পুঁজিবাজারে ‘প্রণোদনা খরা’, লেনদেন কমে সংকট ঘনীভূত

0
798

শাহীনুর ইসলাম : ২০১০ সাল পুঁজিবাজারের পতনকাল । ক্রমাগত পুঁজি হারানোর সময়। সেই দিন, মাস ও বছর অনেক আগেই পেরিছে গেছে। কিন্তু আবারো সিডরের মহাক্রান্তিকাল মাথা তুলছে। উত্তরণের নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা থাকলেও কাজে আসছে না। ২০১৬-১৭ সালের বাজেট প্রণোদনা খরায় ভুগছে পুঁজিবাজার। কমছে দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন।

নতুন অর্থবছর ঘিরে ছিল আরো উচ্চাশা। নতুন বাজেটে থাকবে পুঁজিবাজারে প্রণোদনা। তাকিয়ে ছিলেন বিনিয়োগকারী, ব্রোকার মালিক, স্টক এক্সচেঞ্জসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। স্বপ্ন অঙ্কুরের নষ্ট, বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে কোন ঘোষণা নেই। ফলে প্রণোদনা সংকটে ফের নতুন সুনামির মুখোমুখী হচ্ছে বাজার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বুধবার লেনদেন কমেছে। দুই বাজারেই মূল্য সূচকের মিশ্রাবস্থায় লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন সিএসইতে প্রায় ১৬ শতাংশ এবং ডিএসইতে প্রায় ৮ শতাংশ লেনদেন কমেছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুধবার ডিএসইতে ৩৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। গতকাল এ বাজারে লেনদেন হয়েছিল ৩৮৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার। আগের দিনের চেয়ে বুধবার ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন কমেছে।

যে কারণে প্রণোদনাহীন পুঁজিবাজারে তারল্যের সংকট দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা প্রভাব ইতোমধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পর পড়েছে। দরপতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার। এর ফলে অনেকে ফান্ডামেন্টাল কোম্পানির শেয়ারপ্রতি দর প্রতি কার্যদিবসে কমছে। যদিও এসব কোম্পানি ব্যবসা অনেক ভালো করেছে এবং আর্থিক প্রতিবেদনেও ইপিএস বেড়েছে।

বাজেটে প্রণোদনা হীনতার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। যদিও দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই ও সিএসই) থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে উৎসে কর সংগ্রহের হার কমানো, করমুক্ত লভ্যাংশের পরিমাণ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। বাজেটে তা আমলে নেয়া হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা ব্রোকার হাউজগুলোর লোকসান কমাতে স্টক এক্সচেঞ্জের স্টেকহোল্ডাররা সিকিউরিটিজ লেনদেনের ওপর আরোপিত উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ করার পাশাপাশি ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন পরবর্তী দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে ৫ (পাঁচ) বছরের জন্য শতভাগ কর অবকাশ দেওয়াসহ কিছু প্রণোদনার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রস্তাবিত বাজেট ‘পুঁজিবাজার বান্ধব হয়নি’ বলে ক্ষোভ প্রকশ করেছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একাংশের নেতা রুহুল আমিন। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের স্বার্থে কালো টাকা বিনা শর্তে বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়াসহ যেসব দাবি জানিয়েছিলাম তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাজেটে বিনিয়োগকারীদের কোনো প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাই নতুন করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পরোক্ষভাবে বাজারে প্রতি তাদের আস্থার সংকট আরো বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ডিএসইর সাবেক সভাপতি আহসানুল ইসলাম টিটো বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য এবারের বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে বাজেটে আমরা কিছু পাইনি।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজার চলছে প্রত্যাশার ওপর। বিনিয়োগকারী ও এখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নতুন বাজেটে যা প্রত্যাশা করেছিলেন তা পূরণ হয়নি। তাই তারা আশাহত হয়েছেন।

ডিএসইর সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন কোনো কিছু আসেনি। তবে বিনিয়োগকারীদের বিপক্ষেও কিছু নেই। এতে বিনিয়োগকারীদের প্যানিক হওয়ার কিছু নেই।

মডার্ন সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য খুজিস্তা নূর-ই নাহরীন বলেন, সরকারের এ বাজেটে বিনিয়োগকারীদের কোনো লাভ কিংবা ক্ষতি নেই। তবে পরোক্ষভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা মন্দায় পুঁজিবাজারে চরম ক্রান্তিকালে চলছে। বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। ব্রোকারেজ হাউজগুলো লোকসান পোষাতে না পেরে বন্ধ হতে শুরু করেছে। পুঁজিবাজারের এই দুঃসময়ে যেসব প্রণোদনা চাওয়া হয়েছিলো সেগুলো দিলে বাজারে সুফল আসতো। টার্নওভার বাড়তো। সরকারও এ খাত থেকে বেশ রাজস্ব আয় পেতো।

সিএসইর পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, বাজেটে বিনিয়োগকারীসহ বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারো প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সরকারেরও লাভ হয়নি। বরং বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের ওপর কর আরোপ, ব্রোকার হাউজের আয়ের ওপর অতিরিক্ত উৎসে কর আরোপের কারণে বাজারে লেনদেন প্রতিনিয়তই কমছে। ফলে এ খাত থেকে সরকার রাজস্ব আয়ও কম পাচ্ছে।

বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই ও সিএসই’র পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের স্বার্থে বাজারে চলমান সংকট এবং আস্থাহীনতা দূর করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রণোদনা এবং নীতি সহায়তা দিতে ডিএসই ও সিএসইর দাবিগুলো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব করে উভয় কর্তৃপক্ষ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here