়ারম্যান ও এমডি হয়েছেন তার স্ত্রী মেহেরুন্নেসা। বোর্ডের সর্বসম্মতিক্রমে তাকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যান ও এমডি হিসেবে আবদুল মোনেমের যে ক্ষমতা ছিল প্রতিষ্ঠানের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস অনুযায়ী এখন সেই ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন তার স্ত্রী। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত ওই পরিবর্তনটুকুই এসেছে প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া সব ব্যবসা মসৃণভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলেও দাবি করছেন তারা।

এ বিষয়ে আবদুল মোনেম গ্রুপের ম্যানেজার (লিগ্যাল) জহিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান মারা গেছেন ৩১ মে। আর ৭ জুনের মধ্যে পর্ষদে পরিবর্তনসংক্রান্ত রেজল্যুশন চূড়ান্ত হয়েছে। এরপর আরজেএসসির প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হতে ১০-২০ দিন সময় লেগেছে। ওই সময় বিভিন্ন ব্যাংক মৌখিকভাবে আমাদের বলেছে প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে। এ কাজও দ্রুত সম্পন্ন করে একটা পর্যায়ে সব ব্যাংককে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।

যা রূপান্তর হওয়ার কথা তা হয়েছে, এমন মন্তব্য করে জহিরুল ইসলাম আরো বলেন, কোনো কোম্পানির পদ খালি হলে মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস অনুযায়ী পরিচালকদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনকে এমডি নিয়োগ দিতে হয়। পরিচালনা পর্ষদ সভায় বসে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত পাস করেছে যে আমাদের পরিচালনা পর্ষদ সদস্য মেহেরুন্নেসা ব্যবস্থাপনা পরিচালক হবেন। এ সিদ্ধান্ত যৌথ মূলধনি কোম্পানির নিবন্ধকের অনুমোদনও পেয়েছে। মহামারী শুরু হওয়ার আগে আর্থিক অবস্থায় ওঠানামা থাকলেও প্রাদুর্ভাব-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সব প্রকল্প মসৃণভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

ব্যক্তি খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আবদুল মোনেম মারা যাওয়ার পরই পরিবারের কে কী পাবেন, না পাবেন তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এখনো সেই আলোচনা চলছে। এর মধ্যে সিইও প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার কর্তৃত্বে একধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সিইও কেন চলে গেলেন সেটা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। কোম্পানির কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না বা সিইও কোম্পানির কোনো ক্ষতি করেছেন কি না, এ বিষয় উদঘাটনে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তত্পরতা আছে।

দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে মতের মিল এক রকম নয়—এমন তথ্য উল্লেখ করে সূত্র আরো বলেছে, সমাজের সব মানুষ যেমন এক না, তেমনি পরিবারেও না। কিছু মানুষ আছে তারা ভাবে বাবার গড়ে তোলা কিছু আমি কেন ভাঙব? আবার অন্যজন হয়তো ভাবছে, আমি আমারটা চালাব, আমি যা করার যতটুকু নেয়ার তা নেব।

শোনা যাচ্ছে, আবদুল মোনেমের বড় ও ছোট ছেলে বিপরীত মানসিকতার। আর দুই ভাইয়ের স্বার্থ সংঘাতের বিষয়গুলো যৌক্তিকও না ক্ষেত্রবিশেষে। এ পরিস্থিতিতে এখন তাদের মা ভূমিকা পালন করছেন। এখন সব উত্তরাধিকারীর মধ্যে ব্যবসা ও সম্পদ বণ্টনের বিষয়গুলো নির্ধারণ করা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল মোনেম গ্রুপের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই আবদুল মোনেম গ্রুপের কাঠামোতে ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা দেখা দিচ্ছে। কারণ একক নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় পরিচালিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন হঠাৎ পরিবর্তন আসায় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

আবদুল মোনেমের শূন্যতার সঙ্গে পরিস্থিতি আরো জটিল করেছে পেশাদার কর্মীর দুর্নীতি। এ বিষয়গুলোকেই বিবেচনায় নিয়ে এখন আবদুল মোনেম গ্রুপ কাঠামো সংগঠিত করছে। দুর্নীতি শনাক্তে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাও করা হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।

দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সুনামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে আবদুল মোনেম লিমিটেড। ১৯৫৬ সালে এএমএল কন্সট্রাকশন দিয়ে যাত্রা শুরু হয়ে বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় গ্রুপে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এর অধীনে প্রতিষ্ঠান রয়েছে এক ডজনেরও বেশি।

১৯৮২ সালে আইসক্রিম ইউনিটের পাশাপাশি স্থাপিত হয় বেভারেজ ইউনিট। এ গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইগলু ফুডস, ড্যানিস বাংলা ইমালশন লিমিটেড, এএম সিকিউরিটিজ ও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি লিমিটেড, এএম এনার্জি, নোভাস ফার্মাসিউটিক্যালস, এএম অ্যাসফল্ট অ্যান্ড রেডিমিক্স কংক্রিট লিমিটেড, এএম অটো ব্রিকস লিমিটেড, ইগলু ডেইরি লিমিটেড ও মোনেম ইকোনমিক জোন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here