‘পুঁজিবাজারের এক নাম্বার শেয়ার হবে ওয়ালটন’

0
2742

স্টাফ রিপোর্টার : ওয়ালটন পুঁজিবাজারে এক নাম্বার শেয়ার হবে। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই শেয়ারবাজারে আসতে যাচ্ছে ওয়ালটন। টাকার জন্য শেয়ারবাজারে ওয়ালটন আসছে না। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কাছে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই পুঁজিবাজারের অন্তর্ভূক্ত হবে ওয়ালটন।

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ওয়ালটনের করপোরেট অফিসের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত রোড শো অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আশরাফুল আলম।

তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সেরা ৫টি ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ডের একটি হতে চায় ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এ উদ্দেশ্যে কোম্পানিটি তার রিসার্চ ও মার্কেটিংসহ সব বিভাগকে প্রস্তুত করছে।

কোম্পানিটি বুকবিল্ডিং পদ্ধতির আইপিওর মাধ্যমে বাজারে নতুন শেয়ার বিক্রি করে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে।উত্তোলিত অর্থ কোম্পানির কারখানা সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন, গবেষণা ও মান উন্নয়ন, আংশিক ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং আইপিও খরচ মেটাতে ব্যয় করা হবে। তবে এটি কোম্পানির আইপিওর ঘোষিত উদ্দেশ্য হলেও মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই ভিন্ন।

মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে আসার এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া কোনো ধরনের পারিবারিক বিরোধ, মতভিন্নতা অথবা নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে যাতে কোম্পানির ভবিষ্যত হুমকির মুখে না পড়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত চলমান থাকে কোম্পানির ব্যবসা- সেই উদ্দেশ্যও রয়েছে আইপিওতে আসার পেছনে।

রোড শো-তে ওয়ালটন এমডি বলেন, শুধু টাকার জন্য শেয়ারবাজারে আসছি না। আমাদের জার্নিটার লক্ষ্য সূদুরপ্রসারী। বিশ্বের শীর্ষ ব্রান্ডগুলোর একটি হতে চায় ওয়ালটন। আর এ কারণে বাজারে আসছি। আমাদের জার্নিতে আপনাদেরকে প্রয়োজন।

রোড শোতে এলিজিবল ইনভেস্টর তথা ব্রোকারহাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রতিনিধিসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির পরিচিতি, আর্থিকচিত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। রোড শোতে স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

রোড শোতে এস এম আশরাফুল আলম বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগে যখন ওয়ালটন দেশে ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন শুরু করে তখন হয়তো কেউ কল্পনা-ই করেনি সে সময়কার বাঘা বাঘা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারবে। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ছিল, বিশ্বাস ছিল। ছিল নিরন্তর চেষ্টা। দেশী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে টপকে ওয়ালটন এখন মার্কেট লিডার। ফ্রিজের বাজারের ৭০ শতাংশের বেশি ওয়ালটনের দখলে। অন্যান্য সেগমেন্টেও ওয়ালটনের অবস্থান সুদৃঢ়।

তিনি বলেন, আমরা ওয়ালটনকে বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করতে চাই। এটি অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, এটি খুবই সম্ভব। স্থানীয় বাজারে অন্যান্য কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শীর্ষে উঠে আসা যতটুকু কষ্টকর ছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে শুক্ত অবস্থান তৈরি করা তার চেয়ে কম কষ্টকর হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

আশরাফুল আলম বলেন, বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোর বয়স ৬০/৭০ বছরেরও বেশি। তারা এত বছরে যতটুকু এসেছে, আমরা আগামি ১০ বছরেই ততটুকু এগোব, তাদের কাছাকাছি পৌঁছব বলে বিশ্বাস করি। তিনি বলেন, বিশ্বে ফ্রিজের বাজারের আকার প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা)। এর মাত্র ১ শতাংশ দখলে নিতে পারলেও যে কোনো কোম্পানির জন্য তা হবে বিশাল ঘটনা।

তিনি বলেন, যারা আমাদের শেয়ার কিনবেন আশা করি তারা বঞ্চিত হবেন না। আমরা প্রতিবছরই সেরা ভ্যাট দাতা নির্বাচিত হই। ভ্যাট কখনও ইচ্ছে করে বেশি বা কম দেই না। সরকারের যতটুকু প্রাপ্য, ততটুকুই দেই। আস্থা রাখেন, বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর মুনাফা বা লভ্যাংশেও আমরা কম বেশি করবো না।

