আইপিও অর্থ অব্যবহৃত রেখেই মূলধন বাড়াচ্ছে কোম্পানিগুলো

0
553

স্টাফ রিপোর্টার : প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহৃত না হতেই বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়াচ্ছে কোম্পানিগুলো। বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে প্রাপ্ত মূলধনের ব্যবহারের বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হচ্ছে না।

ফলে আইপিওর অর্থ ব্যবহার না হতেই বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাধারণত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ বা আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলোর মূলধনের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো পুনঃগণপ্রস্তাব (আরপিও), রাইট শেয়ার, ডিবেঞ্চার বা বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে নতুন করে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে।

কিন্তু এসব পদ্ধতিতে মূলধন বাড়াতে হলে নানা ধরনের আইনি পদ্ধতি পরিপালন ও কোম্পানিকে জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা না থাকার কারণে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানি যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বোনাস শেয়ার ইস্যু করে মূলধন বাড়াচ্ছে।

সম্প্রতি শেয়ারবাজার থেকে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছে―এমন কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আইপিওর অর্থ অব্যবহৃত রেখেই বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে নতুন করে মূলধন বাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেন, বোনাস শেয়ার ইস্যুর বিষয়ে কোনো ধরনের নিয়মনীতি নেই। কোম্পানি চাইলে তার আয়ের যেকোনো অংশ বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন বাড়াতে পারে। তবে কোম্পানির যেসব সাধারণ শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন, তারা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বোনাস শেয়ার ইস্যুর বিষয়টির যৌক্তিক কারণ কোম্পানির কাছ থেকে জানতে পারেন। যদি যৌক্তিক কোনো কারণ না থাকে তাহলে তারা বোনাস শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব অনুমোদন না দিলেই পারেন।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন, একটি কোম্পানি যদি সত্যিই মুনাফা করে তাহলে বোনাস শেয়ার প্রদান করতে পারে। তবে নগদ লভ্যাংশ প্রদানের ওপর একটি কোম্পানির সক্ষমতা বা ভিত্তি কতটা মজবুত তা নির্ভর করে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

আইপিওর অর্থ ব্যবহার না হতেই কোম্পানিগুলোকে বোনাস শেয়ার প্রদান করতে দিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ভুল করছে বলে মনে করেন বাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ।

তিনি বলেন, এসব কোম্পানি শুধু বোনাস শেয়ার দিয়ে মূলধন বাড়াচ্ছে কিন্তু ব্যবসায় উন্নতি হয় না। বোনাস শেয়ার দেওয়ার পরের বছর গিয়ে কোম্পানিগুলোর ইপিএস কমে যায়, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা লোকসানের কবলে পড়েন। তাই আইপিওর টাকা ব্যবহার না হতে বোনাস শেয়ার প্রদানে নিষেধাজ্ঞা অথবা উদ্যোক্তাদের বোনাস শেয়ার বিক্রয়ে লক ইন চালু করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

সম্প্রতি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার পর বোনাস শেয়ার ইস্যু করে যে সব কোম্পানি মূলধন বাড়িয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে―রিজেন্ট টেক্সটাইল, আমান ফিড, অলিম্পিক এক্সেসরিজ, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, শাশা ডেনিমস, ইফাদ অটোস।

রিজেন্ট টেক্সটাইল : কোম্পানিটি ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আইপিওর মাধ্যমে ১২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিটি প্রতিটি শেয়ার ২৫ টাকা মূল্যে ৫ কোটি শেয়ার ইস্যু করে। কোম্পানিটি ব্যবহারের জন্য ২০১৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর এই টাকা পায়। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী কোম্পানিটি এই টাকা ১৮ মাসে ব্যবহার করবে। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই সাড়ে চার মাসের মাথায় ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার ইস্যুর ঘোষণা দেয়।

অলিম্পিক এক্সেসরিজ : কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে ১০ টাকা দরে ২ কোটি শেয়ার ইস্যু করে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। মেশিনারিজ ক্রয়, ভবন নির্মাণ ও আইপিও খরচ খাতে ব্যয় করতে পুঁজিবাজার থেকে এ অর্থ সংগ্রহ করে। ২০১৫ সালের ২৫ জুন সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন লাভ করে এবং পরবর্তী ১৮ মাসে তা ব্যয় করার কথা। কিন্তু অর্থ ব্যবহারের তিন মাস না যেতেই ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর ৭ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ : কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের জন্য গত বছরের ১৭ জুন অনুমোদন পায়। সংগৃহীত অর্থ ১৪ মাসের মধ্যে ব্যবহার করার কথা। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই ১৭ জুন ৭ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি আইপিওতে প্রতিটি শেয়ার ২৬ টাকা দরে শেয়ারবাজার থেকে ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে। সংগৃহীত অর্থ কোম্পানিটি ব্যবসায় সম্প্রসারণে ব্যয় করবে বলে জানায়।

আমান ফিড : কোম্পানিটি ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে আইপিওর মাধ্যমে ৭২ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। প্রতিটি শেয়ার ৩৬ টাকা মূল্যে ২ কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এই টাকা সংগ্রহ করা হয়। কোম্পানিটি ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর এই টাকা ব্যবহারের অনুমোদন পায়। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী এ টাকা ব্যবহারে কোম্পানিটির ১৫ মাস সময় লাগবে। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই দুই মাসের মাথায় ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর ২০ শতাংশ বোনাস শেয়ার ইস্যুর ঘোষণা দেয়।

শাশা ডেনিমস : কোম্পানিটি আইপিওর অর্থ ব্যবহারের জন্য ২০১৫ সালের ৫ মার্চ অনুমোদন লাভ করে। কোম্পানিটি ৩৫ টাকা মূল্যে ৫ কোটি শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ১৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, ব্যবসায় সম্প্রসারণ ও আইপিও খাতে ব্যয় করবে বলে জানায়। টাকা ব্যবহার করতে সময় লাগবে ১৮ মাস। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই ১২ এপ্রিল ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

ইফাদ অটোস : কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে ৬৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করে এবং ২০১৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন পায়। ব্যবসায় সম্প্রসারণ, ব্যাংক লোন পরিশোধ করতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে বলে জানায়। উত্তোলিত অর্থ ব্যবহার করতে সময় লাগবে ১২ মাস। কিন্তু কোম্পানিটি সেই টাকা ব্যবহার না করতেই ২৬ অক্টোবর ৩০ শতাংশ বোনাস শেয়ার প্রদানের ঘোষণা দেয়।

আইপিওর অর্থ ব্যবহার না হতেই বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে শাশা ডেনিমসের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর আহসানুল হক সোহেল বলেন, ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করা লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ নগদ লভ্যাংশ দিলে ব্যবসায় পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে ভেবে ২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ারও প্রদান করা হয়েছে। বোনাস শেয়ার প্রদানে অন্য কোনো কারণ নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here