ব্যাংক এক্সপোজার লিমিটের ফাঁদে পুঁজিবাজার, তীব্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

0
2845

রাহেল আহমেদ শানু : ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সমন্বয়ের (ব্যাংক এক্সপোজার লিমিট) সময়সীমা বাড়ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘নীতি সহায়তা’ দেয়ার সিদ্ধান্তে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে পুঁজিবাজার। সরকার ও সরকারের সহযোগী বিভিন্ন কর্তাদের অতিতের দেয়া বক্তব্যে ইতোমধ্যে বাজারে সৃষ্টি হয়েছে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।

দেশের ৫৬ টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৮টি ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে ১২ টি ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা অতিরিক্ত রয়েছে। আগামী ২৩ জুনের মধ্যে এসব ব্যাংকের বিনিয়োগ সহনীয় মাত্রায় আনতে হবে। এ সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো শেয়ার ছেড়ে দিলে তৈরি হবে আশঙ্কার। লিমিট ইস্যুতে তৈরি হয়েছে ‘প্রকট আস্থাহীনতা’।

বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা না বাড়ানো ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ মার্চেন্ট ব্যাংক এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও মাহবুব এইচ মজুমদার।

সিইও বলেন, ভিন্ন মন্তব্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের ইমেজ নষ্ট করছে। যেহেতেু অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এক্সপোজার লিমিট বাড়াতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই তাদের সুস্থ পুঁজিবাজার এবং সরকারের ইমেজ বৃদ্ধিতে তা করার দরকার ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভুল করেছে। আশা করি তারা তাদের পলিসি পরিবর্তন করে পুঁজিবাজারের স্বার্থে নতুন ঘোষণা দেবে বলেন মাহবুব।

পুঁজিবাজারে ‘আস্থাহীনতায় আতঙ্ক তৈরি করছে’ বলেন এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরান হাসান।

তিনি বলেন, ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা আদৌ বাড়ানো হবে কিনা, বাড়ালেও কবে কতদিন বাড়ানো হবে, তার কোনো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতা রয়েছে।

এমরান হাসান বলেন, শেয়ারের দাম কমলেও যদি লেনদেন বাড়ে এর অর্থ হচ্ছে পুঁজিবাজারে আস্থা নেই। বিনিয়োগকারীরা ভয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। দাম আরো কমবে, এমন আতঙ্কে রয়েছেন সবাই।

ব্রোকারেজ হাউস ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাক আহমেদ সাদিক বলেন, আমি বুঝি না, কারো কি পুঁজিবাজার নিয়ে কোনো চিন্তা আছে? সবাই যে বলে দেশে অনেক অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, ভাইব্রেন্ট পুঁজিবাজার ছাড়া কোনো দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে কি? পুঁজিবাজার নিয়ে নীতি নির্ধারকদের কার্যক্রমে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি সংগঠনের সভাপতি আতাউল্লাহ নাইম বলেন, বিনিয়োগকারীদের আশা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আসার পরে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের সীমা বাড়বে কিন্তু সে আশা পূরণ হয়নি।

তবে শেয়ার ‘ছেড়ে দেয়ার’ কারণ হিসেবে কম মুনাফার কথা বলছেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ এ হাফিজ। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা কম মুনাফা হলেই শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন, এ কারণেই বাজারে নেতিবাচক প্রভাব।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা দুই বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সীমা বাড়িয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত করা হবে।

তিনি বলেন, এর পর আমরা গেলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলে এটি আসতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। গেলাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের কাছে চিঠি লিখলে আমরা ‘ওকে’ করে দেব।

এই করতে করতে এ বিষয়ে জড়িত হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আমরা বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে গেলাম। তিনি পুঁজিবাজারের স্বার্থে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করলেন। এর পর অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নরের সামনে কথা দিয়েছেন বিনিয়োগ সমন্বয় সীমা বাড়ানো হবে। সে সময় অর্থ সচিবও উপস্থিত ছিলেন।

আমরা খতিয়ে দেখলাম যে আইনে বিনিয়োগ সমন্বয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, সেই আইন পরিবর্তন না করেই সমন্বয়ের সীমা বাড়ানোর সুযোগ আছে। এখন শুনেছি কায়েকদিন আগে অর্থমন্ত্রীকে বোঝানো হয়েছে, এই সুযোগ দেয়া হলে বাজার মেন্যুপুলেট (কারসাজি) ও বাবল হবে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা যদি ব্যক্তি বিশেষকে শিল্পায়নের জন্য ৫০০ কোটি টাকার ওপরে ১৫ বছর থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত রিসিডিউল (ঋণ পুনঃতফসিল) করার সুযোগ দিতে পারি, তাহলে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর জন্য এ কাজটি সমন্বয় সীমা বাড়াতে পারি না? আমরা টাকা চাচ্ছি না, সহায়তা চাচ্ছি না, কোনো ফান্ড চাচ্ছি না। আমরা শুধু পলিসি সাপোর্ট (নীতি সহায়তা) চাচ্ছি।

ডিএসইর সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগ সমন্বয় করা নিয়ে কেন এই খেলা খেলছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণে ধীরে ধীরে পুঁজিবাজার ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজারের গলার টুটি টিপে ধরে আছে। এ ধরনের কার্যকালাপ বন্ধ করতে হবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক তার মূলধনের (পরিশোধিত মূলধন, স্ট্যাটিউটরি রিজার্ভ, রিটেইনড আর্নিং ও শেয়ার প্রিমিয়ামের যোগফল) সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ করতে পারে।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিনিয়োগ সীমা বেঁধে দিয়েছিল। ২০১০ সালে বেশকিছু ব্যাংক পুঁজিবাজারে ব্যাপক পরিমাণে বিনিয়োগের পরিপেক্ষিতে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সীমা বেঁধে দেয়।

একই সঙ্গে যেসব ব্যাংকের বিনিয়োগ তাদের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি আছে তাদের তা কমিয়ে সীমার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য ২০১৬ সালের ২১ জুলাই পর্যন্ত সময়ও বেঁধে দেয়া হয়েছিল।

বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময়সীমা নিয়ে সোমবার মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন (বিএমবিএ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয় সীমা বাড়ানো পে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, এখন ব্যাংকে যে পরিমাণ অলস টাকা পড়ে আছে, সেখানে আরো টাকা দিলে অলস টাকা বাড়বে। অলস টাকা বাড়লে ব্যাংক আমানত নিতে অস্বীকার করবে। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে বেশি টাকা ব্যাংকের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া যুক্তিসঙ্গত হবে না। কাজেই ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সীমা বাড়ানো অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত।

এদিকে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময় ২০১৬ সালের ২১ জুলাইয়ের পর না বাড়িয়ে ‘নীতি সহায়তা’ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here