রহিমা ফুডের মালিকানা হস্তান্তর

0
855

সিনিয়র রিপোর্টার : রহিমা ফুড করপোরেশন লিমিটেডের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সব শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তরের মতো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানির পাশাপাশি দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধেই এ অভিযোগ করছেন বিনিয়োগকারীরা। পর্ষদ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত পরের কার্যদিবসে জানতে পারেননি তারা।

জানা যায়, রহিমা ফুড করপোরেশনের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সব শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত হয় ১৬ অক্টোবর। সেদিন বিকাল সাড়ে ৪টায় অনুষ্ঠিত বোর্ডসভায় কোম্পানির আটজন উদ্যোক্তা-পরিচালকের সব শেয়ার সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়। কোম্পানি দাবি করছে, গুরুত্বপূর্ণ এ মূল্যসংবেদনশীল তথ্যটি সিদ্ধান্ত নেয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) ফ্যাক্স ও ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরদিন লোক মারফত মূল্যসংবেদনশীল তথ্যটির কাগুজে নথিও পাঠানো হয়েছে। তবে পরদিন (১৭ অক্টোবর) ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ তা প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা যথাসময়ে মূল্যসংবেদনশীল তথ্য পাননি।

রহিমা ফুড করপোরেশনের শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তর বিষয়ে নানা গুজবের কারণে গত দুই কার্যদিবসে শেয়ারটির দর প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। দুই বছর ধরে লোকসানে থাকা রহিমা ফুডের শেয়ার মঙ্গলবার ৭২ টাকা ২০ পয়সায় হাতবদল হয়েছে। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার কিনছে দেশের ভোজ্যতেল পরিশোধন, বিপণন ও বাজারজাতকরণে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

গত রোববার এ-সংক্রান্ত তথ্য কোম্পানির ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর থেকেই রহিমা ফুডের শেয়ার সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হচ্ছে।

শুধু স্টক এক্সচেঞ্জ নয়, রহিমা ফুড করপোরেশনও মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নিয়ে লুকোচুরি খেলেছে বলে অভিযোগ করছেন বিনিয়োগকারীরা। গত সপ্তাহে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা হস্তান্তর নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব রটে শেয়ারবাজারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নোটিসের জবাবে ১৩ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রহিমা ফুড জানায়, শেয়ারদর বাড়াতে পারে— এমন কোনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্য তাদের হাতে নেই এবং মালিকানা হস্তান্তরের খবরটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন।

যদিও পরের কার্যদিবসে কোম্পানির বোর্ডসভায় উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ারের সম্পূর্ণ মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মাত্র এক কার্যদিবসে মালিকানা হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে, এমনটি বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে করছেন স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারাও।

এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান বলেন, আমরা কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি। কারণ গত বৃহস্পতিবারই কোম্পানিটি জানিয়েছে যে, মালিকানা হস্তান্তর কিংবা শেয়ারদর বৃদ্ধির মতো মূল্যসংবেদনশীল কোনো তথ্য নেই। অথচ পরের কার্যদিবসেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে।

এদিকে স্টক এক্সচেঞ্জ নির্ধারিত সময়ে শুধু মূল্যসংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে ব্যর্থই নয় বরং ১৭ অক্টোবর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ তাদের ওয়েবসাইটে পূরনো মূল্যসংবেদনশীল তথ্যটি আবার প্রকাশ করে। সেখানে মালিকানা হস্তান্তরে তথ্যটি ভিত্তিহীন বলে কোম্পানির আগের তথ্যই পুনঃপ্রচার করা হয়। এতে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। আর এ সুযোগে কিছু বিনিয়োগকারী রহিমা ফুডের শেয়ার কিনে নেন।

এ বিষয়ে রহিমা ফুড করপোরেশনের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শহিদুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির বিষয়ে বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত নেয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যেই আইন অনুযায়ী ডিএসই, সিএসই ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) পাঠিয়েছি। আমাদের কাছে এর প্রমাণও রয়েছে।

তিনি বলেন, কোম্পানির ওয়েবসাইটেও সেদিন বিকাল ৫টা ২০ মিনিটে তথ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে। এখন স্টক এক্সচেঞ্জ যদি তথ্য প্রকাশে বিলম্ব করে, তাহলে আমাদের কী করার আছে। শুধু এ ঘটনাই নয়, এর আগে ৯ অক্টোবর মালিকানা হস্তান্তরের কোনো তথ্য নেই বলে ডিএসইকে জানালেও স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ ১৩ অক্টোবর প্রকাশ করেছে।

সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, আমরা কোম্পানির ফ্যাক্স কপি পাইনি, তবে মেইল পেয়েছি। আর মঙ্গলবার কুরিয়ারের মাধ্যমে তথ্যটি জানতে পেরে আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছি।

প্রসঙ্গত, ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অংকের বকেয়া আটকে যাওয়ায় সংকটে পড়ে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী রহিমা ফুড করপোরেশন। এতে ২০১৪ সাল থেকে কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ থাকে। এছাড়া ব্যাংকঋণ নিয়েও বিপাকে পড়ে কোম্পানিটি। এ অবস্থায় সিটি গ্রুপের কাছে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সব শেয়ার (১ কোটি ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৮৭০টি শেয়ার) বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা অংশের শেয়ার কিনে নিলে রহিমা ফুড আবার সচল হবে, এমন আশায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারটিতে ঝোঁক বাড়িয়েছেন। কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে।

বর্তমানে কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অব্যাহত লোকসানের কারণে গত দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি কোম্পানিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here