উড়ন্ত অর্থনীতি অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড়ের কবলে!

0
464

বীভৎস জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ঝড়ো হাওয়ার প্রেক্ষাপটে আমাদের অর্থনীতির ধারা-প্রকৃতির পর্যালোচনা ও কিছু করণীয় পদক্ষেপ বর্ণনা করতে চাই। অভূতপূর্ব গতিতে এগোচ্ছিল বাংলাদেশ। ‘২০১৬ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রবৃদ্ধির দেশ। এ বছরটিতে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে যাবে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হারকেও। নতুন বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদন প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ [জুনে বাংলাদেশের প্রাক্কলিত হিসাবে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ]।

D. Samsul Alam
ড. শামসুল আলম

৭ দশমিক ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে ইরাক থাকবে তালিকার শীর্ষে। ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।’ আইএমএফের দেয়া তথ্য ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন মানি, প্রবৃদ্ধি ও আকারের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সে তালিকার তৃতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ (১ জানুয়ারি ২০১৬, প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠা)।

জুনে আর্থিক বছর শেষ হলো। সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ১০ শতাংশ, সেবা খাতে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কৃষিতে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা স্বাধীনতা উত্তরকালে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪ শত ৬৬ ডলার, যা ২০০৫-০৬ এ ছিল ৫৪৩ ডলার। গত মে মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশে এবং খাদ্যপণ্যগুলোর গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০০০ সালের পর এত নিম্ন মূল্যস্ফীতি আর কখনো ছিল না।

সাধারণ মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতি বা খাদ্যদ্রব্যাদির দরদাম ‘সবচেয়ে বড়’ বিবেচ্য বিষয়। রাষ্ট্রের চলতি অ্যাকাউন্টে আমদানি-রফতানি ও বিদেশ থেকে প্রাপ্ত আয়ের প্রতিফলন ঘটে। স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোয় চলতি অ্যাকাউন্ট বরাবর থাকে ঋণাত্মক। এপ্রিল শেষে বাংলাদেশের চলতি অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত ছিল ৩ বিলিয়ন ১৩৭ মিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ বাইরের দেশের সঙ্গে লেনদেনে ব্যয়ের চেয়ে আমাদের আয় হয়েছে বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ আমাদের অর্থনীতির সেই সামর্থ্যের পরিচয় বহন করে। ২৯ জুন ২০১৬তে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ ৩০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এ আয় নয় মাসের আমদানি ব্যয়। গত মে পর্যন্ত আমাদের রফতানি আয় হয়েছে ৩০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশ) ও আমদানি হয়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২ শতাংশ)। মানে রফতানি আয় বাড়ছে দ্রুত, যা দেশজ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সজীবতার পরিচায়ক। অথচ গত আর্থিক বছরে ভারতের রফতানি আয় কমেছে ২২ শতাংশ।

বিদেশীরা আমাদের দেশে যত বিনিয়োগ করবে (এফডিআই), তত কর্মসংস্থান তৈরি হবে, উন্নত প্রযুক্তি আসবে, রফতানি আয় বাড়বে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এফডিআই এসেছিল ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত আর্থিক বছরের মার্চ পর্যন্ত বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ১ বিলিয়ন ৬ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বিনিয়োগে বেশি এসেছে। মে পর্যন্ত আর্থিক অনুদান ও ঋণ ছাড় হয়েছে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৫-০৬ অর্থবছরে ছিল ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। ঋণ অনুদান, এফডিআই দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়া দেশের অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক মহলের ক্রমাগত আস্থাশীলতার ইঙ্গিতবাহী।

যদিও দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে মিলিয়ে সরকারি ঋণগ্রস্ততা ছিল ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশজ আয়ের ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নেমে এসেছে দেশজ আয়ের ৩৫ শতাংশে। ঋণগ্রস্ততা কমে আসা সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধির প্রমাণবাহী। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের প্রবাসী আয় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়নে। গত অর্থবছরের অর্জনও হবে প্রায় ওই পরিমাণ বা তার কাছাকাছি। দেশ এখন চাল উদ্বৃত্ত। শাকসবজি ও ফল উত্পাদন চাহিদাকে মেটাতে পারছে। গম, ভুট্টার উত্পাদন ব্যাপক বেড়েছে।

