অনিশ্চয়তার ভেতরে রিং শাইন টেক্সটাইল!

0
2082

ডেস্ক রিপোর্ট : মাত্র দেড় মাসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে বস্ত্র খাতের কোম্পানি রিং শাইন টেক্সটাইল। এর মধ্যেই কোম্পানিটি মূল মালিকপক্ষ (বিদেশি নাগরিক) বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তারা আর বাংলাদেশে ফিরবেন না এবং ব্যবসা চালাবেন না।

বিষয়টি কোম্পানিটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখার প্রধান শাহেদ সেকান্দারকে। এ তথ্য জেনে শাহেদ সেকান্দার আবার তার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন। খবর বিশ্বস্ত সূত্রের।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাহেদ সেকান্দার চিঠিতে উল্লেখ করেন, কোম্পানিটি শেয়ারবাজার থেকে আইপিওর টাকা তুলেছে, তা ব্র্যাক ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে জমা আছে। আবার ব্র্যাক ব্যাংক থেকে এ কোম্পানি ঋণও নিয়েছে। এ অবস্থায় আইপিওর টাকা সরিয়ে নিলে ঋণের অর্থ আদায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। এ অবস্থায় আইপিওর এ টাকা হস্তান্তরে সতর্কতা অবলম্বন করতে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ খেলাপিদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। ওই তালিকায় রিং শাইন টেক্সটাইলের নামও আছে। তালিকা অনুযায়ী কোম্পানিটির খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ ৪২ কোটি টাকা।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অনিয়ম করে এ কোম্পানিটি আইপিওর অনুমোদন নিয়েছে। আইপিওর আগে শত শত কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করেছে। এসব কারণে শেয়ারবাজারে এ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন শুরুর পরপরই ধস নামে। এ কারণে শেয়ারহোল্ডারদের রোষানলে পড়ার ভয় থেকে মালিকপক্ষ পালিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের চাকরি ও বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় আছেন।

কোম্পানির মালিকপক্ষের পালিয়ে যাওয়ার খবরটি জেনে বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। তারা দ্বারস্থ হচ্ছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। এ বিষয়ে জানতে বিএসইসির কাছে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।

ঢাকা ইপিজেডের রপ্তানিমুখী এ কোম্পানিটির কাছে দেশীয় সাত ব্যাংক এবং বিদেশি একটি ব্যাংকের মোট ঋণ পাওনা প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি থেকে অনুমোদন পেয়ে কোম্পানিটি গত সেপ্টেম্বর আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭৫ কোটি টাকাসহ মোট দেড়শ’ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের কথা ছিল। কোম্পানিটির আইপিও প্রসপেক্টাসেও এ তথ্য উল্লেখ আছে।

কোম্পানিটির কাছে ব্র্যাক ব্যাংকেরও ঋণ আছে। মূল মালিকরা সটকে পড়ার খবরে ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখার প্রধান শাহেদ সেকান্দার রিং শাইনের সিএফও সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। সিএফওর কাছ থেকে মালিকদের দেশ ছাড়ার সত্যতা জানতে পেরে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডিকে চিঠি লেখেন তিনি।

চিঠিতে শাহেদ সেকান্দার উল্লেখ করেন, সাইফুল ইসলাম তাকে বলেছেন, কোম্পানির মূল ব্যক্তি এবং এমডি সুং ওয়ে মিন এখন দেশের বাইরে আছেন এবং তিনি (এমডি) আর বাংলাদেশে ফিরবেন না। কোম্পানির ব্যবসা অর্থাৎ কারখানা চালাতে পারবেন না। বর্তমানে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা সম্ভবত কোম্পানি চালাতে পারবেন না, কারণ তাদের কারোরই কোনো চেক বা প্রয়োজনীয় নথিতে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা নেই।

ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখার প্রধান আরও লিখেছেন, এ অবস্থায় পাওনা পরিশোধ করার মতো কেউ না থাকায় কোম্পানিটির কাছে ব্র্যাকের ঋণ মন্দ ঋণে পরিণত হবে। কোম্পানির আইপিও টাকা অস্বাভাবিক লেনদেনে সরে গেলে ব্র্যাক তার অর্থ আদায়ে সমস্যায় পড়বে। এ জন্য আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

