‘মার্জিন ঋণ নিয়ে খবরদারি করবেন কেন’

0
2165

আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করে— আচ্ছা, শেয়ারবাজারের সঙ্গে মুদ্রানীতির কোনো সম্পর্ক আছে কি? তাদের জিজ্ঞাসা হলো, আপনার মতো কিছু লোক মুদ্রানীতি ঘোষণা করার সময় হলে এ নিয়ে দেখি মাথা ঘামান। আবার অন্য অনেক বিনিয়োগকারীকে দেখি এ নিয়ে কথা বলতে। তারাই বা কী বুঝল, যেটা আমরা বুঝতে পারলাম না।

আগে তো কোনো দিন শুনিনি মুদ্রানীতির সঙ্গে শেয়ারবাজারের একটি সম্পর্ক আছে। এখন এটি হয়ে গেছে একটি আলোচিত বিষয়। বিশ্বের অন্যান্য শেয়ারবাজারেও কি একই অবস্থা? তাদের কথা শুনে আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, তারা কেউ অর্থনীতি বা ব্যবসায় শিক্ষা পড়েনি। এদের মধ্যে অনেকে শিক্ষিত হলেও অর্থনীতি-ব্যবসায় নীতি এসব বিষয়ে শিক্ষিত নয়। এরা যদি এসব বিষয়ে কিছুটা হলেও অধ্যয়ন করত, তাহলে মুদ্রানীতি ও শেয়ারবাজারকে একেবারে বিচ্ছিন্ন কিছু মনে করত না।

এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিশ্বের অন্য শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদেরও এক্ষেত্রে বুঝের মান এটুকুই। আমাদের শেয়ারবাজারের অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর অন্য দুর্বলতা হলো, তারা এ বাজারকে অন্য বাজারের সঙ্গে বা অর্থনীতির অন্য চলকগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বুঝতে অপারগ। অন্য কথায়, তারা শেয়ারবাজারকে সামগ্রিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে অভ্যস্ত। এরা শেয়ারের মূল্যনির্ধারণের ক্ষেত্রে একচেটিয়াভাবে কোম্পানির আয়কে এবং সঞ্চিত সম্ভাবনাকে প্রাধান্য দেয়।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ

অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থাও যে শেয়ারের মূল্যনির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে, এ ব্যাপারে ভাবতে তারা নারাজ। তারা শেয়ার বিনিয়োগে ঝুঁকির কথা শুনেছে বটে, তবে ঝুঁকি কীভাবে পরিমাপ করা হয়, সেটা জানে না। তারা এটা বোঝে যে, সব অর্থকে একটা বা দুটো শেয়ারে না খাটিয়ে ঝুঁকি কমানোর জন্য বিভিন্ন শেয়ারে বিনিয়োগ করলে ভালো হয়। তবে কে এই তত্ত্ব দিয়েছে এবং এই তত্ত্বের মূল সমালোচনাগুলো কী, সেটা তাদের জানা নেই।

তারা ওয়ারেন বাফেটের নাম শুনেছে বটে, তবে তিনি কী বলেছেন, সেটা মনে রাখেনি। বাফেটের কথা মনে রাখলেও তাদের বদ্ধমূল ধারণা, বাফেটের নীতি আমাদের শেয়ারবাজারে খাটবে না। প্রত্যেকেই শেয়ার বেচাকেনা করতে গিয়ে টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস প্রয়োগ করে বটে, তবে এ তত্ত্বের স্বীকৃতি নেই। সবচেয়ে মারাত্মক ভুল কথা হলো, তারা বলতে থাকে আমাদের বাজারে ভালো করার জন্য অধ্যয়ন-গবেষণা এসবের প্রয়োজন নেই।

বাজার এসব মেনে চলে না। বরং যারা বাজারের সঙ্গে থাকে, তারা ভালো করে। বেশি অধ্যয়ন করে শেয়ার কিনলে বেশি ক্ষতি হয়। এর অর্থ ধরে নিলাম, বাজারের কিছু খেলোয়াড় বা জুয়াড়ি যেদিকে বাজারকে বা কোনো শেয়ারের বাজারমূল্যকে নেবে, তার সঙ্গেই থাকতে হবে। এরা আবার গুজবেরও বেশ সমঝদার। গুজব নিজেরা তৈরি করে, অন্যের সৃষ্টি করা গুজবকে আবার ক্রয় করে। তবে ক্রয় করে অর্থ দিয়ে নয়। কাজে লাগাতে চায় বলা চলে।

