রাহেল আহমেদ শানু : ডিশ, টেলিফোন ও ইন্টারনেটের তার পেঁচিয়ে ভয়ঙ্কর জঞ্জাল অবস্থা। ভয়ানক জঞ্জাল এড়াতে রাজধানীর সব এলাকার বিদ্যুতের তার চলে যাবে মাটির নিচে। বিদ্যুতের কোনো খাম্বা থাকবে না। এ জন্য মাটির নিচে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ করার নকশা তৈরি করেছে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)।

২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চলতি অর্থবছরেই অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। রাজধানীজুড়ে মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়তে আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের উদ্যোগ নিচ্ছে ডিপিডিসি ও ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) লিমিটেড।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এরই মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এতে ব্যয় হবে লক্ষাধিক কোটি টাকা। মাটির নিচ দিয়ে ৪০০ কেভি পর্যন্ত বিদ্যুৎ লাইনের নেটওয়ার্ক স্থাপন করা সম্ভব বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

সরকার আশা করছে, ২০২৫ সালের মধ্যে রাজধানীর সব এলাকার বিদ্যুতের তার চলে যাবে মাটির নিচে। বিদ্যুতের কোনো খাম্বা থাকবে না। বাড়ির আনাচে-কানাচে বা ফুটপাতের মাথার ওপরে ঝুলবে না কোনো তার। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃতের সংখ্যা অনেক কমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বেও বড় বড় শহরে বৈদ্যুতিক তার সব মাটির নিচ দিয়ে রয়েছে।

জানতে চাইলে ডিপিডিসি চিফ কোঅর্ডিনেটর কামরুল আজম বলেন, ডিপিডিসির আওতায় খাম্বা ও তার রাস্তার ওপর দিয়ে যাতে না ঝোলে, তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুরের খাম্বা সরিয়ে মাটির তলদেশ দিয়ে কেবল লাইন নেওয়া হবে। অবশিষ্ট এলাকার জন্য আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা উইংয়ের প্রধান আবদুল আহাদ স্টক বাংলাদেশকে বলেন, রাজধানীর বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা পুরোপুরি খাম্বামুক্ত করার পরিকল্পনা সরকারের। এরই মধ্যে একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন, যা দিয়ে রাজধানীর একটি বড় অংশে মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। পাইপলাইনে আরও কয়েকটি প্রকল্প রয়েছে। অর্থায়ন এবং অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা চলছে।

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় খাম্বা ও তারমুক্ত করার কাজ করছে সরকারের আরেকটি সংস্থা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) লিমিটেড। এরই মধ্যে গুলশান ও বনানীতে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে সংস্থাটি। পূর্বাচলেও মাটির নিচে বিদ্যুতের লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। উত্তরা ও বারিধারা অংশের জন্যও প্রকল্প অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।

জানতে চাইলে ডেসকোর সাবেক পরিচালক (প্রকৌশল) মো. শাহ আলম স্টক বাংলাদেশকে বলেন, রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। প্রতি এলাকায় নিয়মিত নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এমন সময় ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক করলে অর্থ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা আছে।

তিনি বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারার ৭৫ শতাংশ পরিকল্পিত ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। এসব জায়গায় মাটির নিচে লাইন নির্মাণ করলে গ্রাহকরা উপকৃত হবে। কিন্তু পূর্বাচল তৃতীয় পর্যায়ে ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণ করলে পরে সমস্যা হবে।

ডিপিডিসির ভূগর্ভস্থ বিদ্যুতের নেটওয়ার্কে অর্থায়ন করবে চীন। প্রকল্পটির ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে কনসেশনাল ঋণ পাওয়া যাবে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ডিপিডিসির নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সরকারি অর্থ দেওয়া হবে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আরও একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে। এর ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুরে ১৩২ কেভি ও ৩৩ কেভি ভূগর্ভস্থ কেবল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। হাতিরঝিলেরও বিতরণ লাইন ভূগর্ভস্থ লাইনে রূপান্তর করা হবে। বিদ্যমান উপকেন্দ্রগুলোকে অটোমেশন এবং কমিউনিকেশন ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন স্ক্যাডা স্থাপন করা হবে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সসহ টেস্টিং ল্যাবরেটরি নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে ডিপিডিসির।

এ ছাড়া উন্মুক্ত হ্যাঙ্গারসংবলিত অত্যাধুনিক মেকানাইজড ওয়্যারহাউস নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে প্রকল্পটিতে। বর্তমানে ডেসকো গুলশান, বনানী ও মিরপুর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এসব এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে সাড়ে চারশ’ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৩৮ কিলোমিটার মাটির নিচে ও ১০৮ কিলোমিটার মাটির ওপরে।

এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ ১১ কেভি লাইন রয়েছে প্রায় পাঁচশ’ কিলোমিটার। ডিপিডিসি রাজধানীর বাকি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে। রাজধানীর উলন থেকে ধানমণ্ডি পরীবাগ পর্যন্ত ১৩২/৩৩ কেভি একটি বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে মাটির নিচে। এ ছাড়া মাটির নিচে বিদ্যুৎ সরবরাহের নেটওয়ার্ক নেই। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির রাজধানীতে ১৩২ কেভি লাইন রয়েছে ২২৮ কিলোমিটার এবং ৩৩ কেভি ৩৬৮ কিলোমিটার। এসব লাইন মাটিন নিচে নিয়ে যাওয়া হবে।

মাটির নিচ দিয়ে ৪০০ কেভি পর্যন্ত বিদ্যুৎ লাইনের নেটওয়ার্ক স্থাপন করা সম্ভব। জাপানের এক-চতুর্থাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশের শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক দিয়ে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আগরতলা শহরে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন মাটির নিচ দিয়ে করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here