স্প্রেড নির্দেশনা মানছে না ২৪ ব্যাংক

0
1177

রাহেল আহমেদ শানু : বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পেড নির্দেশনা মানছে না ২৪টি বিদেশি ও বেসরকারি ব্যাংক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে। সরকারের উন্নয়ন নীতি-কৌশলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্পেড মানির হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। বিনিয়োগ ও উন্নয়নের স্বার্থে শক্তহাতে ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ বিনিয়োগ বৃদ্ধির েেত্র প্রধান প্রতিবন্ধকতা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার। সেই বাধা ক্রমেই শিথিল হচ্ছে। সর্বশেষ মার্চ মাসে ঋণের ক্ষেত্রের সুদের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আগের মাসেও ছিল ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ। এদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানতের সুদের হার মার্চ মাসে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি ২৪ ব্যাংকের স্প্রেড এখনো ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। এরপরে রয়েছে বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতির উন্নয়নের প্রধান সূচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ বিনিয়োগের েেত্র প্রধান তিনটি সমস্যা হচ্ছে অবকাঠামোর অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঋণের উচ্চ সুদের হার।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির ২২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম বাধা হলো বিদ্যুৎ, গ্যাস প্রাপ্তিতে বিলম্ব, বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকরণে জটিলতা, জমির অভাব ও ঋণের উচ্চ সুদের হার।

সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের দীর্ঘদিনের দাবি ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। সুদের হারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ব্যাংকগুলোকে সুদের হার কমিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়ে আসছে।

গত কয়েক মাস ধরে আমানত ও ঋণ উভয় েেত্র সুদের হার কমছে। ফলে গত মার্চে আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) রেকর্ড পরিমাণ কমে ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের নিচে নেমে এসে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে।

এর আগে স্প্রেড ৫ শতাংশের নিচে ছিল ২০১৩ সালের এপ্রিলে ৪ দশমিক ৯৯, মে ৪ দশমিক ৯৮ এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষে ঋণের সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ এবং স্প্রেড ৪ শতাংশের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণের েেত্র ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ সুদ। স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইএর সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের সুদহার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ী সমাজ। এই সুদের হার ৯ শতাংশের নিচে নেমে এলে ব্যবসায়ীরা বাঁচবেন।

বিশেষায়িত ব্যাংকের স্প্রেড সবচেয়ে কম, মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ সুদ। এ খাতের ব্যাংকগুলোর ঋণের েেত্র গড় সুদের হার ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। মার্চ মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে সুদ আদায় করেছে। আমানতের বিপরীতে দিয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ। স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বিদেশি ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ সুদ দিয়ে ঋণের বিপরীত আদায় করছে ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ সুদ। এ খাতের ব্যাংকগুলোর স্প্রেড সবচেয়ে বেশি ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে ঋণ ও আমানতের সুদের হার (স্প্রেড) ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের মধ্যে রাখার নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না ২৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে ১টি সরকারি, ১৭টিই বেসরকারি ও ৬টি বিদেশি ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এরপরে রয়েছে বিদেশি খাতের স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটির স্প্রেড ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধানের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ডাচ্ বাংলা ব্যাংক। তাদের এই ব্যবধান ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওয়ান ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঢাকা ব্যাংকের ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সিটি ব্যাংকের ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংক ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, এক্সিম ব্যাংকের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৫ দশমিক ৩ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ৫ দশমিক ২ শতাংশ। নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের স্প্রেড ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংক ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংকের স্প্রেড ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও মেঘনা ব্যাংকের ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের স্প্রেড ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ, সিটি ব্যাংক এন এর ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ, এইচএসবিসি ব্যাংকের ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

স্টেট ও কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ।

উল্লেখ্য, শতাংশ থেকে শতাংশের মধ্যে কমবেশির তুলনা করতে শতাংশীয় পয়েন্ট ব্যবহার করা হয়।  যেমন ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশ হলে এটি ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমল বলে বিবেচিত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here