পাইপের বাজারে অশনি সংকেত : বন্ধ হচ্ছে উৎপাদন, অস্থির বাজার

0
325

শাহীনুর ইসলাম : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ২০২০ সালে বিশ্বে আমদানি-রপ্তানি প্রায় বন্ধ ছিল। বাংলাদেশেও কাঁচামাল আমদানিনির্ভর বিভিন্ন খাতের কোম্পানিতে সেই প্রভাব পড়লে উৎপাদন প্রায় বন্ধ এবং বাজার বিপণন ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়। নতুন করে আমদানি শুরু হলে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে পাইপ তৈরির কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৯১ শতাংশ।

একইসঙ্গে জাহাজ ভাড়া, কন্টেইনার ভাড়া, মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) আরো অনেক ব্যয় বাড়ায় উৎপাদিত পণ্য বাজারে টিকতে পারছে না। অন্যদিকে, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ডিলারদেরও সাড়া মিলছে না। যে কারণে লোকসান কমাতে সব ধরনের পাইপের উৎপাদন কমিয়ে বা বন্ধ করে খাবি খাচ্ছে অনেক কোম্পানি।

আন্তর্জাতিক বাজারে পাইপ তৈরির প্রধান কাঁচামাল রেজিনের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বরে এক মেট্রিক টন রেজিনের দাম ছিল মাত্র ৮০০ ডলার। চলতি বছরের অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ১৯০০ ডলার।

এর সঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়া, কন্টেইনার ভাড়া, মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) অনেক ব্যয়। আরো কয়েকটি খাতে ব্যয় বাড়ায় এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়াতে না পারায় স্থবির হয়ে পড়েছে পাইপের বাজার বিপণন ব্যবস্থা। যে কারণে দেশে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ছোট-বড় অনেক কোম্পানির।

করোনার সংক্রমণ বিশ্বে কমতে শুরু করলে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে আমদানিকারণ কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য আমদানি শুরু করে। করোনাকালের আগের তুলনায় অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দর বাড়ে। ২০২০ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে দাম পুষিয়ে নিলেও চলতি বছরের নভেম্বর মাসে তা দ্বিগুণের বেশি হয়।

ডলারে দাম বাড়তে থাকায় স্থবির হয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন, যার প্রভাবে দেশীয় বাজার বিপণণে রাখতে না পারায় উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে ছোট-বড় কোম্পানির। এই তালিকায় ইতোমধ্যে নাম লিখিয়েছে ঐতিহ্যবাহী কোম্পানিও।

আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে রেসিনের দাম বৃদ্ধির চিত্র

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ছাড়া অন্য কোনও কোম্পানি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য দিতে পারছে না। ন্যাশনাল পলিমার, গাজী পাইপস, লিরা এবং বেঙ্গল প্লাস্টিক প্রধান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলেও তারা পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় মূল্য বেড়েছে বলে জানান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিক্রয় প্রতিনিধি মো. শহীদ।

এদিকে, বৃহস্পতিবার (১১ নভেম্বর) থেকে ন্যাশনাল পলিমারের পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাজারে টিকে থাকতে আরো দাম বাড়তে পারে, তবে কী পরিমাণ বাড়ানো হবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না বলে জানান ন্যাশনাল পলিমার লিমিটেডের কুমিল্লা বিভাগের জোনাল ম্যানেজার মো. সোহেল।

অন্যদিকে, আবাসন খাতে বিভিন্ন ফিটিংস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও বাজারে সরবরাহ কমেছে। সানরাইস কোম্পানির বাজার দখলের বিশেষ প্রভাব থাকলেও এ প্রতিষ্ঠানের পণ্য কমতে শুরু করেছে, যার প্রভাব পড়বে আবাসন এবং কৃষি খাতে।

ছোট কোম্পানিগুলো যেসব পণ্য তৈরি করতো, করোনার প্রথম ঢেউয়ে তারা ভেসে গেছে। ২০২১ সালে দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগে কিছু কোম্পানি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তা পারেনি।

কৃষিক্ষেত্রে এবং আবাসনের জন্য বিভিন্ন ফিটিংস তৈরি করতো আজিজ পাইপস লিমিটেড। প্রায় ১০ মাস পরে ১ অক্টোবর দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন শুরু করলেও ৮ নভেম্বর ঘোষণা দিয়ে উৎপাদন বন্ধ করেছে আজিজ পাইপস লিমিটেড।

বন্ধের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে রেসিনের মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে দেশীয় বাজারে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করতে না পারায় কোম্পানির লোকসান বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে দাম বেড়েছে, সেই রেশিও অনুসারে পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। মাত্র ৪০% দাম বাড়ানো হলে ডিলাররা তা নিতে আগ্রহী নয়। যে কারণে কোম্পানি টিকে থাকার স্বার্থে উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে বলে জানান আজিজ পাইপস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আবছার।

তিনি বলেন, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে যেহেতু পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না, তাই ‘প্রডাকশন লস’ থেকে বাঁচতে আজিজ পাইপের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২০ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পাইপ তৈরির কাঁচামালের প্রধান উপকরণ রেজিনের প্রতি মেট্রিক-টনের মূল্য ছিল ৮০০ ডলার। চলতি নভেম্বর মাসে বেড়ে হয়েছে ১৫শ থেকে ১৬শ ডলার।

দেশীয় বাজারে প্রতি মেট্রিক টন ১ লাখ ১০ হাজার পরিবর্তে দাম হয়েছে ২ লাখ টাকা। যেখানে মূল্য বৃদ্ধির হার প্রায় ৯১ শতাংশ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের আনুপাতিক মূল্য বৃদ্ধি হিসেবে উৎপাদিত পণ্য বেশি দামে বিক্রয় করা সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে না পেরে উৎপাদন গুটিয়ে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো।

আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় অক্টোবরে রেজিনের মূল্য আরো বেড়ে প্রতি মেট্রিক টনের দাম হয়েছে ১৯০০ ডলার। স্থানীয় বাজারে মূল্য হয় প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকবাজারে ডলারের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় ব্যাংকগুলো পণ্য আমদানি করতে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি  উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ডিলারদের সাড়া মিলছে না, যার প্রভাব পড়তে যাচ্ছে আবাসন ও কৃষি খাতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here