কর হ্রাসে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তিতে নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা

0
190

সিনিয়র রিপোর্টার : আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যকার কর ব্যবধান বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করতে প্রতি বছরের বাজেট প্রস্তাবে স্টেকহোল্ডাররা তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে করের ব্যবধান বাড়ানোর কথা বলা হয়।

সেখানে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে এ ব্যবধান কমানোর কারণে ভবিষ্যতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো আরো বেশি নিরুৎসাহিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রস্তাবিত বাজেটে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের বিষয়ে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, বীমাসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফোন কোম্পানি এবং সিগারেট প্রস্তুতকারী কোম্পানি ব্যতীত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট করের হার ২৫ শতাংশ। আর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট করের হার ৩৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে এটি কমিয়ে সাড়ে ৩২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর পরিশোধ করে পুঁজিবাজারে তিন বছরের জন্য এ অর্থ বিনিয়োগ করা হলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। এ বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।

তাছাড়া পুঁজিবাজার ছাড়াও ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা তাদের আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রদান সাপেক্ষে তা আয়কর রিটার্নে দেখাতে পারবেন। এক্ষেত্রে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ সরকারের অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না। ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা এ বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ সুযোগ পাবেন।

দেশের বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বন্ডের সুদ ও বাট্টার ওপর উৎসে কর এবং লেনদেন মূল্যের ওপর উৎসে কর সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে পুঁজিবাজারে বন্ডের লেনদেন বাড়বে বলে মনে করছেন তিনি।

বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট বিকাশের জন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। দেশে বন্ড মার্কেট বিকশিত হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বড় প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন ক্ষেত্র ও সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে অর্থায়ন ব্যয় কমবে বলে আশা করা যায়। বিশেষ করে এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিটের অসামঞ্জস্য অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি সম্পদের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি দায়জনিত অসুবিধা লাঘব হবে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ড মার্কেটকে আরো আকর্ষণীয় করার জন্য অর্থমন্ত্রী বন্ডের সুদ ও বাট্টার ওপর বিদ্যমান আগাম উৎসে কর কর্তনের বিধান রহিত করে সুদ ও বাট্টা পরিশোধ করার সময় উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাব করেছেন। তাছাড়া বন্ড লেনদেনের জন্য বর্তমান বিধান অনুসারে লেনদেন মূল্যের ওপর উৎসে কর কর্তনের পরিবর্তে লেনদেনের জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্ধারিত কমিশনের ওপর উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ সবাই যেখানে কভিড-১৯-এর প্রভাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমার কথা বলছে সেখানে অর্থমন্ত্রী কীভাবে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন, সেটি আমার বোধগম্য নয়। এমনিতেই পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলো আসতে চায় না।

এখন যদি অতালিকাভুক্ত কোম্পানি ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির করের ব্যবধান আরো কমিয়ে দেয়া হয় তাহলে আরো আসবে না। কয়েক বছর ধরেই অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের পাশাপাশি ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের মতো নিরাপদ বিনিয়োগ রেখে কেউ ঝুঁকি নিয়ে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে বলে আমার মনে হয় না। সর্বোপরি এবারের বাজেট নিয়ে আমি হতাশ।

পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা এবারের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা বললেও যেভাবে ঢালাওভাবে সব খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তাতে পুঁজিবাজার উপকৃত হবে না বলে মনে করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানান, জমি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্টের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হবে এটি আমাদের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার ফলে এখন আর কেউ ঝুঁকি নিয়ে তিন বছরের জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আসবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here