এপ্রিলের মধ্যে অর্থছাড়ের পরিকল্পনা

0
322

স্টাফ রিপোর্টার : করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করছে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী সংগঠন। এপ্রিলের মধ্যে অর্থছাড়ের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন সংশ্নিষ্টরা, যাতে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় মে মাসের বেতন পেতে পারেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত প্যাকেজের আওতায় টাকা দ্রুত ছাড় করা, কারা পাবেন এবং কোন পদ্ধতিতে দেওয়া হবে তা নিয়ে কাজ করছেন সংশ্নিষ্টরা। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ অন্যান্য রপ্তানিমুখী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে রূপরেখা চূড়ান্তের পর অর্থছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারি নীতিনির্ধারক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাসের সংকটময় পরিস্থিতি কাটাতে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এ অর্থ শুধু কর্মী ও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ করার নির্দেশনা দেন তিনি। এখন এ অর্থ কীভাবে সুবিধাভোগীদের দেওয়া হবে সে বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে শ্রম সচিব আলী আযম বলেন, কোন প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এতে সরকার কী দেবে, পোশাক মালিকরা কতটুকু পাবেন- তা ফয়সালা করতে হবে। এ নিয়ে সরকার কাজ করছে এবং খুব শিগগির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রতি বছর বাজেটে প্রণোদনা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্যাকেজ এর বাইরে। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাড়তি সুবিধা হিসেবে এ অর্থ দেওয়া হবে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম পারভেজ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। তবে প্রণোদনার অর্থ যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ জন্য স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে পোশাক ও বস্ত্র খাতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি। ফলে এ খাতকে বাঁচাতে হবে। তবে বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল না হলে বাংলাদেশেও স্থিতিশীলতা আসবে না। ফলে আগামীতে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা যথাসময়ে টাকা ছাড় করার তাগাদা দিয়েছেন। তারা বলেন, কারা অর্থ পাওয়ার যোগ্য তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে যাতে অনিয়ম না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক উল্লেখ করে তারা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে প্রণোদনার অর্থের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। তবে অন্যান্য দেশের মতো পরিস্থিতি ভয়াবহ হলে তখন আরও ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে সরকারকে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতারা বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকায় যেভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়েছে তাতে অন্তত তিন মাসের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। ফলে আগামীতে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য প্রণোদনার পাশাপাশি নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। মোট রপ্তানির ৫৩ শতাংশ আসে ইউরোপের জোটভুক্ত দেশ থেকে। অন্যদিকে একক দেশ হিসেবে ৪১ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাকিটা অন্যসব দেশ থেকে। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। যে কারণে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক শিল্প হুমকির মুখে।

বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ সূত্রে জানা গেছে, প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর এর সুবিধা পাওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে তারাও কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে একটি ছক তৈরি করা হচ্ছে। এতে কারখানার নাম, জনবল, মাসিক বেতন, আগের ট্র্যাক রেকর্ডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করা হবে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে সংগঠন দুটির সাবেক সভাপতিরা শিগগির বৈঠক করবেন। এরপর রূপরেখা চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।

বর্তমানে পোশাক খাতে ওভেন ও নিট মিলে মোট দুই হাজার ৭৮০ কারখানা চালু আছে। এর মধ্যে ওভেন দুই হাজার ৮০টি এবং নিট ৭০০টি। এসব কারখানায় প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন, যাদের মোট মাসিক বেতন চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এক মাসের পূর্ণ বেতনের দাবি করেছে। এ পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শ্রমিকদের মাসিক পে-রোলের (বেতন) ভিত্তিতে টাকা দেওয়া হবে। তবে এতে সরকারের অংশ কত হবে, মালিক পক্ষের কত থাকবে কিংবা পুরোটাই দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে রূপরেখা তৈরি হবে। কিসের ভিত্তিতে অর্থ দেওয়া হবে তা নিয়ে কাজ করা হবে। উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এটি ঠিক করা হবে। তারপর অর্থছাড় করা হবে। তিনি বলেন, শুধু চালু রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ সুবিধার আওতায় আসবে। বন্ধ কিংবা রুগ্‌ণ শিল্প প্যাকেজের আওতায় আসবে না।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পিআরআইএর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে আরও ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। তার মতে, করোনার কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের দিকে বেশি নজর দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ যথাসময়ে কার্যকর করা জরুরি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মজুরির ভিত্তি ধরে আংশিক বা পুরোটাই দেওয়া যেতে পারে। তবে পরে প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো হলে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সমন্বয়ের অপশন রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে পুরো টাকা এককালীন অনুদান হিসেবে দিতে পারে সরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here