ব্র্যাক ব্যাংকের এই চিঠির আগে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক ব্যাংক উরি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) চিঠি দিয়ে তার ঋণের অর্থ ফেরত পেতে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানায়।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটি তার চিঠিতে জানায়, আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ারবাজার থেকে কোম্পানিটি দেড়শ’ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহের আবেদন জানিয়েছিল, উত্তোলিত মূলধন থেকে উরি ব্যাংকের ২২ কোটি টাকাসহ মোট ৫০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করবে। এরই মধ্যে কোম্পানিটি ঋণ পরিশোধে ৫০ কোটি টাকা তুলে নিলেও উরি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেনি।

সূত্র জানিয়েছে, উরি ব্যাংকের চিঠি পাওয়ার পরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এক চিঠিতে কোম্পানির সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ করার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাবগুলো ফ্রিজ করা হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। বিএসইসির কারও থেকেও তথ্য মেলেনি।

উরি ব্যাংক ছাড়াও দেশীয় সাত ব্যাংক রিং শাইন টেক্সটাইলের স্বল্পমেয়াদি মোট ৩৭৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পাবে। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক পাবে প্রায় পৌনে ১৮ কোটি টাকা। সর্বাধিক প্রায় ১২৪ কোটি টাকা পাবে ঢাকা ব্যাংক। এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক ৮৬ কোটি টাকা, দ্য সিটি ব্যাংক প্রায় সাত কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংক চার কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং প্রাইম ব্যাংক পাবে তিন কোটি ৪২ লাখ টাকা। উরি ব্যাংক পাবে প্রায় ১১৫ কোটি টাকা।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক ঋণ পরিশোধে রিং শাইন ইতোমধ্যে আইপিওর টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে। অবশ্য এ থেকে প্রিমিয়ার ব্যাংক তার ঋণের কিছু অংশ অর্থ আদায় করে নিয়েছে। যদিও আইপিওর এ টাকা থেকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের টাকা পরিশোধের কথা প্রসপেক্টাসে উল্লেখ ছিল না।

জানতে চাইলে রিং শাইন টেক্সটাইলের কোম্পানি সচিব আশরাফ আলী নিশ্চিত করেন, তার কোম্পানির মালিকপক্ষের সবাই এখন বিদেশে। দুই সপ্তাহ আগেই একযোগে তারা বাংলাদেশ ছেড়েছেন। তবে কোথায় গেছেন, তা জানতে চাইলে এড়িয়ে যান তিনি।

আশরাফ আলী বলেন, এমডিসহ পরিচালকরা না থাকলে কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনও চলছে বলেও জানান তিনি। মালিকরা বাংলাদেশে ফিরে আসবেন, কবে আসবেন, সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারেননি। এ অবস্থায় আগামী আগামীকাল (৩০ জানুয়ারি) কোম্পানিটির দ্বিতীয় প্রান্তিক শেষে পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হবে কিনা, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি।

এদিকে সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, উদ্যোক্তা-পরিচালকসহ নয়জন তাইওয়ানে ফিরে গেছেন। কিন্তু কোম্পানিটির আইপিও প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা তথ্যে দেখা গেছে, তারা সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। এ অবস্থায় কেন তারা তাইওয়ান গেছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানি সচিব বলেন, তাদের কারও পাসপোর্ট সিঙ্গাপুরের, কারও ইন্দোনেশিয়ার, কারও পাসপোর্ট তাইওয়ানের। এর বেশি কিছু জানা নেই। সংশ্নিষ্টরা মনে করছেন, আইপিওতে অসত্য তথ্য দিয়ে থাকতে পারেন মালিকপক্ষ।

আইপিও প্রক্রিয়ায় গত ১২ ডিসেম্বর দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল রিং শাইন টেক্সটাইল

  • তথ্য সূত্র : সমকাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here