সিনিয়র রিপোর্টার : আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের হার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। অন্যদিকে সামনের অর্থবছর থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগটি আর থাকছে না। তাই করপোরেট কর ছাড়া এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারের তেমন কিছু নেই বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিদ্যমান করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিদ্যমান কর সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যকার করের ব্যবধান আগের মতোই সাড়ে ৭ শতাংশ থাকছে।

তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ৩৭ শতাংশই বহাল থাকছে। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকেও আগের মতোই সাড়ে ৩৭ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সেলফোন কোম্পানির বিদ্যমান করহার ৪০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। আর অতালিকাভুক্ত সেলফোন কোম্পানির জন্যও বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ করহারে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

বাজেট প্রস্তাবনায় তালিকাভুক্ত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। আর অতালিকাভুক্ত এমএফএস প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে আড়াই শতাংশ কর ছাড় পাবে।

অন্যদিকে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত রাখা, লভ্যাংশ আয়ের ওপর উৎসে কর, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যকার করের ব্যবধান অপরিবর্তিত থাকার কারণে এবারের বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য নতুন কিছু নেই বলে মনে করছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান।

তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য নতুন কিছু নেই। পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করতে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করের ব্যবধান আরো বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।

লভ্যাংশ আয়ের ওপর উৎসে ১০ শতাংশ হারে কর্তিত করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার দাবিটি বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে অন্য খাতের পরিবর্তে শুধু পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হলে তা বাজারকে আরো গতিশীল করত বলে মনে করেন তিনি।

এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল পুঁজিবাজারের বিষয়ে বলেন, সরকার পুঁজিবাজারকে গতিশীল ও উজ্জীবিত করতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। স্টক এক্সচেঞ্জকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্দেশ্যে ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরো কিছু পদক্ষেপ শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজারে ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন চালু করা, আধুনিক পুঁজিবাজারের বিভিন্ন পণ্য যেমন সুকুক, ডেরিভেটিভস ও অপশনসের লেনদেন চালু করা, ওটিসি বুলেটিন বোর্ড চালু করা, ইটিএফ চালু করা, বে-মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত করা ইত্যাদি।

পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, পুঁজিবাজারকে গতিশীল করার লক্ষ্যে এক বছরের লক-ইনসহ বেশকিছু শর্তসাপেক্ষে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১১ জন ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আয়কর পরিশোধ করেছেন। এতে দেশের পুঁজিবাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে এবং পুঁজিবাজার শক্তিশালী হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাবনায় সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহূত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সিমেন্ট, লৌহ ও লৌহজাতীয় পণ্য সরবরাহের বিপরীতে উৎসে কর কর্তনের হার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের কোম্পানিগুলো কিছুটা সুবিধা পাবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহার কমানোর বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শরীফ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমার কারণে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়বে এবং এতে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীরা আগের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পাবেন বলে প্রত্যাশা করছি।

কভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি পূরণে স্থানীয় উৎস থেকে অর্থ আহরণ, সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়কে বিবেচনায় রেখে সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, কভিডের কারণে সরকারের ব্যয় বেড়ে গেছে এবং এতে বাজেট ঘাটতিও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। অন্যদিকে কভিডের প্রভাবে কোম্পানিগুলোর বিক্রয় ও মুনাফা কমে যাওয়ার কারণে সরকারের রাজস্বও কমবে। তা সত্ত্বেও সরকার তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আড়াই শতাংশ কমিয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থ আহরণ করতে হবে। অতিমারীর প্রভাব প্রশমনে সরকারকে সামাজিক সুরক্ষা সহায়তার পরিধিও বাড়াতে হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বাজেট প্রণোদনা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিদেশফেরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের জন্যও বিশেষ রাজস্ব বরাদ্দ কার্যকর প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশ সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় অপক্ষাকৃত কম থাকার কারণে করোনা মহামারীর এ সময়ে সরকারের বড় রাজস্ব ব্যয়ের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানান তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here