পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় ‘পুঁজি বণ্টন কৌশল’

0
2949

পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি ধাপ হল পুঁজি বণ্টন (asset allocation)। যথাযথ ষ্টক বাছাই ও পূঁজির সুষম বণ্টন বিবিয়োগকারী হিসেবে পুজিবাজারে আপনার দীর্ঘ মেয়াদী অবস্থান নিশ্চিত করবে।

পূঁজিবাজার দ্রুত মুনাফা অর্জনের স্থান নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা প্রাপ্তিই পূঁজিবাজারে বিনিয়োগ করার আসল উদ্দেশ্য। পূঁজি রক্ষা ও মুনাফার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করণে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর জন্য পূঁজি বণ্টন কৌশল অনুসরণ করা অত্যাবশ্যকীয়।

বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রথম ধাপ : আপনি ভবিষ্যৎ আর্থিক লক্ষ্য, ঝুঁকি সহনশীলতা এবং কত সময়ের জন্য বিনিয়োগ করবেন তার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় মুনাফার হার (required rate of return) নির্ধারণ করবেন।

দ্বিতীয় ধাপ : পুঁজিবাজারের সম্ভবনা এবং প্রত্যাশিত রিটার্ন নিরূপণ করুণ। একই সাথে অন্যান্য সম্পদ শ্রেণী (asset class) থেকে প্রাপ্য মুনাফা ও ঝুঁকির হার পূর্বানুমান করুন।

সাধারণভাবে সম্পদকে দুইটি ক্লাস/ভাগে ভাগ করা যায়- (১) প্রচলিত সম্পদ শ্রেণী ( যেমন: স্টক, বন্ড এবং নগদ অর্থ) এবং (২) বিকল্প সম্পদ শ্রেণী (যেমন : মিউচুয়াল ফান্ড, পণ্যদ্রব্য, ভূমি-ঘরবাড়ি (রিয়েল এস্টেট), প্রাইভেট ইকুইটি, হেজ ফান্ড ইত্যাদি)।

তৃতীয় ধাপ : পুঁজি বণ্টনের প্রথম ধাপে ঠিক করতে হবে আর্থিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য। আপনার ঝুঁকি গ্রহণের ইচ্ছা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে পূঁজি বণ্টন কৌশল গড়ে উঠবে। আপনার পূঁজি, কোন সম্পদ শ্রণীতে কতটুকু পরিমাণে বিনিয়োগ করা হবে তা-ই নির্ধারিত হবে এই ধাপে।

চরিত্রগত ভেবে প্রতিটি সম্পদ শ্রেণীর ঝুঁকি ও মুনাফার মাত্রায় তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কম ঝুঁকি গ্রহণে অল্প মুনাফা এবং বেশী ঝুঁকি গ্রহণে অধিক মুনাফা। মুনাফা ও ঝুঁকি বৈচিত্র্যতার সর্বোচ্চ সুবিধা নেয়ার জন্যই পূঁজি বণ্টন কৌশল প্রয়োজনীয়।

উদাহরণস্বরূপ- পোর্টফোলিও-১ (২০% স্টক, ৮০% বন্ড/এফডিয়ার), পোর্টফোলিও-২ (৮০% স্টক, ২০% বন্ড/এফডিয়ার)।

পোর্টফোলিও-২ এর তুলনায় পোর্টফোলিও-১ এর ঝুঁকি ও মুনাফা উভয়ই কম। কিন্তু পোর্টফোলিও-১ নিয়মিতভাবে অধিক নগদ অর্থ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয়। লক্ষণীয় যে, পোর্টফোলিও-২ একটি অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ পোর্টফোলিও। এটি এক জন ২৫/৩০ বছর বয়সী বিনিয়োগকারীর জন্য উপযোগী।

কারণ তার পক্ষে স্টক মার্কেটের উঠা-নামা সহ্য করে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করা সম্ভব। কর্মক্ষম হওয়ায় তার নগদ অর্থপ্রাপ্তির বিকল্প উৎস (চাকরি, ব্যবসা) রয়েছে। তাই স্বল্প সময়ে নগদ প্রাপ্তির চাইতে সর্বোচ্চ পরিমাণ মুনাফা অর্জন তরুণ বিনিয়োগকারীদের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, পোর্টফোলিও-১ মধ্য বয়সী অথবা পৌঢ় বিনিয়োগকারীরদের জন্য উপযোগী। যিনি অবসরের কাছাকাছি অথবা জীবনের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন তার পক্ষে পূঁজিবাজারের বড় পতন সহ্য করা প্রায় আসম্ভব। অনেক বেশী মুনাফা অর্জনের চাইতে ঝুঁকিমুক্ত উপায়ে কম মুনাফায় নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তি তার জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

কেন পুজি বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ?

