সালমান এফ রহমানের শেয়ার কেলেঙ্কারি মামলার কি হবে?

0
1377

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দোষেই বাতিল হয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের শেয়ার কেলেংকারির দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। দায়সারা আইনজীবী দিয়েই মামলা পরিচালনা করছে কমিশন।

বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে একটি মামলার শুনানিতে বিএসইসির আইনজীবীর ফি মাত্র ৫০০ টাকা। কিন্তু বিপক্ষের আইনজীবীরা প্রতি শুনানির জন্য দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফি পান।

এ ছাড়া মামলার আইনজীবী পরিবর্তনের ব্যাপারে ২০১২ সালে সুপারিশ করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তা আমলে নেয়নি বিএসইসি। এদিকে উচ্চ আদালতে মামলা বাতিলের পর নিয়মরক্ষার জন্য এখন আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও মামলাটি দুর্বলভাবে সাজানো হয়। কেননা, বেক্সিমকো নিজস্ব ব্রোকারেজ হাউস দিয়ে ১৯৯৬ সালে শেয়ার কারসাজি করে। এর প্রমাণ রয়েছে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে কারসাজির ঘটনায় ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দেড় বছর আগে বাতিল করে দেন উচ্চ আদালত। আইনের ভাষায় একে কোয়াসমেন্ট বলে। এর অর্থ হল, আসামির বিরুদ্ধে এ মামলা চলতে পারে না। বাতিল করে দেয়া এ রায়ের সার্টিফাইড কপি সম্প্রতি বের হয়েছে। এখন নিয়মানুযায়ী আপিল করার সুযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, শুধু ১৯৯৬ সালেই নয়, ২০০৯ সালেও বিভিন্ন উপায়ে শেয়ারবাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বেক্সিমকো। এ কারণে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টেও সালমান এফ রহমানের ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। কিন্তু সতর্ক হওয়া তো দূরের কথা বরং তাকে পুরস্কৃত করা হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং শেয়ারবাজারে কারসাজিসংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, মূলত বিএসইসির দোষেই মামলা বাতিল হয়েছে। কারণ মামলাগুলোকে বিএসইসিই দুর্বল করে তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, মামলা সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলে আদালতের পক্ষে দোষীদের শাস্তি দেয়াও সম্ভব হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনায় কয়েকটি পক্ষ রয়েছে। পক্ষগুলো হল- আদালত, বিএসইসি, প্রসিকিউশন এবং আইনজীবী। এখানে একটি পক্ষের দুর্বলতা রয়েছে। তবে যার দুর্বলতায়ই এ ঘটনা ঘটুক না কেন, তা দুঃখজনক। এতে সুশাসন থাকে না।

জানতে চাইলে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বুধবার মুঠোফোনে বলেন, বিষয়টি আদালতের ব্যাপার। বিএসইসি আপিল করলে আইন অনুসারে যা হয়, সেটাই হবে। এর বাইরে কোনো বক্তব্য নেই।

জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ওই বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর আমিরুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটি ১৯৯৭ সালের ২৭ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে সালমান এফ রহমানের অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে বিএসইসি।

দুই মামলায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেক্সিমকো ফার্মা ও শাইনপুকুর হোল্ডিংস, ব্যক্তি হিসেবে এএসএফ রহমান, সালমান এফ রহমান ছাড়াও এ বি সিদ্দিকুর রহমান ও ডিএইচ খান (মারা গেছেন) আসামি ছিলেন।

তবে মামলা হলেও অভিযুক্তরা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরে উচ্চ আদালত মামলার বিচার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ আরোপ করলে মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রমও থেমে যায়। ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারবিষয়ক মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর মামলাগুলো বিচারিক কার্যক্রমের জন্য সেখানে স্থানান্তর হয়ে আসে। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরুর আগেই উচ্চ আদালত থেকে মামলা দুটি বাতিল হয়ে যায়।

শাইনপুকুর হোল্ডিংসের মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৬ সালে দুই দফায় শাইনপুকুর হোল্ডিংসের পরিশোধিত মূলধন বাড়িয়ে ২৫২ কোটি টাকা করা হয়। এতে প্রথম দফায় ২৫০ কোটি এবং পরবর্তীতে কোম্পানির নাম অপরিবর্তন করে আরও দুই কোটি টাকা বাড়ানো হয়। নিয়মানুসারে প্রথম দফায় শাইনপুকুর সিরামিকসের ২৫০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের পুরোটাই বিনিয়োগ হওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু তদন্ত কমিটি ১৪৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্য পেয়েছে। আর আমেরিকান এক্সপ্রেস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ১৮ কোটি ২৭ লাখ টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। এই এফডিআরের টাকা বিনিয়োগ হিসাবে ধরা হলেও বিনিয়োগ আসে মাত্র ১৬৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর পরও ঘাটতি থাকে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা।

এই টাকার কোনো হিসাব দিতে পারেননি কোম্পানির উদ্যোক্তারা। ফলে উদ্যোক্তাদের এই অবস্থান যুক্তিসঙ্গত নয়। এরপর নাম পরিবর্তন করে ১২৫টি রাইট শেয়ার ইস্যু করে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন আরও দুই কোটি টাকা বাড়ানো হয়। মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, এ ধরনের কাজ অভিনব এবং অস্বাভাবিক, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অধ্যাদেশের ১৭ ধারার লংঘন।