তবে আমার মতে, এ ধরনের ট্রেডিং থেকে যে আয় হবে, তা জিরো-সাম গেমের নিয়ম মেনে চলবে। এর অর্থ, শেষ পর্যন্ত লাভ-লোকসান শূন্য হবে, কপাল খারাপ হলে সম্পদের কিছু অংশ বিয়োগ হয়ে যেতে পারে। এসব বৈশিষ্ট্য ঢাকার শেয়ারবাজারে জেঁকে বসেছে এজন্য যে, এ বাজার অনেকটা ট্রেডিং নির্ভর। যে ৬০০-৭০০ কোটি টাকা রোজ টার্নওভার ঘটে, তার ৮০-৯০ শতাংশ হলো ডে ট্রেডিং বা ডে ট্রেডারদের বেচাকেনা থেকে।

বাজার ডে ট্রেডারদের দখলে থাকলে যে সামান্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী বাজারে আছেন, একপর্যায়ে তারাও হতাশ হয়ে পড়েন। তবে ডে ট্রেডারদের প্রভাব থেকে বাজারকে মুক্ত করার আপাতত কোনো উপায় নেই। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ বাড়াতে বাজারে ভালো শেয়ারের জোগান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। ভুয়া শেয়ারের জোগান যত বেশি হবে, ততই জুয়াড়িদের পোয়াবারো হবে। এগুলো নিয়ে খেলতে তারা বড় আনন্দ পায়।

যা হোক, যে কথা বলতে চেয়েছি, সে কথায় আসি। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা বড় অংশ মুদ্রানীতির সঙ্গে শেয়ারবাজারের সম্পর্ক না বুঝলেও তারা এটা বুঝেছেন যে, ভুলভাবে এবং অন্যায়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সাহেব যা বলেছেন, তাতে শেয়ারবাজারের ক্ষতি হয়েছে। তাদের কথা হলো, তিনি মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন, করুক, কিন্তু শেয়ারবাজারের মার্জিন ঋণ নিয়ে খবরদারি করবেন কেন? তাদের কথা হলো, মার্জিন ঋণের বিষয়টা তো বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তথা শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি সংস্থার কাজ।

এ বিষয়টি তো গভর্নর সাহেবের কাজ হতে পারে না। তিনি ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারের (অতিরিক্ত) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ধমকের সুরে কথা বলার কারণে শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক পড়ে গেছে। তাদের কথা হলো, উপরের লোকজন চাইছে না শেয়ারবাজার আরো উঠুক। কিন্তু গভর্নর সাহেব যা বলেছেন, তা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থেই বলেছেন। সেভাবে তারা বুঝল না।

আসলে গভর্নর সাহেব যা বলেছেন, সেটি তার বলাই উচিত ছিল। না বললে বরং তিনি তার দায়িত্বে অবহেলা করতেন। ২০১০-এ বিনিয়োগকারীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা তো বাজারের অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের কারণে। আর সেই উল্লম্ফন তো ঘটেছিল ব্যাংকঋণ এবং মার্জিন ঋণের অবাধ প্রবাহের মাধ্যমে। ব্যাংকগুলোও নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ঢেলে যত খুশি শেয়ার কিনেছিল। তার ফল তো আমরা সবাই দেখেছি।

বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সময় থাকতে ২০০৯ থেকে মার্জিন ঋণের লাগাম টেনে ধরত, তাহলে সে হূদয় ভাঙার অবস্থার উদ্ভব হতো না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কারা? বিও অ্যাকাউন্টধারীদের এক বিরাট অংশ। আর লাভবান হয়েছে কারা? ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত ঋণাত্মক ইকুইটির জালে আবদ্ধ হলো। লোকসানে পড়ে ওইসব ব্যাংক কয়েক বছর ধরে কোনো ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। তার পর ব্যাংকিং আইনে পরিবর্তন এসেছে।

আইন হয়েছে, এখন থেকে ব্যাংকগুলো কোনো অবস্থাতেই তাদের টায়ার-১ ক্যাপিটালের ২৫ শতাংশের বেশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এক্ষেত্রে আমার মত হলো, কেউ শুদ্ধ করে দিলে ভালো হবে। গভর্নর সাহেব ব্যাংকগুলোকে ওই সীমার কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন। এটির দরকার ছিল।

ব্যাংকিং খাতের ঋণ এবং বিনিয়োগ নিয়ে গভর্নরের বলার অনেক কিছুই আছে এবং যে ঋণ ও বিনিয়োগ শেয়ারবাজারে যাচ্ছে, তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শেয়ারবাজারের মূল্যসূচক বাড়লে এসব শেয়ারের বিপরীতে দেয় ঋণের পরিমাণও বেড়ে যায়। কারণ হলো, ঋণ দেয়া হয় মার্জিনেবল সিকিউরিটিজের মূল্যের ভিত্তিতে।