সামাজিক ক্ষেত্রেও বিস্ময়কর অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ে শুধু জেন্ডার সমতা নয় বরং ছাত্রী ভর্তির হার ছাত্রদের চেয়ে বেশি। বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রী সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী সংখ্যা ৪৭ শতাংশ এবং ছাত্র সংখ্যা ৫৩ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় জেন্ডার সমতা তো অর্জিত হবেই, কোনো কোনোটিতে ছাত্রী সংখ্যা হবে বেশি।

২০০০ সালে ৪৮ শতাংশ দারিদ্র্যের হার ২০১৬তে নেমে এসেছে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে। প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির সঙ্গে ২০০৯-১০ থেকে দারিদ্র্যের হারও দ্রুত কমছে। মাতৃমৃত্যুর হার, শিশুমৃত্যুর হার, শিশু অপুষ্টির হার ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি কমেছে বাংলাদেশে, সুপেয় পানি প্রাপ্তির অভিগম্যতা রয়েছে ৯০ শতাংশ পরিবারে, রোগ-প্রতিরোধ টিকা গ্রহণের হার প্রায় সার্বজনীন। গত সাত বছরে বিদ্যুত্ সংযুক্তি বেড়েছে দ্রুত হারে। ৭৬ শতাংশ পরিবার এখন বিদ্যুত্ সংযুক্তির আওতায়, ২০১৯-২০ এর মধ্যে বিদ্যুত্ সংযুক্তির আওতায় আসবে ৯২ শতাংশ পরিবার।

বিদ্যুৎ ও গ্রামে গ্রামে সড়ক সংযুক্তির ব্যাপক বিকাশে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর অকৃষিজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ৮৭ শতাংশ কৃষিনির্ভর পরিবারও অকৃষিজ আয় অর্জনে এখন যুক্ত। কৃষি শ্রমের মজুরি বেড়ে কৃষি শ্রমিকদেরও জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। শহরে এবং গ্রাম্য জীবনের খাদ্য-খাবার, পোশাক-পরিচ্ছদে, জীবনাচারে এখন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। আয় বৃদ্ধির কারণে গ্রামে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন শহর থেকে গ্রামীণ এলাকায় বরং খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি। এ পর্যায়ে বাংলাদেশের গ্রামগুলো শহর হয়ে উঠছে দ্রুত।

২০১৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক শান্তি অবস্থা বিরাজ করায় অর্থনীতি আরো দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রফতানি বৃদ্ধি ছাড়াও প্রবাসী শ্রমিক প্রেরণ ২০১৬তে এসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ অর্থবছরে বিদেশে শ্রমিক গিয়েছেন ৪ লাখ ৬১ হাজার ৮২৯ জন, ২০১৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৫৩৭। সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটায় আশা করা হচ্ছে, প্রবাসী শ্রমিক প্রেরণের হার আরো বৃদ্ধি পাবে।

২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্যে দেখা যায়, ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ জুলাই-মার্চ ২০১৫-এর তুলনায় ১৫ দশমিক ২ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, যে হার আগের বছর ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ ২০১৬তে এসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তেজিভাব প্রমাণ করে। দেশজ আয়ের তুলনায় অর্থনীতিতে ২০১৫-১৬তে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ২৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। মার্কিন ডলারে ২০১৪-১৫তে অর্থনীতিতে মোট বিনিয়োগ হয়েছিল ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরে হয়েছে ৪২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।

২০১৩-১৪তে দেশে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৬ বিলিয়ন ডলার।এতে স্পষ্ট যে, দেশে মোট বিনিযোগ বৃদ্ধিতে গতিশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে। সার্বিকভাবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রসরতা অভূতপূর্ব এই উড়ন্ত সময়ে ১ জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজানে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ অর্থনীতির জন্য বড় আঘাত বা ঝড়ঝাপটার ইঙ্গিতবাহী বলে নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। পরিকল্পিত এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞ (যেখানে বেশির ভাগ বিদেশী, যাঁরা ইতালীয়, জাপানি, আমেরিকান ও ভারতীয়) কীসের বার্তা দিয়ে যায়?

৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্তে প্রবেশ করে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির সোপানে ঐতিহাসিক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ যখন অতিক্রম করছে, দেশে এবং বহির্দেশে জাতি হিসেবে এ উত্তরণ অনেকেই মেনে নিতে পারছে না। বাংলাদেশের রক্তাক্ত জন্ম ইতিহাস যারা অবহিত, তাদের এ কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। একাত্তরে যারা পরাস্ত, যুদ্ধ অপরাধ যারা স্বীকার করে না, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, বিকৃত উপস্থাপনায় নতুন জাতীয়তার তত্ত্ব নিয়ে যারা বিকল্প ক্ষমতা বলয় তৈরিতে সচেষ্ট, উড়ন্ত এই বাংলাদেশ তাদের বিশ্বাস ও তত্ত্ব অসার, অনৈতিহাসিক প্রতিভাত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হবে।

বলা যায়, তাদের মদদে, সমর্থনে ১ জুলাইয়ের এ মরণ কামড় এবং এও হয়তো শেষ নয়। এ কারণেই স্বাধীনতাকামী, পরিবর্তনে বিশ্বাসী জাতিসত্তার জন্য এও এক নতুন চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জটি হলো প্রবৃদ্ধির উজ্জীবিত ধারাকে বহমান রাখা। যতটা সম্ভব এ নেতিবাচক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিঘাত শূন্যের পর্যায়ে রাখা। পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে, কূটনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদ দমনে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা। আশার কথা যে, সরকার ও জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ‘শূন্য’ সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করেছে। প্রবৃদ্ধির ধারাকে উজ্জীবিত রাখতে হলে অর্থনীতির কুশীলবদের (উত্পাদক, ভোক্তা, ব্যবসায়ী) ক্রিয়াকর্মে যেন কোনো পর্যায়েই শিথিলতা না আসে— প্রয়োজন হবে এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ কারণে বাজার প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করাও হবে অর্থনীতিতে জনসম্পৃক্ততার প্রধান উপায়।

বাজার ব্যবস্থার কর্মসম্পাদনে ‘আস্থা’ সব কুশীলব (actors) পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। আমাদের দেশে প্রবৃদ্ধির গতিশীলতাকে অব্যাহত রাখাই হবে অন্যতম অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। নাগরিকদের ক্রমাগত আয় বৃদ্ধি, দেশের সর্বত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নয়ন, দেশে-বিদেশে চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় সেবা খাতে বিশেষভাবে রেস্তোরাঁ, শপিংমল, পর্যটনে গত কয়েক বছরে একটা উজ্জীবন ঘটেছিল। এ ধারা অব্যাহত রাখতে নিরাপত্তাবোধ ও আস্থা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ভোক্তা ও বিপণনকারীদের নিরাপত্তা সহায়তা দিতে জনবল বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য যত সম্ভব বাড়াতে হবে।

দেশজ আয়ে সেবা খাতের অবদান মাত্র ৫৪ শতাংশ, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে অন্তত তা ৬৫ শতাংশে ক্রমান্বয়ে উন্নীত করতে হবে। এ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ছাড়া শুধু শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দিয়ে মোট প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়া তো নয়ই, ৭ শতাংশের ঘরে ধরে রাখাও কঠিন হবে। উন্নয়ন অগ্রগতির ধারায় ‘চিরায়ত সত্য’ হিসেবে দেশজ আয়ে কৃষি খাতের মোট অবদান কমতেই থাকবে, যা বর্তমানে ১৫ শতাংশ। শিল্প খাতে গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ১০ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধির হার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে হতে হবে গড় বার্ষিক ১১ শতাংশ। ব্যক্তিখাতকে ব্যাপক সুযোগ দেয়া ছাড়া শিল্প তথা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে এ অর্জন অসম্ভব হবে। সরকারকে দিয়ে শিল্পায়ন এ যুগে অচল ধারণা।

