আইপিও খরায় বাড়ছে অর্থের টান

0
2784

শাহীনুর ইসলাম : প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ঢাকা উত্তোলন করা কোম্পানিরগুলোর বিশেষ একটি মাধ্যমে। তবে এই মাধ্যমের গুরুত্ত্ব অনেকটা কমে আসায় আইপিও খরায় কাটছে পুঁজিবাজার। বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবির পরেও নতুন এবং বিশেষ কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যানুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭২টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ২০১২ সালে ১৭টি, ২০১৩ সালে ১২টি, ২০১৪ সালে ২০টি, ২০১৫ সালে ১২টি ও ২০১৬ সালে ১১টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে।

চলতি বছর নুরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার ৪৩ কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য আইপিও অনুমোদন এবং আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচ্যুয়াল ফান্ড পরিচালনাসংক্রান্ত অনুমোদন পেয়েছে।

গত বছরে যে পরিমাণ কোম্পানি আইপিওতে আসে এবং বর্তমানে আসছে তা অনেক কম। যে কারণে আরো আইপিও ছাড়ার উদ্যোগ নিতে হবে। যে সব কোম্পানি রোডশো সম্পন্ন করে আইপিও অপেক্ষায় রয়েছে সেগুলোকে দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে তাগিদ প্রকাশ করেন এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও মাহবুব মজুমদার।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে আইপিও খরা কাটাতে এবং পুঁজিবাজারে সুস্থ্যতায় আরো আইপিও ছাড়া দরকার।

২০১৬ সালে তালিকাভুক্ত ১১টি কোম্পানি মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড তিনটি, বস্ত্র খাতের তিনটি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের একটি, প্রকৌশল খাতের একটি, ওষুধ ও রসায়ন খাতের একটি, চামড়াশিল্প খাতের একটি ও বীমা খাতের একটি কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও অনুমোদন পায়।

২০১৫ সালে তালিকাভুক্ত ১২টি কোম্পানির মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড তিনটি, প্রকৌশল খাতের তিনটি, বস্ত্র খাতের তিনটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটি, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের একটি ও বিবিধ খাতের একটি কম্পানি আইপিও অনুমোদন পায়। রোডশো সম্পন্ন করে ১৮টি কোম্পানি আইপিও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অনুমোদন দেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

চলতি অর্থবছরের করনীতি অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানির জন্য করহার ২৫ শতাংশ, অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানি জন্য ৩৫ শতাংশ। ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এ হার যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ও ৪২.৫ শতাংশ। মোবাইল ফোন কম্পানির জন্য যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত হলে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ২.৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন কম্পানি ৫ শতাংশ ও অন্য কম্পানি ১০ শতাংশ করপোরেট কর রেয়াত পায়। কর রেয়াত থাকার পরও পুঁজিবাজারে না আসার কারণ কোম্পানি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব ও অনিচ্ছা।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, পুঁজিবাজার থেকে সাধারণ মানুষের অর্থ নিয়ে ব্যবসা করতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কোম্পানিকে তিন মাস পর পর আর্থিক হিসাব প্রকাশ করতে হয়। পুঁজিবাজারে না থাকলে বছর শেষে হিসাব দিলেই হয়। সংশ্লিষ্টদের যথাযথ উদ্যোগের অভাবও নতুন কম্পানির অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার বড় কারণ।

কোম্পানির তালিকাভুক্তি কমার সঙ্গে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণও কমেছে।

২০১২ সালে বাজারে শেয়ার ছেড়ে ১৭টি কম্পানি ১৫৫৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। ২০১৩ সালে ১২টি কোম্পানি সংগ্রহ করে ১৩৩৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা, ২০১৪ সালে ২০টি কোম্পানি সংগ্রহ করে ১৭১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ১২টি কোম্পানি সংগ্রহ করে ১৩২৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালে ১১টি কোম্পানি সংগ্রহ করে ১১৮৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মূলধন।

বিএসইসি সূত্র জানায়, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ১৮টি কোম্পানি। ৯টি কোম্পানি বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে ও ৯টি ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে (প্রিমিয়ামসহ) অর্থ সংগ্রহ করতে চায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় বেশ সময় লাগছে। যে কারণে আইপিও অনুমোদন দিতেও দেরি হচ্ছে।

সূত্র জানায়, অপেক্ষমাণ ১৮টি কম্পানি পুঁজিবাজার থেকে ৮১৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ৯ কোম্পানি১৮১ কোটি টাকা এবং বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৯ কোম্পানি ৬৩২ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়।

ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতির অপেক্ষমাণ কোম্পানিগুলো হচ্ছে ভিএফএস থ্রেড ডাইং (২২ কোটি টাকা), ওইমেক্স ইলেকট্রোড (১৫ কোটি টাকা), ইন্ট্রাকো রি-ফুয়েলিং (২০ কোটি টাকা), বিবিএস কেবলস (২০ কোটি টাকা), অ্যামিউলেট ফার্মাসিউটিক্যালস (১৫ কোটি টাকা), ইন্দো-বাংলা কম্পানি (২০ কোটি টাকা), নাহি অ্যালুমিনিয়াম (১৫ কোটি টাকা), জেনেক্স ইনফোসিস (২০ কোটি টাকা) এবং কাটোলি টেক্সটাইল (৩৪ কোটি টাকা)।

বুক-বিল্ডিং পদ্ধতির অপেক্ষমাণ কম্পানিগুলো হচ্ছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট (২০ কোটি টাকা), এসটিএস হোল্ডিংস (১৭ কোটি টাকা), বসুন্ধরা পেপার মিলস (২০০ কোটি টাকা, আমান কটন (৮০ কোটি টাকা), রানার অটোমোবাইলস (১০০ কোটি টাকা), বেঙ্গল পলি অ্যান্ড পেপার স্যাকস (৫৫ কোটি টাকা), পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস (৭০ কোটি টাকা), ইনডেক্স এগ্রো (৪০ কোটি টাকা) এবং ডেল্টা হাসপাতাল (৫০ কোটি টাকা)।

পুঁজিবাজার-বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে আসতে চায় না। প্রতি প্রান্তিকে শেয়ারের হিসাব দেওয়াকে জটিলতা মনে করে তারা। বড় দেশি-বিদেশি অনেক কম্পানি পুঁজিবাজারে আসছে না, করপোরেট কর সুবিধা থাকার পরও। উদ্যোগ নিয়ে ভালো কম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে হবে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনে বহুজাতিক ও বড় কম্পানির করপোরেট কর আরো কমানো যেতে পারে। পুঁজিবাজারকে আরো ভালো অবস্থানে নিতে হলে অবশ্যই ভালো ও মৌল ভিত্তির কম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে পুঁজিবাজার ভালো রাখার জন্য আরো আইপিও অনুমোদনের কথা বলেন মাহবুব মজুমদার।

পেছনের খবর : আইপিও ছাড়ার পরিমাণ বাড়াতে হবে: মাহবুব মজুমদার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here