বাজারের অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের কারণ

0
5431

সিনিয়র রিপোর্টার : শেয়ারবাজারে আবারও বেচাকেনায় বড় ধরনের উত্থান-পতন হচ্ছে। লেনদেনে ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের একক প্রাধান্যই এর মূল কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শক্তিতে যে শেয়ারবাজার চলে, তার ধরন সাধারণত এমনই হয়।

তারা খুব বেশি আশাবাদী হয়ে যেমন শেয়ার কেনেন, আবার ভীত হলে একযোগে শেয়ার বিক্রি করে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাজার টালমাটাল হয়ে পড়ে। বেচাকেনায় উত্থান-পতনটা হয় অস্বাভাবিক। বলছেন, শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের নিয়ন্ত্রণ না নিলে অস্বাভাবিক ধারার অবসান হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যত কোনো প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রুপভিত্তিক বিনিয়োগকারী শ্রেণির লেনদেনের যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেনদেনে ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের অংশ প্রায় ৮৪ শতাংশ। এতে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ১৩ শতাংশ এবং বিদেশিদের অংশ প্রায় ৩ শতাংশ। গত ২৩ জানুয়ারি যে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, সেখানেও পরিস্থিতির পরিবর্তন নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাজার মূলধনে গত নভেম্বরে তালিকাভুক্ত ২৯৪ কোম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। ডিসেম্বরে কমে হয়েছে ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ।

লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ২০০৯-১০ সালের মূল বিনিয়োগকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। পূবালী, ব্র্যাক, ঢাকা, ইসলামী, এনআরবি কমার্শিয়াল এবং এনআরবি ব্যাংকের বাইরে অন্যদের শেয়ার কেনাবেচা সামান্য।

মার্চেন্ট ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ব্রোকার ডিলাররা গত ডিসেম্বরে যতটা শেয়ার কিনেছে, বিক্রি করেছে তার প্রায় দ্বিগুণ। কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি বাজারের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বড় মাত্রায় লেনদেন করেছে।

সাম্প্রতিক শেয়ারবাজার : সাম্প্রতিক শেয়ারবাজারের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি জানুয়ারির শুরুতেও যে লেনদেন ছিল হাজার কোটি টাকা, তিন সপ্তাহের ব্যবধানে গত ২৩ জানুয়ারি তা দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এখন তা আবারও হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। প্রতি ক্ষেত্রেই লেনদেনের অন্তত ৮০ শতাংশ জুড়ে ছিল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা।

কেবল লেনদেন নয়, শেয়ারদর ও সূচকেও একই অবস্থা। গত ডিসেম্বর শেষে বাজারের প্রধান সূচক ছিল (ডিএসইর ডিএসইএক্স) ৫০৩৬ পয়েন্টে। মাত্র ১৭ কার্যদিবসে তা ৬৩৪ পয়েন্ট বা সাড়ে ১২ শতাংশ বেড়ে ৫৭০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে যায়। গত সোমবার পর্যন্ত চার কার্যদিবসেই কমেছে ২৮৭ পয়েন্ট। অর্থাৎ সূচক বাড়তে যতটা সময় লেগেছে, কমেছে তার থেকে দ্রুতগতিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্ত্রীর গহনা বিক্রি বা ধার-দেনা করে বর্তমানে অনেক সাধারণ মানুষ শেয়ারবাজারে আসছেন। বাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় গুজবে ও কানকথা শুনে আকৃষ্ট হয়ে প্রতিদিনই নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন টাকা নিয়ে। দরপতনের ভীতি থেকে শেয়ার বিক্রিও করছেন তারা।

গত ডিসেম্বরে ঢাকা ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস ডিবিএল সিকিউরিটিজে হায়দার আলী (ছদ্মনাম) তার জমি বেচা ২০ কোটি টাকা নিয়ে শেয়ারবাজারে আসেন। ফিক্সড ডিপোজিটের প্রায় ১২ লাখ টাকা তুলে বিনিয়োগের জন্য ব্রোকারেজ হাউস লংকা-বাংলায় আসেন আবদুল মালেক। গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে প্রায় ৬০ হাজার নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে এসেছেন।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫ লাখ থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ শেয়ারবাজারে এনেছেন ব্যক্তি বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজেদুর রহমান বলেন, শেয়ারবাজারের সূচকগুলো বাড়তে দেখলে সাধারণ মানুষ অধিক হারে বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে তা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। তাদের সিংহভাগের বিনিয়োগ মৌলভিত্তি বিবেচনায় হয় না। আবার কোনো কারণে দরপতনের ভীতি ছড়িয়ে পড়লে তারাই সবার আগে শেয়ার বিক্রি করেন। তখনই দরপতন ত্বরান্বিত হয়। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানোর খবরে বড় দরপতন হওয়ারও এমনই কারণ।

