ইকোনো কামালের কোম্পানির সংকট আরো ঘনীভূত, লোকসান বাড়ল

0
609

শাহীনুর ইসলাম : বিএনপি থেকে পদত্যাগী নেতা ‘ইকোনো কামাল’ বা সালিমুল হক কামালের কোম্পানি জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের লোকসান আরো বেড়েছে। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার সঙ্গে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার তিনিও আসামি।

১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু হওয়া কোম্পানিটির সরকার পরিবর্তনের কারণে ২০১২ সালের পর থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এরপরে কমতে থাকে মুনাফা। পরিচালন লোকসান কাটাতে না পেরে এখন শেয়ার ব্যবসার মাধ্যমেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে জিকিউ বলপেন ইন্ডাস্ট্রিজের কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানির লোকসান আরো বেড়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৮১ পয়সা, আগের বছর একই সময়ে যে লোকসান ছিল ৫৬ পয়সা।

চলতি হিসাববছরের প্রথম দুই প্রান্তিক তথা ৬ মাসে কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ১ টাকা ৪৯ পয়সা। আগের বছর একই সময়ে লোকসান ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা।

দুই প্রান্তিক মিলিয়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি ক্যাশ ফ্লো ছিল মাইনাস ২ টাকা ১৬ পয়সা এবং আগের বছর একই সময়ে ক্যাশ ফ্লো ছিল মাইনাস ১ টাকা ৫৩ পয়সা। গত ৩০ জুন, ২০২০ তারিখে শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) হয়েছে ১৪০ টাকা ৮৯ পয়সা।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১২ সালে কোম্পানিটি পণ্য বিক্রি থেকে আয় করে প্রায় ২১ কোটি টাকা। পরের বছর আয় নেমে যায় ১৬ কোটি টাকায়। ২০১৪ সালে পণ্য বিক্রি থেকে আয় সামান্য বাড়লেও পরের বছর থেকে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে কোম্পানিটি।

২০১৬-১৭ হিসাব বছরে পণ্য বলপেন বিক্রি নেমে আসে ১০ কোটি ৭৪ লাখ টাকায়। আর সর্বশেষ ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে বিক্রি নেমে আসে ৭ কোটি ৯২ লাখ টাকায়। ধারাবাহিকভাবে পণ্য বিক্রি কমে যাওয়ায় কোম্পানিটি পরিচালন লোকসানের মধ্যে পড়ে।

অবশেষে টিকে থাকতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে। সেই আয়ই হয়ে ওঠে কোম্পানির মুনাফার প্রধান উৎস। এর বাইরে ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত থেকে সুদ বাবদ কিছু আয় আসে বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়।

দেশের বাজারে বলপেন উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৩০ বছর ভালো ব্যবসা করলেও ২০১২ সালের পর থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জে মার্কেট শেয়ার হারাতে শুরু করে কোম্পানিটি।

২০১৬-১৭ হিসাব বছরে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি ভালো থাকায় বিনিয়োগ করা সিকিউরিটিজের অনিরূপিত মুনাফা বাড়ে ৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আর শেয়ার কেনাবেচা থেকে কোম্পানির মুনাফা হয় ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর বাইরে ধারণকৃত শেয়ারের বিপরীতে নগদ লভ্যাংশ হিসেবে ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা আয় আসে।

স্থায়ী আমানত থেকে সুদ বাবদ আয় হয় ৪৯ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এ সময় অপরিচালন আয় হয় ৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে কোম্পানির পণ্য বিক্রি থেকে আয় হয় ১০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর পণ্য উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের পর কোম্পানির পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬ লাখ টাকায়।

তবে পুঁজিবাজার থেকে আসা আয়ের কারণে কোম্পানিটি ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা নিট মুনাফায় থাকে। তবে ২০১৭-১৮ হিসাব বছর পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নেতিবাচক থাকায় লোকসানে পড়ে।

পুঁজিবাজার থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না আসায় পরিচালন লোকসান সামাল দিতে পারেনি কোম্পানিটি। এ সময় স্থায়ী আমানত থেকে প্রাপ্ত সুদ, ধারণ করা সিকিউরিটজ থেকে প্রাপ্ত নগদ লভ্যাংশ ও শেয়ার কেনাবেচা থেকে আয় হয় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৭০ শতাংশ কম। আর কোম্পানির পণ্য বিক্রি থেকে আয় আরও কমে যাওয়ায় পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৫ কোটি ৬২ লাখ টাকায়। ফলে ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে কোম্পানির নিট লোকসান দাঁড়ায় ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকায়।

২০১৭-১৮ হিসাব বছরে পুঁজিবাজারে কোম্পানির বিনিয়োগ করা বিভিন্ন সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এতে অনিরূপিত মুনাফা কমে ৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। পুঁজিবাজার থেকে আয় কমে যাওয়ায় ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকেও ৬৪ লাখ টাকার নিট লোকসানে পড়ে জিকিউ বলপেন।

২০১৬ সালে কোম্পানিটি ব্যবসা বহুমুখীকরণের উদ্যোগ হিসেবে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী উৎপাদনের ইউনিট স্থাপন করে। তবে পরের বছর ইউনিটটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এছাড়া জিকিউ গ্রুপের ছয় কোম্পানিতে ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও এ বিনিয়োগ থেকেও কোম্পানির তেমন কোনো মুনাফা আসছে না।

উল্লেখ্য, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজী সালিমুল হক কামালও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামি। ১৯৯৪ সালে বিএনপি থেকে মাগুরা-২ আসনের বহুল আলোচিত উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত এবং মাগুরা জেলা বিএনপির সভাপতি হন তিনি।

আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট পদত্যাগ করেন কাজী সালিমুল হক কামাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here