মহা-সংকটে এমারেল্ড অয়েল !

0
3042

বিশেষ প্রতিনিধি : মহা-সংকটে রয়েছে এমারেল্ড অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ঋণ অনাদায়ী পড়ায় কোম্পানির বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করছে কয়েকটি ব্যাংক। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতির কারণে বন্ধ ব্যবসায়িক কার্যক্রম। গত বছরে দ্বিতীয় দফায় চালু করা হলেও আবারো বন্ধ রয়েছে।

স্পন্দন ব্র্যান্ডের রাইস ব্রান তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিটির মূল উদ্যোক্তা ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুল গণি গালিব ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে দুদকের মামলায় গ্রেফতারের পর সংকটের শুরু। কোম্পানির শেয়ার বিক্রি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। অন্যদিকে কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও বেতন অনিশ্চিত হওয়ায় চাকরি ছাড়ছেন অনেক কর্মচারী।

কোম্পানিটির বর্তমান নেতৃত্ব অবশ্য জানিয়েছে, সাবেক এমডির শেয়ার প্রতিষ্ঠিত কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দায়দেনা শোধ করতে চেষ্টা করছেন তারা। এ নিয়ে গত নভম্বম্বর-ডিসেম্বর থেকে শুরু করে চলতি মাসেও দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে। গত শনিবারও একটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করা হয়।

আগামী এক মাসের মধ্যে এ নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির পরিচালক স্বজন কুমার বসাক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসানুল হক তুষার।

এদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ে গত ডিসেম্বরে কোম্পানির জমিসহ কারখানা বিক্রি করতে নিলাম ডেকেছে বেসিক ব্যাংক। তবে প্রথম দফায় নির্ধারিত সময়ে কেউ নিলামে অংশ নেয়নি।

অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটালও পাওনা আদায়ে কোম্পানিটির কয়েকটি পিকআপ ভ্যান জব্ধ করেছে। এ ছাড়া শেরপুরে কোম্পানিটির কারাখানা এলাকার কাঁচামাল সরবরাহকারী ব্যবসায়ীরা পাওনা ১০ কোটি টাকা আদায়ে আইনি সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।

কোম্পানিটির কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিরাপত্তারক্ষী এবং কারখানা সংলগ্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, অন্তত গত দেড় বছর ধরে রাইস ব্রান অয়েল প্রস্তুতকারী কোম্পানিটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ আছে। আমাদের শেরপুর প্রতিনিধি দেবাশীষ ভট্টাচার্য সরেজমিন পরিদর্শন করে জানান, কার্যক্রম না থাকায় কারখানার অভ্যন্তরে ঘাস গজিয়েছে।

কারখানার দীর্ঘদিনে নিরাপত্তরক্ষী ফজলুল হক জানান, কারখানাটি প্রায় দুই বছর বন্ধ। গত চার-পাঁচ মাস বেতন পাচ্ছেন না তিনি। কারখানার মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আজাদ উৎপাদন বন্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি সম্পর্কে সাবেক এমডির মামা।

সৈয়দ আজাদ বলেন, সম্পর্কে মামা হলেও আমি ওই মিলের বেতনভোগী কর্মচারী। গালিবের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হওয়ার পর সে আত্মগোপনে। তার ঢাকার বাড়ি, শেরপুরের মিলসহ কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। শুনেছি, কিছুদিনের মধ্যে ঋণ করে পুনরায় মিল চালু করবে।

কোম্পানিটি সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে ১৪২ কোটি টাকারও বেশি পণ্য বিক্রি করেছে। এতে ১৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ সমাপ্ত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, চলতি হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। নিট মুনাফা হয়েছে ৩৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।

কারাখানা বন্ধ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সিইও তুষার। তিনি বলেন, ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের অভাবে পুরোদমে উৎপাদন চালানো যাচ্ছে না। ১৭-১৮ দিন বন্ধ থাকার পর ত্রুক্রড অয়েল দিয়ে সীমিত পর্যায়ে (২-৩ দিনের জন্য) উৎপাদন চলছে।

সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতেও কারখানায় উৎপাদন হয় বলে দাবি করেন তিনি।

মিল সংলগ্ন চায়ের দোকানি তাজুল শেখ বলেন, অন্তত দেড় বছর ধইরা মিল বন্ধ রইছে। শেরপুর সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, কাঁচামাল সরবরাহের বিপরীতে এমারেল্ডের কাছে তিনি প্রায় দেড় কোটি পান।

কুঁড়া ব্যবসায়ী ইন্দ্রজিৎ চাকী বলেন, স্পন্দনের কাছে তার পাওনা প্রায় ২২ লাখ টাকা। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে মিল কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলেও টাকা না পাওয়ায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। আরেক ব্যবসায়ী মাধাই সাহা বলেন, দুই বছর আগে কুঁড়া বিক্রির ২০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। মালিক ও জিএম দু’জনের ফোন বন্ধ, মিলেও দেড় বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ। খুব দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

সিইও তুষার জানান, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বেসিক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মাইডাস ফাইন্যান্সসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া কাঁচামাল সরবরাহকারীরাও বেশ কয়েক কোটি টাকা পাবে।

তিনি বলেন, ঋণ আদায়ে কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার হাইকোর্টে রিট করেছেন। এরপর শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ বিবেচনায় হাইকোর্ট ওই নিলাম স্থগিত করেছেন। অবশ্য দায়দেনা বেশি থাকায় কেউ কোম্পানিটি কিনতে রাজি নন। তারা কোম্পানিটি চালু করতে চান। কেননা দেশে রাইস ব্রান অয়েলের বড় বাজার আছে। বড় কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতা হলে সবার ঋণ পরিশোধ করে পুনরায় স্বাভাবিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।

বেসিক ব্যাংকের আইন বিভাগের কর্মকর্তা জাহিদ জানিয়েছেন, নিলাম স্থগিত করে কোনো রিট হয়েছে বলে তারা জানেন না। ব্যাংকটির দিলকুশা শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রিটের কথা শুনেছেন। লিখিত কোনো চিঠি পাননি। এদিকে নির্ধারিত সময়ে কেউ নিলামে অংশ নিতে দরপত্র জমা দেয়নি বলেও জানান তিনি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এখন কোম্পানিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজছেন। ব্যাংকের সঙ্গে নতুন সমঝোতায় যেতে আগ্রহী। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমারেল্ড অয়েল ঋণের অর্থ পরিশোধে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে এলে তা বিবেচনা করা হবে। তবে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে প্রস্তাব না আনলে অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে কোম্পানিটির বন্ধকিকৃত সম্পত্তি জিম্মায় নেবে ব্যাংক।

পরিচালক স্বজন কুমার আগামী এক মাসের মধ্যে মালিকানা পরিবর্তনে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে জানান।

এমারেল্ড অয়েলের মূল উদ্যোক্তা ও সাবেক এমডি গালিব কোম্পানিটির কারখানাসহ স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। এ ঋণে অনিয়মের অভিযোগ এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় দুদকের মামলার আসামি ও গ্রেফতার হন। পরে জামিনে মুক্ত হন।

২০১৪ সালে আইপিও প্রক্রিয়ায় ২০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এমারেল্ড অয়েল। গত ফেব্রুয়ারি শেষে কোম্পানিটিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ছিল ৩২ শতাংশেরও বেশি। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আছে সাড়ে ৯ শতাংশ। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার মোটের ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইতে শেয়ারটির সর্বশেষ লেনদেন মূল্য ছিল ২৮ টাকা ৪০ পয়সা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here