আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছে তিতাস গ্যাস

0
1633

স্টাফ রিপোর্টার : আগের বছরগুলোয় আয় কমিয়ে দেখানোর পর ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৬ হিসাব বছরে তা বাড়িয়ে দেখিয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষক এ মন্তব্য করেছে।

সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০১১ সালের ১ জুলাই বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে নিজেদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জ অঞ্চলের ব্যবসা হস্তান্তর করে তিতাস গ্যাস। সেখানে হস্তান্তর মূল্য ধরা হয় ২৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। তিতাস গ্যাসের জন্য এ সম্পদের ক্রয়মূল্য ছিল ৪১ কোটি ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৫২২ টাকা। এ হিসাবে ব্যবসা হস্তান্তর থেকে তিতাসের মূলধনি মুনাফা ধরা হয় ২২৭ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার ৪৭৭ টাকা।

কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডাউন পেমেন্ট ও কিস্তি বাবদ ২০১১-১২ হিসাব বছর থেকে ২০১৪-১৫ হিসাব বছর পর্যন্ত তারা বাখরাবাদ থেকে মোট ১৯৯ কোটি ৮০ লাখ ৯০ হাজার টাকা বুঝে পেয়েছে। সম্পদের ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে এ বাবদ এখন পর্যন্ত তিতাসের হাতে আসা মূলধনি মুনাফার পরিমাণ ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৮ টাকা।

তিতাস গ্যাসের ২০১৬ হিসাব বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান খান ওয়াহাব শফিক রহমান অ্যান্ড কোং জানায়, কোম্পানির ঘোষণা অনুসারে, এ আয় কোম্পানি নগদপ্রাপ্তির ভিত্তিতে হিসাবভুক্ত করেছে।

(জানা গেছে, এ পদ্ধতির হিসাবরীতি অনুযায়ী, যে বছর যত টাকা নগদ বুঝে পাওয়া যাবে, সে বছরের হিসাবে তত টাকাই আয় হিসেবে দেখাতে হবে) অথচ তিতাস গ্যাস আগের বছরগুলোয় কিস্তির অর্থ হিসাবভুক্ত না করে পুরোটাই ২০১৬ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে যুক্ত করেছে। যদিও গেল হিসাব বছরে এ খাত থেকে তাদের কোনো আয়ই হয়নি। এ বিষয়ে নিরীক্ষক তাদের আপত্তি প্রকাশ করে বলেছে, এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী বছরগুলোয় কোম্পানির আয় কমিয়ে এবং সর্বশেষ হিসাব বছরে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

এদিকে নিরীক্ষকের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিতাস কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা অ্যাক্রুয়াল বেসিসের পরিবর্তে ক্যাশ বেসিসে এ হিসাব করেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ডাউন পেমেন্ট বাবদ বাখরাবাদের কাছ থেকে ৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকা ও কিস্তি বাবদ ২২ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে কিস্তি বাবদ ৪৫ কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে কিস্তি বাবদ ৪৫ কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কিস্তি বাবদ ৪৫ কোটি ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় হয়েছে। এক্ষেত্রে বাখরাবাদের কাছ থেকে তাদের মোট আদায় হয়েছে ১৯৯ কোটি ৮০ কোটি ৯০ হাজার টাকা। এর থেকে ক্রয়মূল্য বাবদ ৪১ কোটি ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৫২২ টাকা বাদ দিয়ে মোট আদায়কৃত মূলধনি আয় ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৮ টাকা।

সম্পত্তি হস্তান্তর থেকে প্রাপ্তব্য ২২৭ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার ৪৭৭ টাকা মূলধনি আয় পূর্ববর্তী আর্থিক প্রতিবেদনগুলোয় মূলধন সঞ্চিতি হিসেবে দেখানো হয়েছিল। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তখন ঘোষণা করেছিল, সম্পূর্ণ অর্থ আদায় হওয়ার পর ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে পুরো অংকটি কোম্পানির আয় হিসেবে দেখানো হবে। কিন্তু বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি শেষ তিন কিস্তির অর্থ বাবদ ৬৮ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেনি। এ কারণে ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আদায়কৃত অর্থের বিপরীতে মূলধনি মুনাফা বাবদ আয়ের ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ ৩০ হাজার ৪৭৮ টাকা সে হিসাব বছরের প্রতিবেদনে অন্যান্য আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এদিকে নিরীক্ষকের মতামত অনুসারে, বিলম্বিত কর বা ডেফার্ড ট্যাক্স ইস্যুতে গেল হিসাব বছরে মুনাফা কমিয়ে দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে তিতাসে। আর্থিক প্রতিবেদনে বিলম্বিত কর-সংশ্লিষ্ট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ যথাক্রমে ১৭৩ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ৮১ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানো হয়নি। এর ফলে বিলম্বিত কর-সম্পদের সঙ্গে বিলম্বিত দায় সমন্বয়ের পরে বিলম্বিত কর-সম্পদ ও এ সম্পর্কিত বিলম্বিত কর আয় ৯১ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে কর-পরবর্তী মুনাফা ৯১ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা কম দেখানো হয়েছে।

এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য হচ্ছে, তিতাস গ্যাস ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছর থেকে মুনাফা অর্জন করায় প্রযোজ্য আয়কর বিধিবিধান অনুযায়ী, আয়কর সঞ্চিতিপূর্বক পরিশোধ করছে। অতঃপর বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড বা বিএএস অনুসারে ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে কর দায় নিরূপণ করা হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তবে আয়কর কর্তৃপক্ষ কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিএসএস-১২ যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় কোম্পানি রক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করে বিএএস-১২ অনুসারে দায় ও সম্পদ বিবেচনার বদলে শুধু দায় বিবেচনা করেছে। কুঋণ সঞ্চিতির বিপরীতে দেনাদার খাতে কোনো প্রাপ্য অর্থ ভবিষ্যতে অবলোপন করা সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট হিসাব সমন্বয়ের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা কর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায়সাপেক্ষে আয় ও সম্পদ হিসাবভুক্ত করা যথাযথ হবে।

এছাড়া পেনশন তহবিল, সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ ও সিস্টেম লস ব্যয় হ্রাস এবং গ্রাহকের নিরাপত্তা জামানতের বিষয়েও কিছু মতামত দিয়েছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান।

প্রসঙ্গত, ৩০ জুন ২০১৬ সমাপ্ত হিসাব বছরে কর পরিশোধের পর তিতাসের মুনাফা হয়েছে ৭২৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৭ টাকা ৩৭ পয়সা। আগের হিসাব বছরে তা ছিল যথাক্রমে ৮৮৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং ৮ টাকা ৯৮ পয়সা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here