এসকোয়ার নিটের আইপিওর অর্থ নিয়ে নয়ছয়

0
318

সিনিয়র রিপোর্টার : বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুঁজিবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করার অনুমোদন পায় এসকোয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড। সংগৃহিত টাকায় ভবন নির্মাণ করবে বলে প্রোসপেক্টাসে প্রকাশ করে।

আইপিও প্রসপেক্টাসের তথ্যানুসারে এসকোয়ার নিট কারখানার জন্য দুটি ৬ তলা ভবন ও ৪ তলাবিশিষ্ট একটি ওয়্যারহাউজ নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছিল। পরে কোম্পানিটি নীতিলঙ্ঘন করে আইপিওর অর্থে ১০ তলা একটি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে।

বস্ত্র খাতের কোম্পানি এসকোয়ার নিট কম্পোজিটের সেই ভবন নির্মাণ করছে পিনাকল কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যেটি এসকোয়ার নিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দুই মেয়ে আয়েশা হাবিব ও তামান্না হাবিবের ৯৫ শতাংশ মালিকানা রয়েছে। তাদের দুজনের প্রতিষ্ঠানটির ১ লাখ করে শেয়ার রয়েছে। যা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ!

আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো- ভবন নির্মাণ শুরুর ১৩ দিন পরে পিনাকল কনস্ট্রাকশন কোম্পানির জন্ম। এসকোয়ার নিটের এই অনিয়ম খুঁজতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

কোম্পানিটির আইপিও অর্থ ব্যয়ে জালিয়াতির তথ্য দৃষ্টিগোচর হলে বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। আইপিওর অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন জালিয়াতির তথ্য চলতি বছরের জুনে কমিশনের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয় বিশেষ নিরীক্ষক।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা চলতি বছরের ৭ অক্টোবর বিএসইসির উপপরিচালক মোল্লাহ মো. মিরাজ-উস-সুন্নাহ, সহকারী পরিচালক মো. বনি ইয়ামিন খান ও তৌহিদ হোসেনের সমন্বয়ে তিন সদ্যসের কমিটি গঠন করেছিল বিএসইসি। কমিটির একজন সদস্য কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ায় তদন্তের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় ৩০ কার্যদিবস শেষে আরো ৩০ সময় চাওয়া হলে কমিশন অনুমোদন দেয়।

পুঁজিবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে এসকোয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ১৫০ কোটি টাকার মধ্যে ১০০ কোটি ৪২ লাখ টাকা ভবন নির্মাণ ও পূর্ত কার্যক্রম, ৪৩ কোটি ১৪ লাখ টাকায় যন্ত্রপাতি আমদানি এবং ৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আইপিও প্রক্রিয়ার ব্যয় নির্বাহে খরচ করার কথা ছিল। তবে এর মধ্যে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেই সেই অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম করে প্রতিষ্ঠানটি।

নিরীক্ষকের তথ্যানুযায়ী, পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই শেল কোম্পানি পিনাকল কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ করে এসকোয়ার নিট।

আইপিওর টাকা হাতে পাওয়ার আগেই ২০১৮ সালের ১৯ মে এসকোয়ার নিট কম্পোজিট পিনাকল কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। কিন্তু তখনো আইনগতভাবে পিনাকল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি গঠিত হয়নি।

দ্য রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসে (আরজেএসসি) পিনাকল কনস্ট্রাকশন নিবন্ধিত হয় ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট, ট্রেড লাইসেন্স পায় একই বছরের ১০ অক্টোবর। পিনাকল কনস্ট্রাকশনের ৯৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক এসকোয়ার নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসানুল হাবিবের দুই মেয়ে আয়েশা হাবিব ও তামান্না হাবিব।

নিরীক্ষকের তথ্যানুযায়ী, অফার ডকুমেন্ট ও অন্যান্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঠিকাদারের কোনো স্বাক্ষর বা ভেন্ডর নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্কোরশিটে কোনো তারিখও ছিল না। এসকোয়ার নিটের সঙ্গে পিনাকলের ভবন নির্মাণ চুক্তিতে পিনাকলের ঠিকানা প্রকাশ করা হয়নি।

ভবন নির্মাণের চুক্তি করার পর পিনাকল সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে শেলটেক ইঞ্জিনিয়ারিং, কেএসআরএম ও ক্রাউন সিমেন্ট কংক্রিট অ্যান্ড বিল্ডিং প্রডাক্টস লিমিটেডের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ ও পূর্তকাজ করিয়েছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ইনভয়েস পিনাকলের পরিবর্তে সরাসরি এসকোয়ার নিটের সঙ্গে করা হয়েছে।

ভবন নির্মানে অর্থ ব্যয়ের বিষয়েও জালিয়াতি করা হয়েছে। দেখা গেছে, ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ভবন নির্মাণ ও পূর্তকাজের বিপরীতে ৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বিল জমা দিয়েছে পিনাকল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে চাহিদার বিপরীতে দ্বিগুণের বেশি অর্থ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ পিনাকলকে ৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে এসকোয়ার নিট।

এ বিষয়ে বিএসইসির কাছে এসকোয়ার নিটের পক্ষ থেকে দেয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে রড, সিমেন্ট ও স্টিলের ক্রমবর্ধমান দামের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য বাড়তি অর্থ প্রদান করা হয়েছে। যদিও গত বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত রড ও সিমেন্টের বিল ছিল ৩৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

নিরীক্ষক তার প্রতিবেদনে আরো জানিয়েছেন, পিনাকলকে অতিরিক্ত ৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এই বিষয়টি প্রমাণ করে এসকোয়ার নিটের করপোরেট সুশাসনের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

 তবে এ বিষয়ে এসকোয়ার নিট কর্তৃপক্ষ কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here