অনেক উদ্যোক্তাও শেয়ার বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণ নিয়েছেন। এখন এক্ষেত্রে আরো যদি বেশি ঋণ দেয়া হয়, তাহলে সে ঋণ ব্যাংকের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেদিকে নজর রেখে গভর্নর সাহেব (আমি যদি বুঝে থাকি) উদ্যোক্তাদেরকে অতিরিক্ত ঋণ প্রদানের বিষয়ে হুঁশিয়ার করেছেন। এতেও দোষের কিছু নেই। বরং যথাসময়ে এ হুঁশিয়ারি না দিলে মন্দ জামানতের বিপরীতে বেশি ঋণ গিয়ে পড়ত কিছু বড় উদ্যোক্তার হাতে।

পরে ব্যাংককে খুঁজতে হতো কীভাবে উদ্যোক্তা থেকে অতিরিক্ত জামানত আদায় করা যায়। বিশ্বের কোনো দেশেই আমাদের উঠতি শেয়ারবাজারের মতো শেয়ারের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে ঋণ দেয়া হয় না। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যা দেখে, তাহলো আমানতের অন্তর্নিহিত মূল্য। বাজারমূল্য অন্তর্নিহিত মূল্যের কয়েক গুণ হতে পারে। তাই বলে ব্যাংকগুলো কি ওই মূল্যের ওপর ঋণ দেবে?

মুদ্রানীতির সঙ্গে শেয়ারমূল্যের ওঠা-নামার একটা সম্পর্ক আছে। অনেকে এ বিষয়টিই জানতে চায়। আমি যখন বলি, এটি জানতে হলে তো ক্লাসরুমে গিয়ে শিখতে হবে। কিন্তু তারা সে ধরনের শিক্ষা নিতে নারাজ। তারা দু-এক কথার মাধ্যমে বিষয়টিকে জানতে চায়। আমি সংক্ষেপে যা বলি তা হলো, সুদের হার কমলে শেয়ারবাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ে এবং অর্থপ্রবাহ বাড়লে শেয়ারের মূল্য বাড়ে। সুদের হার কমানো-বাড়ানো অনেকটা নির্ভর করে মুদ্রানীতির ওপর।

অন্যান্য বিষয় একই থাকলে অর্থনীতিতে যদি মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে, তাহলে আশা করা যায় সুদের হার কমবে। আর সুদের হার কমলে আশা করা যায় বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনীতিতে কর্মযজ্ঞ বাড়বে এবং কোম্পানিগুলো বেশি আয় করবে। আর এই যে আপনারা কোম্পানির ইপিএস বা শেয়ারপ্রতি আয়ের ওপর এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন, সেটার ধনাত্মক পরিবর্তন হয়, যদি কোম্পানি বেশি উৎপাদন করতে পারে।

শুধু মুদ্রানীতি দ্বারা বিনিয়োগ বাড়ানো যায় না। তবে এ নীতি সহায়কের ভূমিকা নিতে পারে। অন্য কথা হলো, মুদ্রানীতি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে একটা আশাবাদ তৈরি করে। আশাবাদ থেকে ভোগ ও বিনিয়োগ উভয়ই বাড়ে। তখন সে আশাবাদ শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। তখন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী মনে করেন, শেয়ারের মূল্য বাড়বে। আর তখন সত্যিই শেয়ারমূল্য বাড়তে থাকে।

অনেকে প্রশ্ন করেন, আশাবাদের বিষয়টি শেয়ারবাজারে প্রথমে উত্পত্তি হয় না। এর কোনো সোজাসাফটা জবাব নেই। শেয়ারবাজার জিডিপির তুলনায় বড় হলে আশাবাদটা শেয়ারবাজার থেকে অর্থনীতির অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের এখানে বিষয়টি এমন নয়। আমাদের জিডিপির তুলনায় আমাদের বাজার অনেক ছোট। শেয়ারবাজারের আকার এবং গভীরতা কতটা হবে, তা অনেকটা নির্ভর করে কয়টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত আছে, তার ওপর নয়, বরং কয়টি মানসম্পন্ন কোম্পানি কত টাকার ইস্যু ক্যাপিটাল নিয়ে তালিকাভুক্ত আছে তার ওপর।

দুর্ভাগ্য হলো, আমাদের এই বাজারে ইস্যু ক্যাপিটাল অনেক ছোট এবং ইস্যু ক্যাপিটাল যে রিটার্ন বিনিয়োগকারীদের দেয়ার কথা, তাও দিচ্ছে না। এক্ষেত্রে আমাদের নীতিনির্ধারকরা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে পারে কিনা, তা জোর দিয়ে ভেবে দেখার অনুরোধ করব। জুয়ার বোর্ডে ডাই নিক্ষেপের মতো অনেকগুলো জাংক শেয়ার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করে বিনিয়োগকারীদের ওইগুলোয় বিনিয়োগ করতে বললে তারা তা-ই করবেন। ভালো শেয়ারের জোগান আমাদের ব্যক্তিখাত থেকেও হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকেও হতে পারে।

  • অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here