সুদিন এসেছে সিমেন্ট খাতে

0
2078

ডেস্ক রিপোর্ট : আবাসন খাতে গতি না থাকলেও বাড়তি গ্রামীণ চাহিদা ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে ভর করে সুদিন এসেছে দেশের সিমেন্ট খাতে। চাহিদা ভালো থাকায় সিমেন্ট খাতের বেশির ভাগ কারখানা এখন তাদের উৎপাদনক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করতে পারছে। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ বাজারকে মাথায় রেখে তারা বড় ধরনের সম্প্রসারণেও যাচ্ছে।

এ খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদনক্ষমতার সম্প্রসারণে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কাজ বছর দুয়েকের মধ্যে শেষ হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ হবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে সিমেন্ট উৎপাদনক্ষমতা এখনকার চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়বে।

বর্তমানে দেশে উৎপাদনে আছে ৩৪টি সিমেন্ট কারখানা। এদের মোট উৎপাদনক্ষমতা বছরে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টন। সিমেন্ট উৎপাদকদের সমিতির তথ্যমতে, এখন বছরে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ টন সিমেন্ট উৎপাদিত হচ্ছে। এতে ব্যবহৃত হচ্ছে কারখানাগুলোর উৎপাদনক্ষমতার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল খালেক বলেন, এখন যে উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে, তা-ই সর্বোচ্চ। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব, যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বাকি উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে বাড়তি চাহিদা পূরণে বেশির ভাগ কারখানা সম্প্রসারণে যাচ্ছে।

চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো সিমেন্টের মাথাপিছু ব্যবহার অনেক কম। কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন বছরে মাথাপিছু ১১৫ কেজি সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়। চীনে তা ১ হাজার ৭০০ কেজি, মালয়েশিয়ায় ৭০০ কেজি ও ভারতে ২৩০ কেজি। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, বাংলাদেশে যেহেতু সিমেন্টের ব্যবহার অনেক কম, সেহেতু এখানে বাজার সম্প্রসারণের অনেক সুযোগ আছে।

বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের পরিচালক মাসুদ খান বলেন, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির সঙ্গে সিমেন্টের চাহিদা বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক রয়েছে। তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিমেন্টের চাহিদাও বাড়বে।

মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশে সিমেন্টের যে ব্যবহার, তার ৬০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় গ্রাম পর্যায়ে ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণের কাজে। তবে ভবিষ্যতে দেশের বড় শহরে যোগাযোগ অবকাঠামো বাড়বে। তাই আগামী কয়েক বছরে সিমেন্টের চাহিদা বাড়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

বাজার কার কতটুকু: সিমেন্টের বড় উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে ১০টি বড় কোম্পানির। বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশই তাদের দখলে। ২০১৫ সালে কোন কোম্পানির কতটুকু বাজার ছিল, তার একটি চিত্র পাওয়া যায় একটি সিমেন্ট কোম্পানির বাজার সমীক্ষা থেকে।

ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় শাহ সিমেন্ট। তাদের দখলে বাজারের ১৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এ ছাড়া বসুন্ধরা প্রায় ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ, সেভেন সার্কেল ৮ দশমিক ১১ শতাংশ, হাইডেলবার্গ ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, লাফার্জ সুরমা ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, এম আই ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, প্রিমিয়ার ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ফ্রেশ ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ, হোলসিম ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ, আকিজ সিমেন্ট ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ ও অন্যান্য কোম্পানি বাকি ২৬ দশমিক ১১ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে।

এদিকে মোট বাজারের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ দেশীয় উদ্যোক্তাদের দখলে। বাকি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাজার এ দেশে বিনিয়োগকারী বিদেশি পাঁচটি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সম্প্রসারণে যারা: বড় কারখানাগুলোর প্রায় সবাই উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে। কেউ উৎপাদনক্ষমতা ৬০ শতাংশ, আবার কেউ কেউ তিন গুণ করছে। সিমেন্ট উৎপাদকদের সমিতি সূত্রে জানা গেছে, শাহ, বসুন্ধরা, এম আই, ডায়মন্ড, আকিজ, সেভেন সার্কেল, অ্যাংকর, প্রিমিয়ার, আমান সিমেন্টসহ আরও কয়েকটি উৎপাদক তাদের উৎপাদনক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে।

এসব কারখানার মধ্যে কেউ কেউ ইতিমধ্যে উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়েছে। কেউ কেউ বাড়ানোর কাজ করছে। সব মিলিয়ে এসব আগামী দুই বছরের মধ্যে এখনকার চেয়ে উৎপাদনক্ষমতা ৫০ শতাংশ বাড়বে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

দাম কমেছে ১০ শতাংশ: সিমেন্ট ক্রেতাদের সুসময় গেছে গত দুই বছর। এ সময়ে দেশে সিমেন্টের দাম বাড়েনি, বরং কমেছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের। বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির সিমেন্ট ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকার মধ্যে মিলছে। তা দুই বছর আগে ৪৬০ টাকার আশপাশে ছিল। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম কমায় আগের চেয়ে সিমেন্টের দাম এখন প্রায় ১০ শতাংশ কম।

রপ্তানির সুযোগ আছে, তবে ধরা যাচ্ছে না: বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য, মিয়ানমার ও নেপালে সিমেন্ট রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ আছে। তবে যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাব ও নানা শুল্ক-অশুল্ক বাধায় তা ধরা যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানে পণ্যের অবাধ যাতায়াত সম্ভব হলে বাংলাদেশের সিমেন্ট রপ্তানি বাড়তে পারে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১৭ লাখ ১২ হাজার ডলারের সিমেন্ট রপ্তানি হয়েছে। এর আগের বছর তা ছিল ৩৯ লাখ ৪৪ হাজার ডলার। এসব সিমেন্ট মিয়ানমার, ভারত ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়েছে।

সিমেন্ট রপ্তানিকারকেরা জানান, নেপালে সিমেন্ট রপ্তানি করা যাচ্ছে না, কারণ বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের কাঁকরভিটা পর্যন্ত যেতে দুই দফা পণ্য ওঠাতে-নামাতে হয়। কারণ, বাংলাদেশের ট্রাক সরাসরি নেপাল যেতে পারে না। এতে খরচ বেড়ে যায়।

এদিকে মিয়ানমারে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রক্রিয়া এখনো আনুষ্ঠানিক হয়নি বলে সেখানকার বাজারেও বেশি পরিমাণে সিমেন্ট পাঠানো যাচ্ছে না বলেও দাবি করেন উদ্যোক্তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here