প্রমাণিত যে, সরকারকে দিয়ে শিল্পায়ন লাভজনক অতীতেও হয়নি, এখন আরো হবে না ব্যক্তিখাত তাড়িত এ বিশ্বায়নের যুগে। সরকার উত্পাদিত যেকোনো বিপণন পণ্য ব্যক্তিখাতের চেয়ে ব্যয়বহুল হবে (স্মরণ করা যায় আমাদের চিনি শিল্প)। আদমজী পাটকল নিয়ে এখনো কোনো কোনো শ্রমিক নেতাকেই হা-হুতাশ প্রকাশ করতে দেখি। আদমজী জুট মিলস বন্ধ করে দেয়ার পর সেখানকার জমি প্লট আকারে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দেয়ার পর সেখান থেকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হচ্ছে বছরে। এগুলোতে প্রায় এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং এ কর্মসংস্থান প্রতি বছর বাড়ছে (আদমজী মিলে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত শ্রমিক ছিল ২৭ হাজার আর ‘ছুটা’ শ্রমিক ছিল তালিকাভুক্ত নয় হাজার)।

বিদেশ থেকে রফতানি আয় ও কয়েক গুণ বেশি শ্রমিক নিয়োগ সম্ভব হয়েছে আদমজী মিলের জায়গার যথাযথ ব্যবহারের কারণে। আমাদের জাতীয় জীবনের এ সন্ধিক্ষণে (juncture) বলতেই হচ্ছে, আমাদের উচিত হবে লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানা, যার অনেকগুলোই এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি লিজ কিংবা বিক্রি করে দিয়ে সেখানে ব্যক্তিখাতের অন্য শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়তে সহায়তা করা। ব্যাংক খাতের জন্যও বলা যায়, বিআইবিএমের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালে রফতানি বাণিজ্যের ৮৬ শতাংশ সম্পাদিত হয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ। ইদানীং কালের ব্যাংক স্ক্যান্ডালগুলো সংঘটিত হয়েছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোতেই।

সর্বাধিক নন-পারফর্মিং ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয়। সেখানে প্রতি বছর জনগণের করের টাকায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার পুঁজি পুনর্ভরণ করতে হচ্ছে। দু-একটি ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত রেখে বাকিগুলো থেকে কীভাবে ভার মুক্ত হওয়া যায়, এটিও আজ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। অর্থনীতির গতিশীলতা উজ্জীবিত রাখতে কিংবা আরো সোচ্চার করতে এ ইস্যুগুলো প্রাথমিক প্রাধান্যের বিষয়। অর্থনীতিতে উত্পাদক ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে বাজার ব্যবস্থার সুযোগ নেয়া ছাড়া আর কোনো দক্ষ বিকল্প নেই।

নব্বই-উত্তরকালে সেই যে তিন দশকের ঘুরপাক খাওয়া ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হারের ফাঁদ ভেঙে আজকে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করতে পেরেছি, সে শুধু ক্রমান্বয়ে বাজার ব্যবস্থাকে প্রসারিত করে, উৎপাদক ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে। কমিউনিস্ট চীন ও ভিয়েতনাম প্রবৃদ্ধি বিপ্লব ঘটিয়েছে ব্যক্তিখাত ও বাজার উন্মুক্ত করে দিয়েই। অর্থনীতিবিদরা একে এখন ব্র্যান্ডিং করেছে ‘লাল পুঁজিবাদ’ হিসেবে। আসলে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোও আজ ‘বাজার অর্থনীতিকে’ উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাজারকে এবং ব্যক্তিখাতকে ব্যবহারের অপরিসীম সুযোগ তো এখনো আমাদের রয়েছে।

