ফিরে এলো ১৭ বছর পর সেই ডিবেঞ্চার!

0
1768

সিনিয়র রিপোর্টার : পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে একসময় জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল ডিবেঞ্চার (ঋণপত্র) ইস্যু। বছরে নির্দিষ্ট হারে সুদের বিনিময়ে ডিবেঞ্চার ইস্যু ছিল কোম্পানির মূলধন জোগানের অন্যতম মাধ্যম। নব্বইয়ের দশকে ১৪টি কোম্পানি ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে।

তবে নির্ধারিত সময়ে ডিবেঞ্চারধারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতায় অর্থ সংগ্রহের এ হাতিয়ার জনপ্রিয়তা হারায়। পাওনা আদায় নিয়ে মামলাও চলছে। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ সংগ্রহ বন্ধ থাকার প্রায় ১৭ বছর পর আবারো একটি কোম্পানিকে ডিবেঞ্চার ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নিয়মিত সভায় ওয়াটা কেমিক্যালসকে ৩৫ কোটি টাকার ডিবেঞ্চার ইস্যুর সোমবার অনুমোদন দেয়া হয়। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শুধু ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এ ডিবেঞ্চার কিনবে।

যদিও প্রায় দুই দশক আগে বেশকিছু কোম্পানির ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ করে তা আজো ফেরত পায়নি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটি। পাওনা আদায়ে আইসিবি শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালত নির্ধারিত সময়ে ডিবেঞ্চারের পাওনা পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও তা মানেনি ডিবেঞ্চার ইস্যুকারী কোম্পানিগুলো।

বিএসইসিতে অনুমোদিত ডিবেঞ্চারের অর্থে ওয়াটা কেমিক্যাল তাদের কারখানা সম্প্রসারণ করবে।

২৬ বছর আগে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) পাশাপাশি ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সময়মতো অর্থ ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে ইস্যুয়ার কোম্পানির গড়িমসির কারণে ডিবেঞ্চারের সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে যায়। আদালতের শরণাপন্ন হয়েও ডিবেঞ্চারধারীদের উল্লেখযোগ্য অংশই বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ ফেরত পাননি।

১৯৮৮ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে পুঁজিবাজারে মোট ১৪টি কোম্পানি ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৬টি কোম্পানি নির্ধারিত সময়ে ডিবেঞ্চারধারীদের অর্থ পরিশোধ করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন ব্যবস্থা থেকে তালিকাচ্যুত হয়েছে।

তবে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় মেয়াদ পূর্তির এক যুগ পার হলেও আটটি কোম্পানির ডিবেঞ্চার এখনো লেনদেনযোগ্য হিসেবে রয়ে গেছে। যদিও প্রায় ১১ বছর ধরে এসব ডিবেঞ্চারের কোনোটিই লেনদেন হয় না।

পুঁজিবাজারে প্রথম ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। পরবর্তীতে বেক্সিমকো গ্রুপের বেক্সিমকো লিমিটেডসহ আরো ৬টি প্রতিষ্ঠান ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে।

বেক্সিমকো গ্রুপের দেখানো পথে দোয়েল গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড, আরামিট সিমেন্ট ও বিডি ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস এ প্রক্রিয়ায় অর্থ সংগ্রহ করে। এসব ডিবেঞ্চারের বার্ষিক সুদহার ছিল ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। মেয়াদ ছিল ৬ থেকে ১০ বছর।

১৯৮৮ সালে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ২৮ হাজার ডিবেঞ্চার ইস্যু করে। পরবর্তীতে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ইনফিউশন ও বেক্সিমকো সিনথেটিকস ডিবেঞ্চার বা ঋণপত্র ইস্যু করে।

১০ বছর মেয়াদি এসব ডিবেঞ্চারের বার্ষিক সুদের হার ছিল ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে চারটি কোম্পানি ডিবেঞ্চারধারীদের অর্থ পরিশোধ করে। একইভাবে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ১৯৯৪ সালে ডিবেঞ্চার ইস্যু করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পাওনা পরিশোধ করে।

এর বাইরে ১৯৯৪ ও ৯৫ সালে বেক্সিমকো গ্রুপের আরো চারটি কোম্পানি ডিবেঞ্চার ইস্যু করে। যেগুলোর মেয়াদ পূর্ণ করলেও ডিবেঞ্চারধারীরা এখনো অর্থ ফেরত পাননি। কোম্পানিগুলো হচ্ছে— বেক্সিমকো টেক্সটাইল লিমিটেড, বেক্সিমকো নিটিং লিমিটেড, বেক্সিমকো ফিশারিজ ও বেক্সিমকো ডেনিম লিমিটেড।

পরবর্তীতে এ চারটি কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেডের সঙ্গে একীভূত হয়। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে চারটি ডিবেঞ্চারের মেয়াদ শেষ হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিবেঞ্চারধারীরা তাদের বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাননি। এসব ডিবেঞ্চারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ পেয়েছিল আইসিবি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও কোম্পানিও ডিবেঞ্চার ক্রেতাদের তালিকায় ছিল।

পরবর্তীতে ট্রাস্টি ও ডিবেঞ্চারধারীরা আদালতের শরণাপন্ন হলে বেক্সিমকো নিটিং ও বেক্সিমকো ফিশারিজকে পাওনা অর্থ পরিশোধে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময় দেন আদালত। ২০১০ সাল থেকে প্রতি বছর দুটি কিস্তির মাধ্যমে এ অর্থ পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয় ইস্যুয়ারকে।

আর ডিবেঞ্চারের পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য বেক্সিমকো টেক্সটাইল ও বেক্সিমকো ডেনিমকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময় দেন আদালত। এক্ষেত্রেও প্রতি বছর দুটি কিস্তির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের শর্তারোপ করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেসব কিস্তি পরিশোধেও ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিগুলো।

আইসিবি ডিবেঞ্চারের কিস্তি না পাওয়ার কথা নিশ্চিত করলেও ইস্যুয়ার কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

বেক্সিমকো গ্রুপের দেখানো পথে একসঙ্গে আইপিও ও ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দোয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ জিপার ও বাংলাদেশ লাগেজ লিমিটেড। দুর্বল মৌলভিত্তির এ তিন প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে তালিকাচ্যুত হয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে স্থানান্তরিত হয়েছে। গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ লাগেজ ও বাংলাদেশ জিপার নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয়।

এদিকে ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষ হলেও পাঁচ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পাওনা পরিশোধ করেনি বিডি ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেড। অন্যদিকে মেয়াদ বাড়িয়ে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অর্থ কিস্তিতে পরিশোধ করছে আরামিট সিমেন্ট লিমিটেড।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here