২০১৯ সালের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বছর আমরা ফ্রিজ বিক্রি করে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করবো।আপনারা তা লিখে রাখতে পারেন। তা অর্জন করতে না পারলে পরবর্তী বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তা আমাকে জিজ্ঞাস করবেন। আশা করি আমি যা বলেছি তা অর্জন সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, ওয়ালটন দেশের বাজারে বড় ধরনের প্লাটফর্ম তৈরী করতে পারে। দেশে যেসব কোম্পানি ৬০-৭০ বছর ব্যবসা করছে ওয়ালটন তাদের পেছনে ফেলে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গ্লোবাল মার্কেটের স্ট্যান্ডার্ড ফলো করছে। বিশ্বের সেরা কোম্পানির মধ্যে ওয়ালটনের নাম আসবে বলে আশা করছি।

ওয়ালটনের জন্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, ওয়ালটনের জন্ম ফ্যামিলি পরিসরে। আপনাদের হাত ধরে বিশাল বড় কোম্পানি হবে ওয়ালটন। আপনাদেরকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবো। ফ্যামিলি প্রতিষ্ঠান একটা নির্দিষ্ট বৃত্তে থাকে। কিন্তু পাবলিক প্রতিষ্ঠান পরিবার তথা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বে সেরা হিসেবে গড়ে উঠে। যখন শুরু করি তখন অন্যান্য কোম্পানিকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাবো সেটা ছিল স্বপ্ন। আর এখন তা বাস্তবায়নের পথে। তাই আপনাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব সেরা হতে চাই। সেটা যাতে টেকসই হয় তাই আমরা জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে চাই। আর এতে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

২০১৭ সালে মুনাফা কিছু কমে যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের বেশির ভাগ সময়ই বিনিয়োগ হয়েছে। আর এ কারণে প্রফিট সামান্য কমেছে। আলোচিত সময়ে বেশির ভাগ পন্যের জন্ম। ওই বিনিয়োগের রিটার্ন গত বছর আসতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে কোম্পানির মুনাফা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আপনারা বুঝতে পারবেন।

তিনি বলেন, ২০১৭ সালের শেষ দিকে ওয়ালটন কম্প্রেসার উৎপাদন শুরু করে। উৎপাদনের চেয়ে পণ্যটির চাহিদা বেশি দেখতে পেয়েছি। ওয়ালটনের রিস্ক ফ্যাক্টর সম্পর্কে তিনি বলেন, ওয়ালটন এসি, রেফ্রিজারেটর তৈরী করে। এ কারণে এসব পন্যে রিস্ক রয়েছে। আর তা হল শীত। শীত আমাদের পণ্যের জন্য বড় সমস্যা। এসি এবং রেফ্রিজারেটর শীতে কাহিল হওয়ার পণ্য। সুতরাং এ সময় পন্য বিক্রি কিছুটা কম হয়। আর এটাই ওয়ালটনের রিস্ক ফ্যাক্টর।

তিনি আরও বলেন, রিস্ক ফ্যাক্টর আছে বলেই ওয়ালটন প্রায় ৩০ টি পণ্য নিয়ে কাজ করছে। এসি, ফ্রিজ শীতকালে বিক্রি কম হলেও অন্যান্য পণ্যের বিক্রি স্বাভাবিক থাকবে। যা মুনাফা অর্জনে ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি।

ওয়ালটনের আইপিওর রেজিস্ট্রার টু দ্যা ইস্যু প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ তাবারক হোসেন ভুঁইয়া বলেন, ওয়ালটনের মিশন ও ভিশন খুবই ভালো। আমি দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষকতার সঙ্গেও জড়িত। ওয়ালটনের ভিশন ও মিশনকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে আমি আমার শিক্ষার্থীদের জানাবো। তিনি বলেন, যার ভিশন ও মিশন ঠিক থাকবে তার পথ চলাও সহজ হবে। আমি বিশ্বাস করি বিনিয়োগকারীরা এই কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে লাভবান হবেন।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এসএম নূরুল আলম রেজভী বলেন, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিই মানব সভ্যতাকে এতদূর এগিয়ে এনেছে। মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। আর এ কারণে তারা লাভজনক ব্যবসা ছেড়ে প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা শুরু করেছে। আমাদের উদ্দেশ্য দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া।

প্রসঙ্গত, ৬০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের কোম্পানি ওয়ালটনের পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা। চলতি হিসাববছরের (২০১৮-১৯) প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৮) কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ১০ টাকা ৫৯ পয়সা এবং শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ২০৮ টাকা। কোম্পানির পুঞ্জিভূত মুনাফা ২ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা এবং শেয়ার প্রতি নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ১৭ টাকা ২০ পয়সা।

এএএ ফাইনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ইস্যু ম্যানেজার এবং প্রাইম ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড রেজিস্টার টু দ্য ইস্যু হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।

রোড শোতে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান এসএম নূরুল আলম রেজভী, পরিচালক এসএম মাহবুবুল আলম, ইনডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর এম ফরহাদ হোসেইন, এএএ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান খাজা আরিফ উপস্থিত ছিলেন।

বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের ওয়ালটনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আবুল বাশার হাওলাদার এবং অপারেটিভ ডিরেক্টর মো. ইয়াকুব আলী এফসিএ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here