অর্থমন্ত্রীর চিঠি নিয়ে বিতর্ক, বেস্ট হোল্ডিংসের আইপিও নিয়ে প্রশ্ন

0
1094

ওই চিঠিকে অবলম্বন করেই নিয়ম এড়িয়ে সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডিরেক্ট লিস্টিং) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে এসে ২৮৩ কোটি টাকা তোলার আবেদন করেছিল ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল লো মেরিডিয়ানের পরিচালনাকারী কোম্পানি বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পর্ষদ সভায় বৃহস্পতিবার তাদের ওই আবেদন নিয়ে আলোচনা হওয়ারও কথা থাকলেও সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ এবং বেস্ট হোল্ডিংসের যোগ্যতা নিয়ে কয়েকটি আইনি প্রশ্ন তুলে সেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চায় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

পাশাপাশি এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বেস্ট হোল্ডিংসের তালিকাভুক্তির সকল কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়ে ডিএসইতে চিঠি দেন বিএসইসির উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।

বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিতর্ক তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের দপ্তর থেকে চিঠি পাঠিয়ে ৮ সেপ্টেম্বরের সেই সুপারিশের চিঠির কার্যকারিতা স্থগিত রাখতে বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানকে ওই চিঠি পাঠানোর বিষয়টি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিব ফেরদৌস আলম।

চিঠিতে বিষয়ের জায়গায় লেখা হয়েছে- ‘অবকাঠামোগত প্রকল্প অর্থায়নে সরকারি ও বেসরকারি তফসিলী ব্যাংকের গৃহীত ইক্যুইটি এক্সপোজারে তারল্য সৃষ্টি এবং ঝুঁকি হ্রাসের উদ্দেশ্যে প্রকল্প সংশ্লিষ্ঠ কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি’ প্রসঙ্গে।

আর নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, “মাননীয় অর্থমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে জানানো যাচ্ছে যে, বিগত ০৮/০৯/২০২০ তারিখে এ সংক্রান্তে প্রেরিত পত্রের বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম গ্রহণ না করার অনুরোধ করা হলে।”

অর্থমন্ত্রীর নামে, তার স্বাক্ষরে গত সেপ্টেম্বরে বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো ওই চিঠিতে অবকাঠামো প্রকল্প বা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে ডিরেক্ট লিস্টিং রুলস শিথিল করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি শেয়ারের দাম নির্ধারণের নিয়মেও ছাড় দিতে বলা হয়।

হসপিটালিটি ছাড়াও কৃষি ও নির্মাণ ব্যবসায় থাকা বেস্ট হোল্ডিংস ওই সুপারিশের সুবিধা নিয়ে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য ‘বিশেষ অনুমতি’ চেয়ে গত ১২ নভেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে আবেদন করে। এ প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাজার থেকে ২৩৮ কোটি ৬ লাখ ২৫ হাজার ৭৭ টাকা তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয় সেই আবেদনে।

বেস্ট হোল্ডিংসের ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে রয়েছে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের কোম্পানি রেইস পোর্টফোলিও অ্যান্ড ইস্যু ম্যানেজমেন্ট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।

ডিএসইর পর্ষদ সভায় বেস্ট হোল্ডিংসের ওই আবেদন নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলে সক্রিয় হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

গত মঙ্গলবার বিএসইসির উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কয়েকটি আইনি বিষয়ে ডিএসইর ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি বেস্ট হোল্ডিংসের তালিকাভুক্তির কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বলা হয়।

ডিরেক্ট লিস্টিং হল সেই পদ্ধতি, যেখানে একটি কোম্পানি তাদের পেইড-আপ ক্যাপিটাল না বাড়িয়ে এবং নতুন শেয়ার ইস্যু না করে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। এ নিয়মে ওই কোম্পানিকে তাদের হাতে থাকা শেয়ার পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার সুযোগ দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে বিএসইসির জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়, দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়মে পুঁজিবাজারে আসার সুযোগ দিতে পারবে না। কেবল সরকারি কোম্পানি বা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানই সরাসরি তালিকাভুক্তির যোগ্য বিবেচিত হবে।

বেস্ট হোল্ডিংস তাদের মালিকানার ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানায় থাকার পরও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চেয়ে আবেদন করে।

বেস্ট হোল্ডিংসের ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের হাতে। এটাকেই যুক্তি হিসেবে দেখিয়ে তারা সরাসরি তালিকাভুক্তির ওই বিশেষ অনুমতি দাবি করে।

বেস্ট হোল্ডিংসের কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, তাদের ৫২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশের মালিকানা রয়েছে ব্যক্তি এবং কিছু প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির হাতে। আর বাকি ৪৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক প্লেসমেন্ট শেয়ার হোল্ডাররা।

আবার তার মধ্যে ২৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ মালিকানা রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের হাতে। এর মধ্যে সোনালী ও জনতা ব্যাংকের কাছে রয়েছে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ করে। অগ্রণী ব্যাংকের কাছে ৬ দশমিক ৬২ এবং রূপালী ব্যাংকের কাছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ মলিকানা রয়েছে।

এ অবস্থায় বেস্ট হোল্ডিংসকে ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়ার জন্য ওই কোম্পানিতে প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের বিনিয়োগকে ‘সরকারি মালিকানা’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ আদৌ আছে কি না সেই ব্যাখ্যা ডিএসইর কাছে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিএসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, বেস্ট হোল্ডিংস ২০১৯ সালের অগাস্ট মাসে থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে মোট ৬৬২ দশমিক ২ কোটি টাকা তুলেছে।

কিন্তু ডিরেক্ট লিস্টং রেগুলেশনস অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি সর্বশেষ দুই বছরের মধ্যে এভাবে তহবিল সংগ্রহ করে থাকলে বা সিকিউরিটিজ ইস্যু করে থাকলে সেই কোম্পানি সরাসরি নিবন্ধিত হওয়ার যোগ্য বিবেচিত হতে পারে না।

এই অযোগ্যতার বিষয়টি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কীভাবে বিবেচনা করছে, সেই ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চিঠিতে।

বিএসইসি বলেছে, ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বেস্ট হোল্ডিংসের নিট চলতি সম্পদের মানও ঋণাত্মক, যা ডিরেক্ট লিস্টিং সংশ্লিষ্ট নিয়মের পরিপন্থি।

এছাড়া বেস্ট হোল্ডিংস ৪ কোটি ৩৫ লাখ শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়তে চায়, যা তাদের মোট ৮৭ কোটি শেয়ারের মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে হলে আইন অনুযায়ী অন্তত ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হয়। এসব বিষয়েও ডিএসই কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএসইসি।

আর অর্থমন্ত্রীর নামে পাঠানো যে চিঠির ভিত্তিতে বেস্ট হোল্ডিংস ওই সুবিধা দাবি করছে, সেই চিঠির সত্যতা ডিএসই কীভাবে যাচাই করেছে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে পাঠানো নিয়ন্ত্রক সংস্থার চিঠিতে।

বেসরকারি খাতের কোম্পানির সরাসরি তালিকাভুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বেস্ট হোল্ডিংস যেভাবে তা পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানিটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা আইনের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন।”

আর ডিএসইর সাবেক একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “এটা একটা বিরাট জোচ্চুরি হতে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এখনই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here