ঋণ খেলাপিতে আমান ফিড

0
226

স্টাফ রিপোর্টার : আমান ফিড লিমিটেডের ব্যবসায়িক স্থায়ীত্ব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ইতোমধ্যে কোম্পানিটি ঋণ খেলাপি হওয়ায় কাঁচামাল আমদানি করতে পারছে না। স্থানীয় উৎস থেকে উচ্চ মূল্যে কাঁচামাল কেনায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। যে কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে ‘প্রডাকশন লস’ দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে কোম্পানিটি।

সম্প্রতি আমান ফিডের প্রধান কার্যালয় ও কারখানা প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে নানা ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছে ডিএসই। ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। ব্যাংক ঋণ বেড়ে হয়েছে ৩৫০ কোটি টাকা এবং উৎপাদন খরচ বাড়ায় শেয়ারবাজারে বিবিধ খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির টিকে থাকা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে সেই প্রভাব পড়েছে তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি -মার্চ’২১) প্রকাশিত চিত্রে। তৃতীয় প্রান্তিকে  কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪৫ পয়সা। গত অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ৬১ পয়সা।

এসব অসঙ্গতি প্রতিবেদন আকারে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) পাঠিয়েছে ডিএসই।

পরিদর্শন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ডিএসই উল্লেখ করেছে, কোম্পানি থেকে প্রস্তুতকৃত আর্থিক প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য প্রদান করা হয়েছে। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ও বোর্ডের সদস্যরা আর্থিক ও অ-আর্থিক তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে উদাসীন। আর্থিক প্রতিবেদনে পক্ষপাতদুষ্ট ও অসত্য তথ্য রয়েছে।

আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নথিপত্রের ঘটতি রয়েছে। সেই হিসেবে পরিদর্শন দল মনে করে, আমান ফিডের ম্যানেজমেন্ট ব্যবসা পরিচালনায় অযোগ্য। তাদের ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করতে রাজি নয়।

পরিদর্শনকালে কোম্পানিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনোভাব ছিল ধোঁয়াটে এবং অব্যবসায়িক। তারা পরিদর্শক দলকে কোম্পানির প্রকৃত অবস্থার কোনো প্রকার তথ্য না দেয়ার যথাসম্ভাব্য চেষ্টা করেন।

এছাড়া, পরিদর্শক দল জানিয়েছে, কোম্পানির অধিক পরিমাণ ব্যাংক ঋণের বোঝা রয়েছে। ইতোমধ্যে কোম্পানিটিকে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে তারা কাঁচামাল আমদানি করতে পারে না।

তারা স্থানীয় উৎস থেকে উচ্চ মূল্যে কাঁচামাল ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ তাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় বাড়ছে। যা তাদের ব্যবসায়িক স্থায়ীত্বকে পতনমুখী করে তুলতে পারে। আর কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে আমান ফিডের ঋণ ছিল ৯০ কোটি। কিন্তু ২০২১ সালে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০ কোটি টাকায়।

শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ ছিল ৭২ কোটি টাকা। আইপিও তহবিল ও ঋণ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোম্পানিটি কোথায় ব্যবহার করেছে- পরিদর্শক দলের এমন প্রশ্নের উত্তরে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কোম্পানি অর্থিক প্রতিবেদনে অতিরঞ্জিতভাবে ক্রয় বিবরণী তৈরি করেছে। কোম্পানিটির ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের জন্য ভ্যাট রিটার্ন অনুযায়ী ক্রয় ছিল ৪৪৩.৯৪ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের ১০৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ৫২০.৬৮ কোটি টাকা (কাঁচামাল ৪৯৯.৭৪ কোটি টাকা এবং প্যাকেজিং উপকরণ ২০.৯৪ কোটি টাকা) ক্রয় ছিল বলে উল্লেখ করেছে। ফলে কোম্পানিটি ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে ক্রয় বাবদ ৭৬.৭৪ কোটি টাকা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে।

এদিকে, কোম্পানিটির ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের জন্য ভ্যাট রিটার্ন অনুযায়ী ক্রয় ছিল ৪৭২.৫৪ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের ১০৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ৬৬৬.২০ কোটি টাকা (কাঁচামাল ৬৩৭.৯২ কোটি টাকা এবং প্যাকেজিং উপকরণ ২৮.২৭ কোটি টাকা) ক্রয় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

ফলে কোম্পানিটি ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে ক্রয় বাবদ ১৯৩.৬৬ কোটি টাকা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে। এর ফলে ২০২০ ও ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিট আয় ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কম দেখিয়েছে।

একইভাবে বিল্ডিং এবং সিভিল কনস্ট্রাকশনে অতিরিক্ত খরচ হিসেবে কোম্পানি থেকে প্রদত্ত ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অবস্থিত বিল্ডিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের খরচ হিসাবে ১০০.১৯ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।

নুলিপাড়ায় কারখানা পরিদর্শনকালে পরিদর্শক দল একটি পাঁচতলা ভবন, একটি পাওয়ার সাবস্টেশন, চারটি আধা পাকা উৎপাদন ইউনিট এবং ১২টি টিনশেড গুদাম (যার অধিকাংশই আমান সিমেন্ট মিলস থেকে ভাড়ার ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে) দেখতে পায়।

এছাড়া, প্রধান কার্যালয় পরিদর্শনকালে পরিদর্শক দল দেখতে পায়, আমান ফিড তাদের প্রধান কার্যালয় একটি ভাড়া অফিস নিয়ে পরিচালনা করছে। তবে বিল্ডিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের এই খরচ যাচাই করার জন্য কোম্পানিটি পরিদর্শক দলের কাছে প্রয়োজনীয় নথি ও ব্যাংক বিবরণী দিতে পারেনি। ফলে বিল্ডিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের খরচ হিসাবে দেখানো ১০০.১৯ কোটি টাকা বস্তুগতভাবে অতিরিক্ত বলে মনে হয়। এতে কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

বিক্রয় অতিমূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিদর্শক দলকে কোম্পানি ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের পৃথক গ্রাহক-ভিত্তিক তথ্য ও প্রাসঙ্গিক ব্যাংকের বিবরণী প্রদান করেনি। ফলে ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে বিক্রয় বাবদ উল্লিখিত ৬৫০.২০ কোটি টাকার সত্যতা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

পরিদর্শক দল মনে করে, আলোচ্য সময়ে বিক্রয় অতিমূল্যায় বা অবমূল্যায়ন করা সম্ভাবনা বেশি রয়েছে কোম্পানিটির। কোম্পানিটি বিক্রয়ের প্রাসঙ্গিক নথিপত্র দেয়ার ক্ষেত্রেও আইন লঙ্ঘন করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here