পুঁজি বণ্টন কৌশল অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল এটি বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনে (investment diversification)। বিভিন্ন শ্রেণীর সম্পদের সংমিশ্রণে বিনিয়োগকারী তার পোর্টফোলিও ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারেন। যদিও বেশির ভাগ মানুষ এই ধারণা বুঝতে চায় না, তারা সব সময় সর্বাধীক রিটার্ন দেয়া সম্পদেই বিনিয়োগ করতে চান। যা প্রকারন্তরে ব্যার্থতা ডেকে আনে।

উদাহরণ স্বরূপ- বিনিয়োগকারী-১ তার পোর্টফলিওতে ৫০% ষ্টক ও ৫০% বন্ড/এফডিয়ার ধারণ করেন। অপরদিকে বিনিয়োগকারী-২ তার পোর্টফলিওতে শুধু ষ্টক ( ১০০%) ধারণ করেন।

প্রথম বছর পূঁজিবাজার ১০% ও ব্যাংক ৬% রিটার্ন দিয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বছর পূঁজিবাজার -৫% ও ব্যাংক ৬% রিটার্ন দেয়ায় দুই বছর পর বিনিয়োগকারী-১ তার প্রতিযোগীর তুলনায় অধিক মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। মূলত উচ্চ ঝুঁকির ষ্টক ও নিম্ন ঝুঁকির এফডিয়ারে পুঁজির সুষম বন্টন কৌশলই বিনিয়োগকারী-১ এর সাফল্যের মূল রহস্য।

বিনিয়োগকারী-১ [১ম বছর-(১০+৬)/২= ৮, ২য় বছর- (৬-৫)/২= ০.৫। ২ বছর পর মোট রিটার্ন ৮.৫%] বিনিয়োগকারী-২ [১ম বছর-১০, ২য় বছর- (-৫)। ২ বছর পর মোট রিটার্ন মোট ৫%]

বিভিন্ন প্রকার পুঁজি বণ্টন কৌশল : বিনিয়োগের সময় এবং ঝুঁকি সহনশীলতা বিবেচনা করে সম্পদের আদর্শ মিশ্রন তথা অনুপাত নির্ধারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল কাজ। এই অনুপাত ব্যাক্তি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে। বিনিয়োগের জন্য যার দীর্ঘ সময় এবং উচ্চ ঝুঁকি সহনশীলতা রয়েছে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্টক মার্কেটের জন্য অধিক পূঁজি বরাদ্দ করবেন।

পোর্টফোলিওতে স্টক কত টুকু ধারণ করা উচিত তার একটি প্রাচীন নিয়ম (traditional rule of thumb) রয়েছে। বলা হয়ে থাকে- ‘১০০ থেকে আপনার বয়স বাদ দিলে যা থাকে ততটুকু পূঁজি ষ্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করা শ্রেয়’।

যদি আপনার বয়স ২৫ এবং মোট পূঁজি ১০ লাখ টাকা হয়, তবে পোর্টফোলিওতে (১০০-২৫)=৭৫% স্টক মার্কেট ও বাকি ২৫% ব্যাংক এফডিয়ার থাকা উচিত। অর্থাৎ ১০ লক্ষ টাকা থেকে ৭.৫ লক্ষ পূঁজিবাজারে ও ২.৫ লক্ষ ব্যাংকে রাখা উচিত। তবে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই নিয়মকে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত রক্ষণশীল পূঁজি বণ্টন কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

  • লেখক : মোহাম্মদ হাসান শাহারিয়ার

(বাকি অংশ আগামীতে প্রকাশ করা হবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here