মামলায় আরও বিবরণে উল্লেখ করা হয়, বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর হোল্ডিংসের শেয়ারে কারসাজি করে বাজার থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সালমান এফ রহমানসহ প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা।

ঘটনায় ১৯৯৬ সালের ৩০ জুন শাইনপুকুর হোল্ডিংসের শেয়ারের দাম ছিল ৭৩ টাকা। এরপর কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারটির দাম বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির পক্ষ থেকে ভুয়া কিছু মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছড়ানো হয়। এতে করে এক মাসের ব্যবধানে ১৯৯৬ সালের ৩১ জুলাই যে শেয়ারটির দাম ছিল ৯৪ টাকা, তা মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে ওই বছরের ২৮ নভেম্বর ৭৫৪ টাকায় উন্নীত হয়।

এ হিসাবে পাঁচ মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ। আলোচ্য সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ৫১ লাখ ৬৬ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ফরেন ডেলিভারি ভার্সেস পেমেন্টের (ডিভিপি) মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি হয়েছে। এর বেশির ভাগ শেয়ার লেনদেন হয়েছে, দোহা সিকিউরিটিজ নামে একটি ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে।

প্রতিষ্ঠানটি ক্রয় করেছে ৭ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার এবং নিজের পোর্টফোলিওতে রাখা শেয়ারসহ বিক্রি করেছে ২৩ লাখ ৭ হাজার শেয়ার। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, কোম্পানিটি বেক্সিমকো গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে এ সময়ে কোম্পানির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অনেক তথ্য গোপন করেন। এরপর শেয়ারের দাম বাড়িয়ে বাজার থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেন।

IFIC Bankএদিকে মামলার অন্যতম আসামি সালমান এফ রহমান বর্তমানে বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা। বিপরীতে মামলার বাদী সরকারের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিয়মানুসারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে বিএসইসির অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। কিন্তু বিএসইসি নিজে শেয়ার কেলেংকারির মামলা করার পরও আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি করেনি।

বিএসইসি’র এ দ্বৈত অবস্থান অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন, বিএসইসি যে কারণে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি দেয়নি, সে কারণেই প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছে করেই বেক্সিমকোর বিরুদ্ধে মামলায় জিততে চায়নি। তা না হলে এত প্রমাণ থাকার পরও এ মামলা মাঝপথে থেমে যাওয়ার কথা নয়।

এ ব্যাপারে ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক খাতের দুটি অঙ্গ মুদ্রা এবং পুঁজিবাজার। এর মধ্যে কেউ এক খাতে লুটপাট করলে অন্য খাতের কোনো কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে অনুমোদন দেয়া উচিত নয়। এটি ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপুর্ণ।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে প্রথমত নীতিনির্ধারকরা ব্যবস্থা নিতে পারেন, দ্বিতীয়ত নৈতিকতা থাকলে উনারা নিজে থেকেই সরে যেতে পারেন। না হলে ব্যাংক খাতেও এ ধরনের কেলেংকারির আশংকা থাকে।

এ ব্যাপারে বিএসইসি কর্মকর্তা সাইফুর রহমান বলেন, সবকিছুতে তাদের দায়ী করা হয়। ভালো করলেও দায়ী, আবার খারাপ করলেও দায়ী। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমরা হাল ছাড়িনি। প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনজীবী পরিবর্তনের ব্যাপারে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে প্রয়োজন হলে আইনজীবী পরিবর্তন করবে কমিশন।

ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ সংক্রান্ত বিএসইসির ক্লিয়ারেন্সের ব্যাপারে তিনি বলেন, বিএসইসির ক্লিয়ারেন্স লাগে কিনা আমার জানা নেই। তবে পরিচালক হওয়ার ব্যাপারে ২ শতাংশ শেয়ার আছে কিনা, সেটি আমরা দেখি। ২ শতাংশ শেয়ার না থাকলেই কেবল আপত্তি দেয়া হয়।

এদিকে ২০০৯ এবং ২০১০ সালেও বিভিন্ন উপায়ে বাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বেক্সিমকো। এর মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মা পূর্ণ রূপান্তরযোগ্য প্রেফারেন্স শেয়ারের মাধ্যমে ৪১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। প্রায় ৭২ টাকা প্রিমিয়ামসহ শাইনপুকুর সিরামিক শেয়ারবাজার থেকে ২৮৬ কোটি ১২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে।

এছাড়াও বেক্সিমকো টেক্সটাইল ৬৩৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং জিএমজি এয়ারলাইন্স প্রতি শেয়ারে ৪০ টাকা প্রিমিয়ামসহ প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। যদিও আইনগতভাবে এর বৈধতা রয়েছে। কিন্তু একটি গ্রুপের এত বেশি টাকা তুলে নেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। কেননা এতে করে পুঁজিবাজারে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এসব কারণেই বারবার পুঁজিবাজারে বিপর্যয় নেমে আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here