লেনদেনে কার কত অংশ : সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বরে ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগ ছিল মোট লেনদেনের প্রায় ৮৪ শতাংশ। সেখানে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। ওই মাসে দুই শেয়ারবাজারে ১৮ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়। কেনা ও বেচা উভয়দিক বিবেচনায় নিলে লেনদেন হয়েছে ৩৭ হাজার ৭৭০ কোটি টাকার।

ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের বাইরে একক গ্রুপ হিসেবে শীর্ষে ছিল বিদেশি বিনিয়োগ, যা শেয়ারবাজারের মোট লেনদেনের ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এক হাজার ৭৬ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা করেন। এর মধ্যে ৬৮১ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় এবং বিক্রি ৩৯৫ কোটি টাকার। অর্থাৎ বিদেশিরা বিক্রির তুলনায় কিনেছেন বেশি।

লেনদেনে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল নগণ্য। পুরো ডিসেম্বর মাসে লেনদেনে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ব্রোকার ডিলারদের ক্ষেত্রে হার ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ৩ শতাংশের কম। এককভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির অংশ প্রায় সোয়া ২ শতাংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চাপে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও বিনিয়োগ কিছুটা বাড়িয়েছে। তবে তা লেনদেনের ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ।

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত নভেম্বরে দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিতভাবে শেয়ার ক্রয়ের তুলনায় শেয়ার বিক্রি কম ছিল। তবে ডিসেম্বরের চিত্র ছিল পুরো উল্টো। প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা শেয়ার কিনেছে, বিক্রি করেছে তার প্রায় দ্বিগুণ।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আর্থিক খাতের (ব্যাংক, লিজিং ও বীমা কোম্পানি) মালিকানাধীন ৩২ ব্রোকার ডিলার প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্রোকার ডিলার প্রতিষ্ঠান মিলে এ হার সোয়া ২ শতাংশ ছিল। ব্রোকার ডিলার প্রতিষ্ঠান ২১৮ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করেছে। বিক্রি করেছে ৪০২ কোটি টাকার শেয়ার।

এর মধ্যে ব্রোকার ডিলার হিসেবে সর্বাধিক ৩৪ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে দ্য সিটি ব্যাংকের মালিকানাধীন সিটি ব্রোকারেজ। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রিতেও ছিল শীর্ষে। বিক্রি করেছে ৩১ কোটি টাকার শেয়ার। এর পরের অবস্থানে থাকা ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ ২৮ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ২৭ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস ৭ কোটি টাকারও কম শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রি করেছে ২৩ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের শেয়ার। শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা ১ কোটি টাকারও কম শেয়ার কিনেছে। বিপরীতে বিক্রি করেছে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকার শেয়ার।

গত ডিসেম্বরের লেনদেনে ৫৬ মার্চেন্ট ব্যাংকের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২৩৬ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করেছে ২৭৭ কোটি টাকার শেয়ার। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রায় ২২ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংক অগ্রণী ইক্যুয়িটি। বিপরীতে বিক্রি করেছে ৪৩ কোটি টাকার শেয়ার। ট্রাস্ট ব্যাংকের মালিকানাধীন ট্রাস্ট ব্যাংক ইনভেস্টমেন্ট ১৭ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে প্রায় ২৮ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

তবে আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মালিকানাধীন মার্চেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্ট ডিসেম্বরে প্রায় ১১ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ করলেও কোনো শেয়ার বিক্রি করেনি।

ব্যাংকগুলোর মধ্যে এ সময়ে সবচেয়ে সক্রিয় ব্র্যাক, পূবালী, ঢাকা, ইসলামী, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি ব্যাংক। এক সময়কার বিনিয়োগে সর্বাধিক সক্রিয় ন্যাশনাল, এবি, প্রাইম, ট্রাস্ট, সাউথইস্ট, এনসিসি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিও বিনিয়োগ খুবই কম। সহযোগী কোম্পানির মাধ্যমে অল্প কেনাবেচা করেছে।

এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইসিবি বিনিয়োগে এগিয়ে ছিল। পুরো ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ৪৫২ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়ের বিপরীতে ৩৯৯ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছিল, যা মোট লেনদেনের সোয়া ২ শতাংশ। নভেম্বরেও প্রতিষ্ঠানটি ৩৬৮ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করেছিল। বিক্রি করেছিল ২৯০ কোটি টাকার।

বিশ্লেষকদের অভিমত : মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএ সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কম হওয়ার কারণ হলো -ব্যাংক কোম্পানি আইনে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সেগুলোর সহযোগী মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার ডিলার হিসাবের বিনিয়োগ ব্যাপক হারে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বলতে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের হাত বেঁধে ফেলা হয়েছে। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের শেয়ারবাজারের অনেকটা অপুষ্ট শিশুর মতো বড় হচ্ছে। সুষ্ঠু বিনিয়োগ ধারা সৃষ্টি করতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সৃষ্টির জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত, লেনদেন ও সূচক কতটা বাড়ল, সেদিকে নজর না দিয়ে বাজারের টেকসই উন্নতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শ্রেণির দিকে নজর দেওয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here