তিন কোম্পানির ৬ পরিচালকের দেশত্যাগ ঠেকাতে বিএসইসির চিঠি

0
658

স্টাফ রিপোর্টার : সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিন কোম্পানির ৬ পরিচালকের দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত মহা-পরিদর্শক বরাবর চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পাশাপাশি বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতেও চিঠি দিয়েছে বিএসইসি।

কোম্পানি ৩টি হচ্ছে : আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বিডি লিমিটেড এবং ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

এর আগে বিএসইসির পরিচালক (এসআরএমআইসি) রিপন কুমার দেবনাথ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ৬ ডিসেম্বর পুলিশ, বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক (ইমিগ্রেশন) এবং সব স্থলবন্দরে চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

চিঠিতে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান আজিমুল ইসলাম, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী এবং ইমাম বাটন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান জেবুন্নেসা আক্তার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী, পরিচালক লোকমান চৌধুরী ও হামিদা বেগমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, এই ৬ জন পরিচালক পুঁজিবাজার থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), রিপিট পাবলিক অফার (আরপিও) এবং রাইট শেয়ার অফারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করেন এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে তাদের ধারণকৃত বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেন। এতে কমিশনের বিভিন্ন আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কর্তৃক তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিএসইসি বিভিন্ন সময়ে এ পরিচালকদের কমিশনে উপস্থিতপূর্বক ব্যাখ্যা তলব করে। কিন্তু তারা কমিশনে উপস্থিত হননি অথবা ব্যাখ্যা প্রদানে অসমর্থ হন। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে কমিশন মনে করে উল্লিখিত ব্যক্তিরা অচিরেই দেশ ত্যাগ করতে পারেন।

এ অবস্থায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য উল্লিখিত কোম্পানির পরিচালকদের সম্পর্কে বিএসইসি কর্তৃক পরবর্তী তথ্য প্রেরণ না করা পর্যন্ত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিএসইসির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

এ বিষয়ে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, এ বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে কমিশনের সাথে আমরা সাক্ষাৎ করেছি। সে সময় কমিশনের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল। নিরীক্ষার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় এজন্য আমরা কমিশনের কাছে সময় চেয়েছিলাম।

তাছাড়া আমাদের অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এসব কারণেই আমরা কমিশনের চাহিদা অনুসারে সময়মতো সব তথ্য দিতে পারিনি। আর এর মধ্যেই কমিশনের পক্ষ থেকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। কারণ আলিফ গ্রুপের নিজেদের কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হলেও অন্য উদ্যোক্তার দুটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি কিনে নেয় তারা।

এর মধ্যে ২০১৭ সালে সিএমসি কামাল কিনে নেয় আলিফ গ্রুপ এবং নাম পরিবর্তন করে আলিফ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড রাখা হয়।

এছাড়া একই বছর ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটে (ওটিসি) থাকা সজিব নিটওয়্যারকেও কিনে মূল মার্কেটে নিয়ে আসে আলিফ গ্রুপ। পুঁজিবাজারের আরেক সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানি সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডকে কিনে নেয়ার জন্য ২০১৭ সালের শুরুতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল আলিফ গ্রুপ। তবে পরবর্তী সময়ে সেই চুক্তি থেকে সরে গ্রুপটি। যদিও এ খবরে তখন স্টক এক্সচেঞ্জে সেন্ট্রাল ফার্মার শেয়ার দর অস্বাভাবিক বেড়েছিল।

২০১৮ সালে স্বল্প মূলধনি কোম্পানি বিডি অটোকারস ও লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার কিনে নেয় আলিফ গ্রুপ। এতে কোম্পানি দুটির শেয়ারে অস্বাভাবিক দর বেড়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কমিশনে তদন্তে বিডি অটোকারস ও লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পেছনে আলিফ গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হওয়ায় ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় আলিফ গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম, তার ছেলে গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিমুল ইসলাম, চেয়ারম্যানের স্ত্রী লুত্ফুন নেছা ইসলাম, আজিমুল ইসলামের স্ত্রী নাবিলা ইসলামসহ তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলিফ টেক্সটাইল মিলস ও বায়তুল খামুরকে ২ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়।

সর্বশেষ গত বছর তারল্য সংকটে থাকা বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেডের (বিডি ওয়েল্ডিং) শেয়ার কিনে নেয়ার উদ্যোগ নেয় আলিফ গ্রুপ। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কাছ থেকে কোম্পানিটির ২৫ দশমিক ২৬ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়ার কথা জানায় আলিফ গ্রুপ। এজন্য আইসিবির সঙ্গে চুক্তিও করে গ্রুপটি। যদিও এখন পর্যন্ত চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেনি।

মূলত বিডি ওয়েল্ডিং ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি হওয়ায় এবং এর পর্ষদে আইসিবির মনোনীত পরিচালক থাকার কারণে শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয় এবং এতে কমিশনের অনুমোদনও পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে আলিফ গ্রুপ ও এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিমুল ইসলামের কার্যক্রমের বিষয়টি কমিশনের সক্রিয় নজরদারিতে রয়েছে। আর এ কারণেই তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here