২ হাজার কোটি টাকা ঋণ, আরো বিশেষ সুবিধা চায় ৩ শিল্প গ্রুপ

0
1295

বিশেষ প্রতিনিধি : রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ক্ষতিগ্রস্ত বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ পুনর্গঠনে ২০১৫ সালে বিশেষ সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সুদ কমানো, পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ডাউনপেমেন্টের শর্ত শিথিলসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয় ১১টি শিল্প গ্রুপকে। ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়ে নতুন করে দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে- এসএ, রতনপুর ও এমআর গ্রুপ।

শিল্পগ্রুপগুলো আরো বিশেষ সুবিধা দাবি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। ঋণের ২ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার নতুন করে কোনো সুদ আরোপ না করা, আবার মেয়াদ বাড়ানোসহ নানা সুবিধা চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করেছে তিন শিল্প গ্রুপ।

বৈশ্বিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও ১১টি গ্রুপের পক্ষে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন আসে। তার সবই অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সবচেয়ে বেশি পুনর্গঠন হয় জনতা ব্যাংকের ঋণ।

জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের এমডি আবদুস সালাম স্টক বাংলাদেশকে বলেন, দু’একটি শিল্প গ্রুপ কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোসহ কিছু দাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে করেছে। এ ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম মেনে ঋণ পরিশোধ করছে বলে তিনি জানান।

তিন শিল্প প্রতিষ্ঠানের যৌথ আবেদনে বলা হয়েছে, পুনর্গঠিত মেয়াদি ঋণ পরিশোধের সময় ১২ বছরের স্থানে আরো ৮ বছর বাড়িয়ে তাদের ২০ বছর সময় দিতে হবে। ঋণের সুদহার হতে হবে শূন্য শতাংশ। অর্থাৎ নতুন করে আর কোনো সুদ আরোপ করা যাবে না। বিদ্যমান গ্রেস পিরিয়ড তথা ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ ১ বছরের পরিবর্তে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। ব্যাংকগুলো নতুন করে যেন তাদের চলতি মূলধন ঋণ দেয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সে ব্যবস্থা করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রতনপুর গ্রুপের এমডি মাকসুদুর রহমান বলেন, শূন্য শতাংশ সুদের দাবি করা হয়েছে যাতে কিছুটা হলেও সুদ কমানো হয়। কেননা ঋণ পুনর্গঠনের নীতিমালায় তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সঙ্গে এক শতাংশ সুদ যোগ করে নতুন সুদহার নির্ধারণ করতে বলা হলেও ব্যাংকগুলো তা করেনি। বেশিরভাগ ব্যাংক এর চেয়ে বেশি সুদ নির্ধারণ করেছে।

কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ শুরুর সময়ে এরকম আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ঋণ পরিশোধ করতে চান বলেই কিস্তি বাস্তবসম্মত করার দাবি জানিয়েছেন। তিনটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকে একরকম আবেদন করলেও এ দাবি মূলত সব শিল্প গ্রুপের বলেই তাদের ধারণা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি অবহিত নন বলে জানান। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই দাবি বাংলাদেশ ব্যাংক আমলে নিচ্ছে না। তারা বলেন, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট একটি নীতিমালার আলোকে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ২০১৫ সালে। এখন কিস্তি পরিশোধের সময় আসার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের সুযোগ চাওয়া অযৌক্তিক। ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করতে কৌশল হিসেবে এরকম দাবি উত্থাপন করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা।

তারা বলেন, নতুন চলতি মূলধন ঋণ সুবিধার বিষয়ে বলে দেওয়ার যে কথা আবেদনে এসেছে পুনর্গঠনের জন্য দেওয়া ২০১৫ সালের সার্কুলারেই তা উল্লেখ রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অসন্তোষজনক লেনদেনের কারণে ব্যাংক নতুন করে ঋণ দিতে না চাইলে সে দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেবে না।

ব্যাংক খাতে পাঁচশ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনায় ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যমান সুদহার কমানো, ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ও কিস্তি পুনর্নির্ধারণসহ সব কিছু নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও নগদ অর্থের প্রবাহ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত ‘এ’ ক্যাটাগরির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম থেকে প্রত্যয়ন নিয়ে ওই ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। নীতিমালার আওতায় ১১টি প্রতিষ্ঠানের মোট ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকা পুনর্গঠন করা হয়।

ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা অনুযায়ী, সুবিধা নেওয়া কোনো প্রতিষ্ঠান সময় মতো কিস্তি পরিশোধ না করলে তার সব ধরনের সুবিধা বাতিল হবে। একই সঙ্গে ঋণের পুরোটাই খেলাপি করে তা আদায়ে আইনি প্রক্রিয়া নিতে হবে। এমনকি ব্যাংক চাইলে এই ঋণ আদায়ে দেউলিয়া আইনে মামলা করতে পারবে বলে ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে। এসএ, রতনপুর ও এমআর গ্রুপের পুনর্গঠন করা ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় শুরু হলেও তারা এক টাকাও দেয়নি। আরও দু’একটি কিস্তি পরিশোধ না করলে এসব ঋণ খেলাপি হয়ে যাবে।

তিন গ্রুপের মধ্যে এসএ গ্রুপের এসএ অয়েল রিফাইনারি ও সামানাজের পক্ষে ৯২৮ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে দেশের ৬টি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সর্বোচ্চ ২৯৯ কোটি টাকা পুনর্গঠন হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে।

রতনপুর গ্রুপের পক্ষে তিন ব্যাংকে পুনর্গঠন হয় ৮১২ কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৮৮ কোটি টাকা ছিল জনতা ব্যাংকের। এমআর গ্রুপের বিআর স্পিনিং চার ব্যাংক থেকে ৫৭২ কোটি টাকার পুনর্গঠন সুবিধা নেয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে সর্বোচ্চ ৩১৪ কোটি টাকা পুনর্গঠন করে জনতা ব্যাংক।

চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দিন আলম। মুসকান ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল, আটা, ময়দা, সুজি, বোতলজাত পানি এবং গোয়ালিনি ব্র্যান্ডের মিল্ক পাউডার ও কনডেন্স মিল্কের উৎপাদন ও সরবরাহকারী এসএ গ্রুপ। আরও বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

চট্টগ্রামভিত্তিক স্টিল রি-রোলিং ও শিপ রি-সাইক্লিং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান রতনপুর গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির এমডি মাকসুদুর রহমান। গ্রুপটির মালিকানায় রয়েছে বহুল পরিচিত রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস বা আরএসআরএম স্টিল, মডার্ন স্টিল, জুট স্পিনিং, রতনপুর রিয়েল এস্টেট ও শিপ রি-সাইক্লিংসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

এমআর গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিআর স্পিনিং মিলস। প্রতিষ্ঠানটির এমডি মো. বজলুর রহমান। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রাজধানীর দিলকুশার ইউনুস সেন্টারে এর অফিস রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here