বাজার সহায়ক সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ছাড়াও অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও সবিশেষ গুরুত্ব অর্থনীতিবিদরা দিয়ে আসছেন। প্রবৃদ্ধির ওপর সরকারি উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের প্রভাব অনেক বেশি। কারণ শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সেবা খাতে উপযোগিতা সৃষ্টি করা ছাড়াও সরকারি উন্নয়ন ব্যয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ ভৌত অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করে। প্রকল্প ব্যয়ে সাফল্য পেতে, পরিকল্পিত প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন ও গুণগত মানসম্পন্ন বাস্তবায়ন কেবল অর্থ ব্যয়ের সঠিক মূল্যই দেয় না, অর্থের অপব্যয় হ্রাস করে।

আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন সময় ও ব্যয় গড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়, যার অর্থ পরিকল্পিত ব্যয়ের সাফল্যের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়। এ অর্থ অপচয় দ্রুত কমিয়ে আনার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন সহযোগীসহ দেশের সচেতন নাগরিক শ্রেণী। এ বিষয়ে সরকার সচেতন আছে এবং বড় প্রকল্পগুলোর ফাস্ট ট্র্যাক মনিটরিংসহ প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন নীতি কৌশল (যেমন— এক পরিচালক এক প্রকল্প, দুবারের বেশি প্রকল্পের সংশোধনী গ্রহণ না করা ইত্যাদি) গ্রহণ করছে। প্রকল্পগুলোর পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম আরো জোরদারকরণ এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা এবং সুপারিশ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়গুলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক পর্যায়ের বেশকিছু প্রকল্প আছে, যেগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে কিংবা একবার নেয়া হলেও বাস্তবায়ন হয় না। যেমন— টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়ক প্রশস্ত করার জন্য পাঁচ বছর আগে তিন বছর মেয়াদি ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প নিলেও তিন বছরে কোনো টাকা খরচ করা হয়নি। ২০১৭ পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করে ২০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প গ্রহণ করার পরও দুই বছর পেরিয়ে গেছে, যেখানে ১ টাকাও খরচ হয়নি। পশুর নদের চ্যানেল ড্রেজিং করার জন্য ২০০৬ সালে ৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের বয়স ১০ বছর পেরিয়ে গেছে, সাকল্যে খরচ হয়েছে মাত্র ৩ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত বাস্তবায়নের হার মাত্র দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ।

সম্প্রতি আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে থাকা ৪১ প্রকল্পের মধ্যে ১ টাকাও খরচ করা হয়নি। এসবই পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য। যে বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, তা হলো প্রকল্প প্রণয়ন, বাছাই ও মূল্যায়নে সক্ষমতা বৃদ্ধির দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। আরো একটি বিষয়ে অনেকেরই মত, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারগুলোকে বিশেষভাবে জেলা পরিষদ, (যদিও এখনো নির্বাচিত নয়) উপজেলা পরিষদে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে সংযুক্ত রেখে স্থানীয় পর্যায়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে জবাবদিহিতার সুযোগসহ দায়িত্ব প্রদান করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুততর হবে। এ রকম প্রকল্প প্রণয়নকালেও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের সুপারিশ আবশ্যক করা যেতে পারে।

এটি উন্নয়নে তৃণমূলে জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতার কাঠামো সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দায়িত্ব পেলে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান যে সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে, সে নজির তো আমাদের দেশেই রয়েছে, যেমন— বরিশাল, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশনের শহরকে সুন্দর করার কার্যক্রমগুলো। কেন্দ্র থেকে ভার লাঘবের পদ্ধতি উদ্ভাবন, সময় পরিক্রমায় জরুরি হয়ে পড়েছে। নিবিড় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও বাজার কার্যক্রম তদারকিতে সরকারের আরো গভীর দায়িত্ব পালনে, উন্নয়নের দায়দায়িত্ব ক্রমাগত নিম্নমুখীকরণে পদক্ষেপ নেয়া সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

ড. শামসুল আলম, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here