জনতা ব্যাংকে হঠাৎ কেন পরিবর্তন?

0
1413

সিনিয়র রিপোর্টার : রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে গত বছরের আগস্টে নিয়োগ পেয়েছিলেন জামালউদ্দিন আহমেদ। নিয়োগপত্রে তার মেয়াদ ধরা হয়েছিল তিন বছর। কিন্তু পূর্ণ মেয়াদ দূরে থাক, এক বছর পার করার আগেই পদ হারালেন তিনি। মঙ্গলবার তাকে পদচ্যুত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তার স্থলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমানকে।

জনতা ব্যাংকে হঠাৎ কেন এ পরিবর্তন? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। জামালউদ্দিনের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ, চেয়ারম্যান পদে যোগদানের পর থেকেই ব্যাংকটির প্রতিটি কাজে হস্তক্ষেপ করছিলেন তিনি।

বিশেষ কিছু গ্রাহককে ঋণ দেয়ার জন্য তদবির, সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে দেনদরবার, ব্যাংকের যেকোনো কেনাকাটায় হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বদলি পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন তার ক্ষমতা। ঘুষ হিসেবে গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণের কমিশন আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছিল বেশ কয়েকটি অভিযোগ। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ত্বরিত পদক্ষেপ হিসেবেই জামালউদ্দিনকে সরিয়ে দেয়া হলো।

জনতা ব্যাংক সূত্র বলছে, অন্য ব্যাংকে খেলাপি এমন কিছু বিশেষ গ্রাহককে ঋণ পাইয়ে দিতে তদবির করছিলেন জামালউদ্দিন। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা প্রভিটা গ্রুপের প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ অধিগ্রহণের প্রস্তাব আনেন তিনি। একই সঙ্গে ইনফাটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৫০ কোটি টাকা পাইয়ে দেয়ার জন্যও তোড়জোড় চালাচ্ছিলেন।

জনতা ব্যাংকের একাধিক পরিচালক ও নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, জামালউদ্দিন জনতা ব্যাংক চালাচ্ছিলেন আবদুল হাই বাচ্চুর স্টাইলে। বাচ্চু যেভাবে বেসিক ব্যাংককে খাদে ফেলে দিয়েছেন, জামালউদ্দিনও জনতা ব্যাংককে সেদিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা প্রভিটা গ্রুপের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কিনে নেয়ার একটি প্রস্তাব অনেক দিন থেকেই পাস করানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

একই সঙ্গে ইনফাটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৫০ কোটি টাকা পাইয়ে দিতে জোর তদবির চালিয়েছেন। অথচ ওই প্রতিষ্ঠানটি জনতা ব্যাংকের ৭০ কোটি টাকার ঋণই ঠিকমতো পরিশোধ করছে না। ইনফাটেক ঋণের জামানত হিসেবে ময়মনসিংহের ভালুকায় বন বিভাগের কিছু জমি জনতা ব্যাংকে রাখতে চেয়েছে। তার পরও চেয়ারম্যান জামালউদ্দিন ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।

যেকোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাজ হলো নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখা। সে নীতির বাস্তবায়ন ঘটাবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজেই ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাজ হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ না করায় ব্যাংকটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলিও করান। অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এড়িয়ে উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ডেকে এনে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন তিনি।

জনতা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে স্বীকৃত ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখা। এ শাখা ব্যাংকটির ঢাকা উত্তর অঞ্চলের (জোন) অধীনে পরিচালিত হয়। এ জোনের দায়িত্বে আছেন ব্যাংকটির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোরশেদুল কবির। নির্দেশ অনুযায়ী বিশেষ একটি ঋণ প্রস্তাব না পাঠানোয় পর্ষদ সভায় শাখাটির বিষয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন জামালউদ্দিন। ওই সভায়ই তিনি ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখাকে ঢাকা উত্তর জোন থেকে ঢাকা দক্ষিণ জোনে স্থানান্তর করেন।

জনতা ব্যাংকে বড় মাপের লুণ্ঠন হয় ২০০৯ সাল-পরবর্তী পাঁচ বছরে। এ সময়ে ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়। ব্যাংকটির লুণ্ঠনের নেতৃত্বে থাকা গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট, চৌধুরী, রানকা ও বিআর স্পিনিং।

ঋণের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বড় করে তোলা হয়েছে ২০০৯-পরবর্তী সময়ে। এ পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল বারকাত। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামালউদ্দিন আহমেদও এ সময়ে জনতা ব্যাংকের পর্ষদে ছিলেন। শুধু পরিচালক পদে নয়, ২০০৯-পরবর্তী পাঁচ বছরই ব্যাংকটির অডিট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন জামালউদ্দিন আহমেদ।

আবুল বারকাত ও জামালউদ্দিনের সময়ে বিতরণ করা প্রায় প্রতিটি বড় ঋণেই অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২০১২ সালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে গেলে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। জনতা ব্যাংকসহ দেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল গ্রুপটি।

ওই সময় পর্যন্ত বিসমিল্লাহ গ্রুপের কেলেঙ্কারিই ছিল দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা। তার পর থেকে একের পর এক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়েছে জনতা ব্যাংক। এর মধ্যে অ্যাননটেক্স গ্রুপের ৬ হাজার কোটি, ক্রিসেন্ট গ্রুপের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

জনতা ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯ সাল শেষে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ২৩ গ্রাহকের কাছেই ঋণ ছিল ৩০ হাজার ৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকাই ছিল খেলাপি। বিতর্কিত গ্রুপগুলোকে দেয়া ঋণের মধ্যে অ্যাননটেক্স গ্রুপের কাছে ৬ হাজার ৩০২ কোটি, ক্রিসেন্ট গ্রুপের কাছে ৩ হাজার ৫৭৩ কোটি, রানকা গ্রুপের কাছে ১ হাজার ১৭০ কোটি, চৌধুরী গ্রুপের কাছে ৬৫৮ কোটি এবং বিআর স্পিনিংয়ের কাছে ৫৮৫ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এসব ঋণই খেলাপির খাতায় ওঠায় কয়েক দফায় পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তার পরও গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারছে না জনতা ব্যাংক।

বড় বড় আর্থিক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে এক সময়ের সেরা ব্যাংকটি এখন আর্থিক বিপর্যয়ে ধুঁকছে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৯৩ কোটি টাকা ছিল খেলাপির খাতায়।

তবে বিদায়ী বছরের মার্চে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। বড় ছাড় দিয়ে কিছু ঋণ পুনঃতফসিল করায় বর্তমানে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে এসেছে। প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার জনতা ব্যাংক গত বছর নিট মুনাফা করেছে মাত্র ১৮ কোটি টাকা।

গত বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করেছেন জামালউদ্দিন। ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেনাকাটাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করাসহ অনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সামগ্রিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিক মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও জামালউদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ

এস এম মাহফুজুর রহমান

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়নের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব জেহাদ উদ্দিন স্বাক্ষরিত পৃথক দুই আদেশে জামালউদ্দিন আহমেদকে অব্যাহতি ও এস এম মাহফুজুর রহমানকে নিয়োগ দেয়া হয়। এস এম মাহফুজুর রহমান ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ছিলেন।

ড. এস এম মাহফুজুর রহমান তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে অর্থ মন্ত্রণালয় আমাকে নিয়োগ দিয়েছে বলে শুনেছি। তবে আমি এখনো চিঠি পাইনি। চিঠি পেলে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে যোগদান করব।

ড. এস এম মাহফুজুর রহমানকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ।

তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর পরই আমরা সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিলাম। সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান স্যার চাইলে কাল (আজ বুধবার) সকালেই যোগদান করতে পারবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here