অর্থনীতির সর্বোচ্চ লক্ষ্য হলেও নেই উন্নত মহাসড়ক

0
137

ডেস্ক রিপোর্ট : ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।এজন্য প্রণয়ন করা হয়েছে ২০ বছর মেয়াদি ‘দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১): রূপকল্প ২০৪১’।লক্ষ্য, ২০৪১ সালে ৯ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার, দারিদ্র্যের হার নেমে আসবে ৫ শতাংশে।

কিন্তু অর্থনীতির এসব লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ হচ্ছে না সড়ক-মহাসড়ক। পরিকল্পনার ভুলে আর অদূরদর্শিতায় সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো।

উন্নত অর্থনীতির পথে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন যে হারে বাড়বে তার জন্য প্রয়োজন হবে ছয় থেকে আট লেনের মহাসড়ক। অথচ বাংলাদেশ এখনো চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, এসব নির্মিত মহাসড়কের মানও ভালো নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সড়ক বাংলাদেশে।

উন্নয়নশীল থেকে উন্নত হওয়ার পথে থাকা অন্য দেশগুলো সড়ক অবকাঠামোয় যেভাবে এগিয়ে, সে তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের যোগাযোগ অবকাঠামো সূচকে সিঙ্গাপুরের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। একই সূচকে মালয়েশিয়ার অবস্থান ৩৩, থাইল্যান্ড ৪১ এবং  দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ আছে ৭২ নম্বরে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাও বাংলাদেশের উপরে আছে। সূচকে ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দেশ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে সমন্বিতভাবে। তারা আধুনিক রেল যোগাযোগ যেমন গড়ে তুলেছে, তেমনি নৌপথকেও কাজে লাগিয়েছে।

প্রশস্ত রাস্তা বানিয়ে সড়ক যোগাযোগও নির্ভরযোগ্য অবস্থানে নিয়েছে। একইভাবে তারা আকাশপথকেও কাজে লাগিয়েছে।

উন্নত দেশগুলো তাদের যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলেছে ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব করে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। উন্নত দেশগুলো প্রশস্ত, মজবুত ও সুশৃঙ্খল রাস্তা গড়ে তুলেছে। আর আমরা কেবল গড়ে তুলছি চার লেনের রাস্তা।

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে পণ্য পরিবহন প্রধানত সড়কনির্ভর। অথচ সেই সড়কেই লেগে থাকে যানজট ও ধীরগতি। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, প্রশাসনিক দুর্বলতায় বিঘ্নিত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। বাড়ছে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও।

গত নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘মুভিং ফরোয়ার্ড: কানেক্টিভিটি অ্যান্ড লজিস্টিকস টু সাসটেইন বাংলাদেশিজ সাকসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এতে  বলা হয়েছে, যানজটের কারণে একটি ট্রাক গড়ে চলতে পারছে ঘণ্টায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার। একটি পণ্যের যে দাম, তার সাড়ে ৪ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে শুধু পরিবহন খরচে।

বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সড়ক বানালেও সেগুলো টেকসই হচ্ছে না। কখনো চালুর আগে আবার কখনো চালুর এক বছরের মধ্যেই ভাঙাচোরা দশায় চলে যাচ্ছে এসব সড়ক-মহাসড়ক।

গত মাসে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ‘মহাসড়কের লাইফ টাইম: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজন করেছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সেমিনারে সড়ক টেকসই করার জন্য ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজের গুণগত মান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি নিষ্কাশন—এই চারটি চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের যে পেভমেন্ট (পিচ) ডিজাইন গাইডলাইন আছে, তাতে পেভমেন্টের ভার বহনক্ষমতা রাখা হয়েছে এক্সেলপ্রতি (প্রতি জোড়া চাকা) ৮ দশমিক ২ টন। আন্তর্জাতিকভাবেও এটি স্বীকৃত মানদণ্ড। তবে নির্মাণকাজের মান খারাপ হওয়ায় দেশের রাস্তার ভার বহনক্ষমতা তুলনামূলক কম। এসব রাস্তায় দুই এক্সেলের ট্রাক ১৬ টন ওজন নিয়ে চললে মোটামুটি টেকসই হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার পরিবহন মালিকদের চাপে দুই এক্সেলের ট্রাককে ২২ টন ওজন নিয়ে চলার অনুমতি দিয়ে রেখেছে। বাস্তবে এর চেয়েও বেশি ওজন নিয়ে চলছে এসব ট্রাক।

বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির হিসাবে সারা দেশে চলাচলরত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রেইলারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এরমধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই দুই এক্সেলের ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান। ২২ টনের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে এসব ট্রাক মালামাল পরিবহন করে আরো বেশি। ফলে যে রাস্তা ২০ বছর ভালো থাকার কথা, সেটি এক বছরও থাকছে না। ওভারলোডিংয়ের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক বছরের মধ্যে নিতে হয়েছে সংস্কার প্রকল্প। চালু হওয়ার আগেই দেবে যাচ্ছে নির্মাণাধীন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক।

দুই এক্সেলের মাঝারি ট্রাক সাড়ে ১৫ টন ভার বহনের উপযোগী করে তৈরি করে প্রস্তুতকারকরা। বেশির ভাগ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের বডি দেশেই বানানো হয়। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, এই বডি বানানোর সময়ই সবচেয়ে বড় অনিয়ম হচ্ছে। সাড়ে ১৫ টন ভার বহনের ক্ষমতার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ঢাউস বডি বানানো হচ্ছে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত ওজন রাস্তার চূড়ান্ত ক্ষতি করে। এটা জানার পরও বিআরটিএ বছর বছর এসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানকে ফিটনেস সনদ দিয়ে যাচ্ছে। সরকারও রাস্তায় ২২ টন ওজন নিয়ে এসব গাড়িকে চালানোর অনুমতি দিয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশই কিন্তু এটা অনুমোদন দেয়নি। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, পাকিস্তানেও ১৬ টনের বেশি ওজনের গাড়ি রাস্তায় চলতে দেয়া হয় না। কিন্তু আমরা দিচ্ছি। ছোট ছোট ট্রাকের বদলে বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহারের কথা বলছেন তিনি।

তবে পরিবহন মালিকরা বলছেন, রাতারাতি দেশের বিদ্যমান দুই এক্সেলের ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানগুলোকে বদলে ফেলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি বড় বড় ট্রাক কিংবা ট্রেইলার চালানোর উপযোগী রাস্তাও আমাদের দেশে কম। একইভাবে মাঝারি ট্রাকের বদলে বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহার করলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিরও আশঙ্কা করছেন তারা।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ব্যবহারের বড় সমস্যা, সেগুলোকে সব রাস্তায় চালানো যায় না। মোড়ে ঘুরতে সমস্যা হয়। হাইওয়ে থেকে ছোট রাস্তায় যেতেও সমস্যা হয়। আবার আমাদের এখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাদের বড় ট্রাক বা ট্রেইলার ভাড়া নেয়ার মতো পণ্য থাকে না। এটাও একটা সমস্যা। তবে ওভারলোড নিয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা সেটাই মেনে নেব।

ওভারলোডের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সঠিক ও আধুনিক নকশা প্রণয়ন, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি তারা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে। যদিও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে না।২০১৯-২০ অর্থবছর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ খাতে চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, অতিরিক্ত ওজন আমাদের জন্য একটা বড় সমস্যা। এর জন্য আমাদের সড়কগুলো টেকসই হচ্ছে না। এজন্য আমরা কিছু কারিগরি পরিবর্তনের কথা ভাবছি। আমরা একটা নীতিমালা করতে চাই, যার আলোকে গাড়ি আমদানি ও নিবন্ধন করা হবে। এটা নিয়ে আমরা যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করব। পাশাপাশি আমাদের সড়কের মান বাড়ানোর লক্ষ্যেও আমরা কাজ করব।

ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের জন্য সারা দেশে অনেকগুলো ওজন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র বানানো হচ্ছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে ওভারলোডিং অনেকটাই কমে আসবে বলে মত দেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here