ঋণ খেলাপি, তবুও মুনাফায় বেসিক ব্যাংক!

0
376

সিনিয়র রিপোর্টার : ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ২০১৬ সালে মাত্র ১৪১ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছে বেসিক ব্যাংক। বিভিন্ন সুবিধায় ৭৮৮ কোটি টাকা পুনঃতফসিলের পরও ব্যাংকটির মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি এখনও খেলাপি।

গত বছর নতুন ঋণও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি। এরপরও ২০১৬ সালে প্রায় ১৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা হয়েছে ব্যাংকটির। ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে আলোচিত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকটির মুনাফার তথ্যের যথার্থতা খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ২০১৬ সালে বেসিক ব্যাংকে মাত্র ৬০৮ কোটি টাকার ঋণ বেড়ে ১৩ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা হয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি রয়েছে ৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

আগের বছর ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা যা মোট ঋণের ৫০ শতাংশ। গত এক বছরে এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪১০ কোটি টাকা বেড়েছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোনো ব্যাংক আয় দেখাতে পারে না। যদিও ঋণের জন্য সংগ্রহ করা তহবিলের বিপরীতে আমানতকারীকে নিয়মিত সুদ দিতে হয়।

ফলে বেসিক ব্যাংককে ঋণের বিপরীতে আয় করতে হলে আমানতের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সুদে ঋণ দিতে হবে। কেননা, আমানতের বিপরীতে যে ব্যয় হচ্ছে খেলাপি বাদ দিয়ে বাকি ঋণের বিপরীতে তার চেয়ে বেশি আয় করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আমানতের খরচ তোলা তো দূরের কথা, উল্টো ঋণের গড় সুদহারের তুলনায় আমানতে বেশি খরচ হচ্ছে ব্যাংকটির। কেননা এই ব্যাংকের প্রতি আস্থা কম থাকায় গ্রাহক আকর্ষণে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দিতে হচ্ছে। এতে করে গত বছরের অনেক মাসে এই ব্যাংক আমানতের গড় যে সুদহার ছিল, ঋণ বিতরণ করেছে তার চেয়ে কম সুদে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত অক্টোবরে ব্যাংকটি গড়ে ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। অথচ ঋণ বিতরণ করেছে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ সুদে। তার আগের মাস সেপ্টেম্বরে গড়ে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে ঋণ দিয়েছে ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ সুদে। এ ছাড়া অন্য মাসগুলোতেও ঋণ ও আমানতের মধ্যকার সুদহারের ব্যবধান ছিল খুব কাছাকাছি। ফলে সুদ থেকে আয়ের পরিবর্তে লোকসান হওয়ার কথা।

ঋণ ও বিনিয়োগের বাইরে ব্যাংকগুলোর আয়ের অন্যতম আরেকটি উৎস কমিশন ও চার্জ থেকে পাওয়া অর্থ। নানা অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনায় থাকায় দেশের বাইরে অধিকাংশ ব্যাংক এখন আর সরাসরি বেসিক ব্যাংকের এলসি নিচ্ছে না। যে কারণে ব্যাংকটি এখন সোনালীসহ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলছে।

ফলে কমিশন বা চার্জ থেকেও তেমন আয় হয় না। আবার সর্বশেষ অর্থবছর বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে মাত্র ১৭ লাখ ডলারের মতো রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছর এসেছিল ১৮ লাখ ডলার। এতে রেমিট্যান্স থেকেও উল্লেখযোগ্য কোনো আয় আসেনি।

প্রসঙ্গত, পরিচালন মুনাফা ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এখান থেকে ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ ও সরকারকে ৪০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের পর নিট মুনাফার হিসাব হয়। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের ৬ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি ছিল তিন হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রভিশন ঘাটতি আরও বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। ফলে ব্যাংকটির বড় অঙ্কের নিট লোকসান হবে নিশ্চিতভাবেই তা বলা যায়।

জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, কিছু নতুন ঋণ বিতরণ হয়েছে। আগের কিছু নিয়মিত ঋণও রয়েছে। এসব থেকে আয় হয়েছে। আবার সরাসরি কিছু এলসিও হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমানো হয়েছে, উচ্চ খরচের কিছু আমানত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে এবার কিছু পরিচালন মুনাফা হয়েছে। তবে পরিচালন মুনাফা তেমন কিছু নয়। এটা নিয়ে হৈচৈ করার কিছু নেই।

তিনি বলেন, বন্ডের বিপরীতে সরকারের কাছ থেকে যে অর্থ চাওয়া হয়েছিল তা পেলে বার্ষিক আর্থিক বিবরণীটা আরও ভালো হতো। তাতে ব্যাংকটিকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল। আমরা চেয়েছিলাম ২০১৬ সালের আর্থিক বিবরণীতে বিষয়টি যুক্ত করতে।

বেসিক ব্যাংকের এমডি খন্দকার মো. ইকবালও একই রকম তথ্য দিয়ে সম্প্রতি বলেন, আগের বছরের ২৫৬ কোটি টাকার পরিচালন লোকসান কাটিয়ে ২০১৬ সালে ব্যাংকটিকে ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার পরিচালন মুনাফা করতে হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here