এলএনজির অভাবে উৎপাদনে পিছিয়ে তিন বিদ্যুৎকেন্দ্র

0
566

স্টাফ রিপোর্টার : বেসরকারি খাতের এলএনজিভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে নির্মাণ হচ্ছে। সামিট পাওয়ার, ইউনিক গ্রুপ ও ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপের মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নির্মাণকাজ এরই মধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরেই বিদ্যুৎকেন্দ্র তিনটির উৎপাদনে যাওয়ার কথা।

এলএনজির চলমান সংকট এ মুহূর্তে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির মূল্য কবে স্থিতিশীল পর্যায়ে নামবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না কেউই। বরং তা অদূরভবিষ্যতে আরো প্রকট হয়ে উঠবে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় উঠে এসেছে। সেক্ষেত্রে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সময়মতো উৎপাদন করতে পারা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে এলএনজির সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ ঘাটতি অব্যাহত থাকলে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

তাহলে অন্য অনেকগুলোর মতো সামিট পাওয়ার, ইউনিক ও রিলায়েন্সের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও অলস বসিয়ে রাখতে হতে পারে। যদিও এ সময় চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে সরকারকে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের মাত্রা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

মেঘনাঘাটে সামিট মেঘনাঘাট-২ নামে ৫৮৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে সামিট পাওয়ার। এটি আগামী বছরের মার্চে উৎপাদনে আসার লক্ষ্য রয়েছে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির গ্যাস টারবাইন স্থাপনসহ নানা প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গ্যাস টারবাইন স্থাপন, জেনারেটর, অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রায় শেষের দিকে।

৫৮৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে ইউনিক গ্রুপ। আগামী বছরের নভেম্বরে উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রায় ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার নামের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৬৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটিতে ৪ হাজার ৭৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থায়ন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। আগামী বছরের নভেম্বর নাগাদ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এরই মধ্যে ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রের নকশার কাজ ৮৯ শতাংশ, যন্ত্রাংশ ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম ৭০ শতাংশ ও নির্মাণকাজ ৪৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস টারবাইনও দেশে এসেছে। জেনারেটর আমদানির প্রক্রিয়াও চলছে।

ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল্যাহ আল মাসুদ বলেন, আগামী বছরের নভেম্বর নাগাদ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। প্রতি মাসে ১২-১৩ শতাংশ কাজের অগ্রগতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী তিন-চার মাসের ভেতরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাবে বলেও প্রত্যাশা করা যায়।

এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিপিডিবির সঙ্গে নির্মাণ ও ক্রয় চুক্তি করে ভারতীয় কোম্পানি রিলায়েন্স। আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে রিলায়েন্স মেঘনাঘাট ৭৫০ মেগাওয়াট আইপিপি-২ নামে বিদ্যুকেন্দ্রটির উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এর বাইরে এলএনজিভিত্তিক আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিডিবি। চট্টগ্রামের রাউজানে নির্মাণাধীন এ বিদ্যুকেন্দ্রের সক্ষমতা হবে ৪৫০ মেগাওয়াট। এলএনজিনির্ভর এ বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ উৎপাদনে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন এলএনজির দাম আকাশচুম্বী, ঠিক সে সময় উৎপাদনে আসার জন্য অপেক্ষমাণ এলএনজিভিত্তিক তিনটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এমনিতেই দেশে গ্যাসের সংকট প্রকট হয়ে ওঠায় এখন স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় এ সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠার জোর আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় আগামী বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করা হলে সেগুলোয় গ্যাস সরবরাহ করা যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ করা না গেলেও চুক্তি অনুযায়ী এগুলোর সক্ষমতা বাবদ বিপুল অংকের অর্থ পরিশোধ করতে হবে বিদ্যুৎ বিভাগকে।

যদিও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, উৎপাদনক্ষম হয়ে ওঠা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য যথাসময়ে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। সে উদ্যোগের অংশ হিসেবে গ্যাস আমদানির চুক্তিও করা হয়েছে।

বিদ্যুতের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, আগামীতে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসছে, সেখানে প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন হবে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করতে সরকার এলএনজি আমদানির চুক্তি করছে।

সামিটের সঙ্গেও এলএনজি আমদানিতে যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, সেটি মূলত দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যমান গ্যাসের ঘাটতির বিষয়টি মাথায় রেখেই করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন পরিস্থিতি সহজ নয়। দেশে বিদ্যমান গ্যাসের সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। বিদ্যমান সংকট কাটাতে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির বিকল্প পথ খোলা নেই। অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহের বিদ্যমান অবকাঠামোও সীমিত।

এ অবস্থায় নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে গেলে তা কেবল বিপদই বাড়াবে। গ্যাস যদি আমদানিও করা হয় বিদ্যমান অবকাঠামোয় তা খুব বেশি সুফল দেবে না।

একটি সূত্র জানিয়েছে, এ তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াট। তবে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ পেতে কেন্দ্রগুলোর জন্য দৈনিক ১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। বর্তমানে দৈনিক যে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে সেখানে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংকট রয়েছে। নতুন করে আরো ১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস কীভাবে সরবরাহ পাওয়া যাবে সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা বা জ্বালানি বিভাগ।

আবার গ্যাস সরবরাহ করা না গেলে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে পিডিবি। এরই মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে সক্ষমতার চার্জ বাবদ ৭০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গ্যাস সংকটে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো না গেলে এ বোঝা কেবলই বাড়বে।

পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পিডিবি যে সময়সীমা অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ে চুক্তি করেছে, সে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ নেয়া শুরু করবে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহে আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও চলছে।

দেশে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গত দুই মাসে তিনটি দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। গত ১৬ জুন ভারতের সঙ্গে এলএনজি আমদানি করতে এইচ-এনার্জির সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। এরপর গত ১৩ জুলাই এলএনজি আমদানিতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে বাংলাদেশ।

এলএনজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কমনওয়েলথ এলএনজির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) সই করেছে সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি। বছরে ১০ লাখ টন এলএনজি আমদানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এ সমঝোতা চুক্তি হয়।

জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, আগামী ২০২২-২৩ সালে গ্যাসভিত্তিক যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাবে, সেগুলোর জ্বালানি নিশ্চিত করতে মূলত এলএনজি সমঝোতা চুক্তি করা হচ্ছে। এসব দেশ থেকে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here